গরমে জাম, অতি উপাদেয় ফলের নাম
প্রকাশ : ২৭ জুন ২০২২, ১৪:৪৮
গরমে জাম, অতি উপাদেয় ফলের নাম
প্রিন্ট অ-অ+

অত্যন্ত ঔষধি গুণসম্পন্ন ফল পাকা জাম। ফলের ভাণ্ডারে ভরা আমাদের এ প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ। অন্যান্য সব ফলের মধ্যে জাম অন্যতম। অন্য সব মৌসুমি ফলের তুলনায় জামের স্থায়ীকাল কম হলেও এটি পুষ্টিগুণে অতুলনীয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জামের ঔষধি গুণ। এটিএকটি গ্রীষ্মকালীন ফল। জাম সাধারণত তাজা ফল হিসেবে ব্যবহৃত হলেও এ থেকে রস, স্কোয়াশ ও অন্যান্য সংরক্ষিত খাদ্য তৈরি করা যায়। এই গরমে জাম অতি উপাদেয় ফলের নাম, কেন জেনে নিবো এক নজরে।


জামের পুষ্টিগুণ


জামের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে জানলেই বুঝতে পারবেন কেন জাম অতি উপাদেয়, তাছাড়া জামের স্বাদ টক-মিষ্টি হওয়ায় ছোট-বড়সবারই খুব পছন্দের এই জাম।


জামে শক্তি ২৫১ কিলোজুল, শর্করা, স্নেহ পদার্থ, প্রোটিন, ভিটামিন এ, থায়ামিন বি১, রিবোফ্লাভিন বি২, নায়াসিন বি৪, প্যানটোথেনিক অ্যাসিড, বি৫, ভিটামিন বি৬, ভিটামিন সি, ক্যালসিয়াম, লোহা, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, পটাসিয়াম,সোডিয়াম ওপানি আছে। এছাড়াও আছেরয়েছে প্রচুর পরিমাণে জিংক, কপার, গ্লুকোজ, ডেক্সট্রোজ ও ফ্রুকটোজ, ফাইবার, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও স্যালিসাইলেটসহ অসংখ্য উপাদান। এইসব উপাদান আছে বলেই জাম উপকারী ফল। কীভাবে উপকার করে এবার সেটা জেনে নিবো।


জামের উপকারিতা


জামের অনেক স্বাস্থ্য উপকারিতা রয়েছে। জামের উপকারিতা সমূহ নিম্নেবর্ণিত হলো-


১। মানসিকভাবে সতেজ রাখে : জামে গ্লুকোজ, ডেক্সট্রোজ ও ফ্রুকটোজ রয়েছে, যা মানুষকে জোগায় কাজ করার শক্তি। বয়স যত বাড়তে থাকে, মানুষ ততই হারাতে থাকে স্মৃতিশক্তি। জাম স্মৃতিশক্তি প্রখর রাখতে সাহায্য করে।
২। ডায়াবেটিস নিরাময়ে সাহায্য করে : ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য জাম ভীষণ উপকারী। এক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত জাম খাওয়ার ফলে ৬.৫ শতাংশ মানুষের ডায়াবেটিক কমে গেছে। এটি রক্তে চিনির মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। জাম ডায়াবেটিক রোগীদের রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণ করে শরীর সুস্থ রাখে। এক চা চামচ জামের বীচির গুঁড়া খালি পেটে প্রতিদিন সকালে খেলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।


৩। ভিটামিন সি-এর অভাবজনিত রোগ দূর করে : জামে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন সি। যার জন্য এটা দেহে ভিটামিন সি-এর ঘাটতি পূরণ করে এবং একই সঙ্গে ভিটামিন সি-এর অভাবজনিত রোগ প্রতিরোধ করে। এ ছাড়া মুখের দুর্গন্ধ রোধ, দাঁত মজবুত, মাঢ়ি শক্ত এবং মাঢ়ির ক্ষয়রোধেও জামের জুড়ি নেই । এতে বিদ্যমান পানি, লবণ ও পটাসিয়ামের মতো উপাদান গরমে শরীর ঠা-া এবং শারীরিক দুর্বলতাকে দূর করতে সক্ষম। জামে দেখা মেলে বেশি পরিমাণের আয়রনেরও, যা রক্তস্বল্পতা দূর করে।
৪। হার্ট ভালো রাখে : জাম রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে হৃদপি- ভালো রাখে। এছাড়া শরীরের দূষিত কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রা কমিয়ে দেহের প্রতিটি প্রান্তে অক্সিজেন পৌঁছে দেয়।


৫। ওজন নিয়ন্ত্রণ করে : জামে কম পরিমাণে ক্যালোরি থাকে, যা ক্ষতিকর তো নয়ই বরং স্বাস্থ্যসম্মত। তাই যারা ওজন নিয়ে চিন্তায় আছেন এবং নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন, তাদের খাদ্য তালিকায় আসতে পারে জাম।
৬। উচ্চ রক্তচাপ : পুষ্টিবিদ এবং চিকিৎসকরা তাজা ফল এবং সবজি খাওয়ার সুপারিশ করে থাকেন। বিশেষজ্ঞরা বলেন, জামে সেই সব উপাদান আছে যা উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সহায়তা করে।
৭। ক্যান্সার প্রতিরোধে : মানুষের মুখের লালার মধ্যে এক ধরনের রঞ্জক পদার্থ উৎপাদিত হয়, যা হতে ব্যাকটেরিয়ার জন্ম নেয়। এ ধরনের ব্যাকটেরিয়া হতে মুখে ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আর জাম মুখের ভেতর উৎপাদিত ক্যান্সারের সহায়ক ব্যাকটেরিয়ার প্রভাব থেকে দেহকে রক্ষা করে মুখের ক্যান্সার প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রঙিন ফলের ভেতর যে পরিমাণ যৌগিক উপাদান রয়েছে, এর মধ্যে জামে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ যৌগিক উপাদান রয়েছে যা স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সাহায্য করে। জাম লড়াই করে জরায়ু, ডিম্বাশয় ও মলদ্বারের ক্যান্সারের বিরুদ্ধে।


৮। শয্যামূত্র : এ রোগে শিশু-বৃদ্ধ অনেকেই অসুবিধায় পড়েন এবং অনেক মা-কেও সন্তানের জন্য ভুগতে হয়। এক্ষেত্রে ২-৩ চা চামচ জাম পাতার রস (বয়স অনুপাতে মাত্রা) ১/২ চা চামচ গাওয়া ঘি মিশিয়ে প্রতিদিন একবার করে খাওয়ালে এক সপ্তাহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য উপকার হবে।


৯। পেটের সমস্যা দূর করতে: যাদের জ্বরের সঙ্গে পেটের দোষ থাকে, তারা এ পাতার রস ২-৩ চা-চামচ একটু গরম করে ছেঁকে খেলে উপকার হয়।


১০। দাঁতের মাঢ়ির ক্ষতে : যাদের মাঢ়ি আলগা হয়ে গিয়েছে, একটুতে রক্ত পড়ে, তারা জামছালের গুঁড়া দিয়ে দাঁত মাজলে, উপকার হবে।
১১। জামে ফাইটো কেমিক্যালস আর অ্যান্টি অক্সিডেন্ট বিদ্যমান : যা দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, সঙ্গে মৌসুমি সর্দি-কাশি থেকে মুক্তি দেয়। প্রতিরোধ করে ইনফেকশনের মতো সমস্যারও। জামে পাওয়া গেছে অ্যালার্জিক নামে এক ধরনের এসিডের উপস্থিতি, যা ত্বককে করে শক্তিশালী। ক্ষতিকর আলট্রা-ভায়োলেট রশ্মির প্রভাব থেকে ত্বক ও চুলকে রক্ষা করে। এ অ্যালার্জিক এসিড ক্ষতিকর ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে।
১২। চোখের উপকারে:বৃদ্ধ বয়সে চোখের অঙ্গ ও স্নায়ুগুলোকে কর্মময় করতে সাহায্য করে। জাম চোখের ইনফেকশনজনিত সমস্যা ও সংক্রামক (ছোঁয়াচে) রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। রাতকানা রোগ এবং যাদের চোখের ছানি অপারেশন হয়েছে তাদের জন্য জাম ভীষণ উপকারী। আমাদের নাক, কান, মুখের ছিদ্র, চোখের কোনা দিয়ে বাতাসে ভাসমান রোগজীবাণু দেহের ভেতর প্রবেশ করে। জামের রস এ জীবাণুকে মেরে ফেলে।


তবে জাম খাওয়ার ব্যাপারে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।


১। আধাপাকা (ডাঁসা) জাম খাওয়া উচিত নয়।


২। খালি পেটে জাম খাবেন না


৩। জাম খাওয়ার পর দুধ খাবেন না।


৫। পাকা ফল ভরা পেটে খেলে অতিরিক্ত অ্যাসিডিটি ও গ্যাস্ট্রিকভাব হতে পারে।


সচেতনতার অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে দেশি ফল জাম। এক সময় প্রচুর জাম গাছ চোখে পড়লেও এখন তেমন দেখা যায় না। অত্যন্ত ঔষধি গুণসম্পন্ন পাকা জামের মধুর রসে এখন আর মুখ আগের মতো রঙিন হয় না। পতিত জায়গাগুলোতে জামের চারা রোপণ করে একদিকে যেমন আমাদের পুষ্টির চাহিদা পূরণ হবে, অন্যদিকে প্রকৃতির সৌন্দর্য বৃদ্ধির সাথে সাথে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হবে।
সূত্র : ইউএসডিএ নিউট্রেন্ট ডাটাবেজ।


বিবার্তা/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com