সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষায় বরাদ্দ দেয়া উচিত: আরেফিন সিদ্দিক
প্রকাশ : ০২ জানুয়ারি ২০২২, ১০:২৫
সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষায় বরাদ্দ দেয়া উচিত: আরেফিন সিদ্দিক
মহিউদ্দিন রাসেল
প্রিন্ট অ-অ+

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আবু আহসান মো. সামসুল আরেফিন সিদ্দিক। যিনি আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক নামে সমধিক পরিচিত। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রথিতযশা এই অধ্যাপক বর্তমানে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। বিশিষ্ট এই শিক্ষাবিদ সম্প্রতি দেশের শিক্ষাঙ্গন নিয়ে বিবার্তা২৪ ডটনেটের সাথে একান্ত আলাপচারিতায় কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বিবার্তা প্রতিবেদক মহিউদ্দিন রাসেল।


বিবার্তা : শিক্ষার্থীরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে চায় না। একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে বিষয়টিকে কিভাবে দেখেন?


আরেফিন সিদ্দিক : শিক্ষার্থীরা শিক্ষকতা পেশা নিতে চায় না, এর পেছনে নানা কারণ আছে। প্রথম কথা হলো, শিক্ষকতার মূল্যায়নটা সামাজিকভাবে আমরা সেভাবে করতে পারেনি। শিক্ষকদের বেতন ভাতাও আমরা কম দেই। অন্যান্য সেক্টর থেকে এই সেক্টরে শিক্ষকদের অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও কম। শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় ও সরকারি কলেজ পর্যায়ে কিছুটা সামঞ্জস্য আছে অন্যান্য পেশার সাথে।


তাছাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পর্যায়ে শিক্ষকতা পেশার বেতন ভাতা অনেক কম দেয়া হয়। ফলে মেধাবী শিক্ষার্থীরা শিক্ষকতা পেশার চেয়ে অন্যান্য পেশাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এমনকি কেরানীর চাকরিসহ অনেক চাকরির স্থায়িত্ব বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা থাকায় এসবেরও গুরুত্ব বেড়ে যাচ্ছে। শুধু ‍তাই নয়, সরকারি অন্যান্য চাকরির গুরুত্ব সমাজে বেড়ে যাওয়াসহ সামাজিক নানা কারণে শিক্ষার্থীরা এখন আর শিক্ষকতা পেশায় আসতে চায় না।



বিবার্তা : শিক্ষকতা পেশার এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী কারা?


আরেফিন সিদ্দিক : আসলে সত্যিই বলতে, শিক্ষকতা পেশাকে সর্বোচ্চ সম্মানের পেশা করা উচিত ছিল। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা এবং ব্যক্তিগতভাবেও তাদেরকে খুব মর্যাদা দিতেন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে। পরবর্তীতে আমরা শিক্ষকদের সেভাবে মর্যাদা দিতে পারিনি, সেটা আমাদের-ই ব্যর্থতা। শিক্ষক হিসেবে আমরা অনেকেই বিভিন্ন জায়গায় যোগদান করে শিক্ষকতা পেশাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছি। শিক্ষকতা পেশার যে সম্মান-মর্যাদা, সেটাকে আমরা বিক্রি করে দিচ্ছি। এর পেছনে দুটি কারণ আছে বলে আমি মনে করি। প্রথমত, আমরা শিক্ষকরাও কিছুটা দায়ী আর সরকারের কিছু সিদ্ধান্তও এ ঘটনার জন্য দায়ী। প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করে বঙ্গবন্ধু শিক্ষার যে মান দাঁড় করিয়েছেন, পরবর্তীতে সেটা আমরা ধরে রাখতে পারিনি। নানা কারণে এসব হচ্ছে।


বিবার্তা : এ সঙ্কট থেকে উত্তরণের উপায় কি?


আরেফিন সিদ্দিক : এটা থেকে উত্তরণের উপায় হচ্ছে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়ানো এবং যারা এই পেশায় আসবে তাদেরকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করে প্রথম শ্রেণীর চাকরির মাধ্যমে শিক্ষকতায় আনতে হবে। তাদের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সব সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। প্রথম শ্রেণির সরকারি চাকরিজীবীরা থেকে শুরু করে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা যে বেতন ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পায় আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তা পায় না। তাহলে তারা শিক্ষকতা পেশায় কেন যেতে চাইবে?



বিবার্তা : জিপিএ ৫ অর্থাৎ গ্রেড দিয়ে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করার সিস্টেমকে আপনি কিভাবে দেখেন?


আরেফিন সিদ্দিক : আজকে আমরা সব ছাত্রছাত্রীকে নম্বরের দিকে ধাবিত করছি, জিপিএ ৫ পাওয়ার দিকে ধাবিত করছি। এ কাজটা শিক্ষকরা করছে, অভিভাবকরা করছে, সমাজ থেকেও করছে। এমনকি সমাজে একজন শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞেস করা হয়, তুমি জিপিএ কত পেলে? এই জিপিএ দিয়ে তাকে মূল্যায়ন করা হয়। কিন্তু শিক্ষার্থীকে সঠিকভাবে শিখানো হয়েছে কিনা, সে শিখতে পেরেছে কিনা এই বিষয়গুলোর আলোচনা হচ্ছে না।


বিবার্তা : জিপিএ ৫ কেন্দ্রিক পড়াশোনা থেকে বের হয়ে আসার উপায় কি বলে আপনি মনে করেন?


আরেফিন সিদ্দিক : জিপিএ ৫ এর যে প্রতিযোগিতা সেই প্রতিযোগিতা থেকে ছেলেমেয়েদের ফিরিয়ে আনতে হবে। তাদেরকে বিদ্যা অর্জনের দিকে ধাবিত করতে হবে। তারা কতটুকু শিখলো, সেই বিষয়টির গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই লক্ষ্যে ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছেন, বেশ কিছু সিদ্ধান্তও নেয়া হয়েছে। দশম শ্রেণি পর্যন্ত কোনো পাবলিক পরীক্ষা থাকবে না বলেও ঘোষণা দেয়া হয়েছে। ছাত্র-ছাত্রীদের বইয়ের দিকে নিয়ে আসতে হবে। শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার্থী নয় বরং জ্ঞান অন্বেষণকারী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। পরীক্ষাটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, একটা পরীক্ষা দিয়ে হয়তো আমরা মূল্যায়ন করি। তবে পরীক্ষার মধ্যে শুধু শ্রেণিকক্ষের কারিকুলাম থাকবে এটা নয়, এখানেই শিক্ষার্থীর সাংস্কৃতিক চর্চা, খেলাধুলা, আচার-আচরণ, সৌজন্যবোধসহ সার্বিক বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। এই সবগুলো বিষয়ের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করলে ভালো ফলাফল আসবে বলে আশা করা যায়।



বিবার্তা : শিক্ষক ও সরকারের উদ্দেশ্যে একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে কি পরামর্শ দেবেন?


আরেফিন সিদ্দিক : আমরা শিক্ষকরা শিক্ষা দেই, কিন্তু সেই শিক্ষা শিক্ষার্থীরা কতটুকু গ্রহণ করেছে সেটা আমরা বুঝতে পেরেছি কিনা? এ বিষয়টি শিক্ষকদের মাথায় রাখতে হবে। আর সরকারের উদ্দেশ্যে বলবো, আমাদের শিক্ষকদের এমন সুযোগ-সুবিধা দেয়া উচিত যাতে করে শিক্ষকদের কোচিংসহ অন্য প্রফেশনের সাথে জড়িত হতে না হয়। শিক্ষকের ধ্যান-জ্ঞান যাতে শিক্ষা ও শিক্ষার্থী নিয়ে হয় সে ব্যবস্থা করা উচিত।


বিবার্তা : গত ১৩ সেপ্টেম্বর দেশে নতুন শিক্ষাক্রমের বিষয়ে জানানো হয়। শিক্ষাক্রমের নতুন রূপরেখাকে কিভাবে দেখেন?


আরেফিন সিদ্দিক : শিক্ষাক্রমে আধুনিকায়ন একবিংশ শতাব্দীর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তথ্য প্রযুক্তির এ যুগে শিক্ষাকে ঢেলে সাজানোর যে রূপরেখা করা হয়েছে আমি সেটাকে স্বাগত জানাই। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এরআগে বহুবার শিক্ষার্থীদের চাপ কমাতে বই কমানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। শিক্ষাবিদরাও এ বিষয়ে বহুবার কথা বলেছেন। অবশেষে এ বিষয়টি আমলে নিয়ে রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়েছে। শুধু শিক্ষাক্রমে পরিবর্তন আনলে হবে না, বরং এ পরিবর্তনকে বাস্তবায়ন করতে হবে। দক্ষ ও যোগ্য লোককে এ পেশায় নিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজনে শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শিক্ষার্থীরা পেশা হিসেবে এখানে কেন থাকতে চায় না, তা ভাবতে হবে। প্রয়োজনে সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে দিয়ে যোগ্য লোকদের এ পেশায় রাখতে হবে। তাহলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা যোগ্য শিক্ষকের ছোঁয়ায় প্রকৃত শিক্ষাটা পাবে।



বিবার্তা : শিক্ষাক্রমের নতুন রূপরেখায় নবম শ্রেণির গ্রুপ তুলে দেয়ার কথা বলা হচ্ছে। বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখেন?


আরেফিন সিদ্দিক : আমি মনে করি, এ শ্রেণিতে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা এসব বিভাজন থাকা উচিত নয়। কেউ বিজ্ঞান পড়বে না, কেউ সমাজ পড়বে না, আবার কেউ অন্য বিষয় পড়বে না এতো বিভাজন এ শ্রেণিতে ঠিক নয়। বরং তথ্য প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে এ শ্রেণির শিক্ষাকে সামগ্রিক পাঠ্যক্রমে নিয়ে আসতে হবে। পরে কলেজে গেলে শিক্ষার্থীরা তাদের পছন্দ মতো বিভাগ নিতে পারে।


বিবার্তা : পঞ্চম শ্রেণির পিএসসি ও অষ্টম শ্রেণির জেএসসির মতো বোর্ড পরীক্ষাগুলোকে কিভাবে দেখেন?


আরেফিন সিদ্দিক : এ পরীক্ষাগুলোতে জিপিএ ৫ নিয়ে প্রতিযোগিতা হয়। তখন শিক্ষার্থীদের চাপ দেয়া হয়। চাপে পড়ে শিক্ষার্থীরা আর শিক্ষার্থী থাকে না, তারা পরীক্ষার্থী হয়ে যায়। এটা থেকে শিক্ষার্থীদের মুক্তি দিতে হবে। পিএসসি-জেএসসি পরীক্ষাগুলো থাকা উচিত নয়। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করবেন। আর শিক্ষার্থীরাও মুক্তভাবে পড়বেন। এখানে প্রেসার থাকবে কেন? এ প্রেসার তো শিক্ষার্থীদের মারাত্মক ক্ষতি করছে। শিক্ষার ক্ষেত্রে অসুস্থ প্রতিযোগিতা দূর করতে হবে।



বিবার্তা : বিবার্তাকে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।


আরেফিন সিদ্দিক : আপনাকেও ধন্যবাদ।


বিবার্তা/রাসেল/জহির

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com