মুক্তিযোদ্ধাদের কান্না শোনার কেউ নেই (১ম পর্ব)
প্রকাশ : ২৯ এপ্রিল ২০২১, ১৮:০৫
মুক্তিযোদ্ধাদের কান্না শোনার কেউ নেই (১ম পর্ব)
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রমনা রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লাখো জনতার সামনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণে শত্রুদের মোকাবিলার জন্য যার কাছে যা আছে তাই নিয়ে সবাইকে প্রস্তুত থাকতে বলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’দেশের বীর সন্তানেরা বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে হানাদারদের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ সংগ্রামে আত্মনিবেদন করেন। দীর্ঘ ৯ মাস সংগ্রামের পর ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ, দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম ও সহায়-সম্পদের বিপুল ক্ষয়ক্ষতির ভেতর দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জন করে বাঙালি। বাঙালি পেল স্বাধীন দেশ ও লাল সবুজের পতাকা।


এই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে একজন হলেন নয় নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার ও মুক্তিযোদ্ধা মাহফুজ আলম বেগ। প্রথমে নয় নম্বর সেক্টরের অপারেশনাল কমান্ডার। পরে তাকে শমশেরনগর সাবসেক্টরের দায়িত্ব দেয়া হয়। নয় নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার হিসেবে সমগ্র সাতক্ষীরা অঞ্চলে গেরিলা, সম্মুখ ও নৌকমান্ডো যুদ্ধসমূহ পরিচালনা করেন। এছাড়া বরিশালের দোয়ারিকায় পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করেন এই যোদ্ধা। তার নেতৃত্বে রাজধানীর মিরপুরও মুক্ত হয়।


মুক্তিযোদ্ধা মাহফুজ আলম বেগ। তার বাবার নাম প্রফেসার হোসাম উদ্দিন। তিনি বরিশাল বিএম কলেজের নামকরা প্রফেসার ছিলেন। বেগের মায়ের নাম মর্জিনা বেগম। তাদের পৈতৃক বাড়ি ভারতের মালদহ হলেও ১৯২০ সাল থেকেই বরিশাল শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। ৭ ভাই ও ৫ বোনের মধ্যে বেগ পঞ্চম। তার বড় ভাই মাহমুদ আলম বেগ ছিলেন ব্যাংকার। আর মেজ ভাই মনজুরুল আলম বেগ একুশে পদকপ্রাপ্ত দেশের প্রখ্যাত ফটোগ্রাফার।


বীর এই মুক্তিযোদ্ধা আজ আসহায়ভাবে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। সরকারি দায়িত্বশীল পদে থেকেও নিজের নীতি আদর্শ এবং সততার কারণে আজ নিজের কোনো বাড়ি নেই তার। সাব সেক্টর কমান্ডার হয়েও পাননি কোনো সরকারি প্লট। দুইবার আবেদন করেও জুটেনি কোনো সরকারি প্লট। থাকছেন ভাড়া করা বাসাতে। অথচ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের প্রত্যক্ষ নির্দেশে সাব-সেক্টর কমান্ডার হিসেবে পাকিস্তানি শোষণ-নির্যাতন, অত্যাচারের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে যুদ্ধের ময়দানে লড়াই করেছেন বীর এই মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধার টিম গঠন করেছেন। শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য তাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। সাব-সেক্টর কমান্ডার হিসেবে যুদ্ধ পরিচালনা করে শত্রুমুক্ত করেছেন কয়েকটা জেলা। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার মনের মধ্যে আজ হতাশা আর কষ্টই নিত্যসঙ্গী। এসব পরিস্থিতি সম্পর্কে বলার মতো এখন মানুষের বড়ই অভাব। মুক্তিযোদ্ধাদের কান্না শোনার কেউ নেই। কে শুনবে তাদের কান্না?


সম্প্রতি সাভার পুলিশ টাউনে নিজে ভাড়া বাসাতে বীর মুক্তিযোদ্ধা সাব-সেক্টর কমান্ডার লে. মাহফুজ আলম বেগের সাথে আলাপকালে এসব কথা উঠে আসে। বিবার্তা২৪-এর সেই সাথে একান্ত আলাপে জানা গেল তার একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের অজানা সব ঘটনার কথা। পাঠকদের উদ্দেশে সেই গল্পগুলো এখানে ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হলো।



রিশালের ওয়াবদা রেস্ট হাউজে পাকিস্তানি বেলুচ রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন কাহারকে (সাদা শার্ট পরিহিত) বেগ (তার বামে) যখন ইন্ডিয়ান আর্মিদের কাছে তুলে দেন।


বিবার্তা : মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য কোন বিষয়টি আপনাকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে ?


মাহফুজ আলম বেগ : ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) যে ভাষণ দিয়েছিলেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান, সেখানেই এসেছিল স্বাধীনতার ডাক। লাখো বাঙালির উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু উচ্চারণ করেন তার চূড়ান্ত নির্দেশনা, ‘তোমাদের যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাক। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব- এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব, ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।’বঙ্গবন্ধুর এই ডাকে আর বসে থাকতে পারিনি। মনের মধ্যে এক তীব্র প্রতিবাদের স্পৃহা জেগে উঠে। কমান্ডো ট্রেনিং যখন নিয়েছি তখন দেশের জন্য লড়াই করেই মরবো। সিদ্ধান্ত নেই মরতে যদি হয় তাহলে বীরের মতো লড়াই করেই মরবো।


বিবার্তা : মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ কোথায় করেছেন ?


মাহফুজ আলম বেগ: আমার কমান্ডো ট্রেনিং হয় পাকিস্তান কমান্ডোদের হেডকোয়ার্টারে চিরাটে। বিভিন্ন বাহিনী থেকে ট্রেনিং নিতে আসা ৫০০ জন থেকে কোয়ালিফাই করে মাত্র ১৫ থেকে ২০ জন। ওটা ছিল কমান্ডোদের বেসিক ট্রেনিং। এরপরই একেকজন একেক বিষয়ে স্পেশাল ট্রেনিং নেই। আমি ছিলাম পাকিস্তান সেনাবাহিনীর স্পেশাল সার্ভিস গ্রুপ (এসএসজি)-এর একজন এলিট কমান্ডো। আরো বেশ কিছু বাঙালিরা ছিলেন যারা প্রফেশনাল কমান্ডো ছিলেন। তারা মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানীদে হাতে ধরা পড়েন। দীর্ঘ দিন কারাবাসে থেকে পাকিস্তানীদের দ্বারা অত্যাচারিত ও নির্যাতিত হন। দেশ স্বাধীনের পর তাদের কারামুক্ত করা হয়। এদের মধ্যে ছিলেন প্রতীক জরুরি, আজাদ, দিকে উদ্দিন, রাজ্জাক, রহমান, লে. মিজান, লে. আমজাদ, লে. রুফ, লে. রহমানসহ আরো অনেকে। এই মানুষগুলো সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করলেও সব সময় দেশের ভালর জন্য গঠনমূলক চিন্তা-ভাবনা ও আলোচনা করতাম।


বিবার্তা : করাচিতে প্রশিক্ষণের সময় আপনি কী একাই বাঙালি ছিলেন?


মাহফুজ আলম বেগ : করাচিতে বাঙালি গ্রুপ ছিল আমাদের। কামাল সাহেব ছিলেন, পরে তিনি আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি হন। ছিলেন সুলতান সাহেবও। উনিও আমেরিকার ট্রেনিংপ্রাপ্ত কমান্ডো। একাত্তরে ক্যাপ্টেন সুলতান নামে নাইন সেক্টরের ইনডাকশন ক্যাম্পের কমান্ডার ছিলেন। আর নূর মোহাম্মদ ক্যাপ্টেন বাবুল নামে ট্রুপস নিয়ে ফরিদপুরে যুদ্ধ করেছেন। এখন তিনি ফরিদপুর আওয়ামী লীগের বড় নেতা। আমরা তখন করাচিতে একত্রে ভাষাদিবস, নববর্ষসহ নানা অনুষ্ঠান পালন করতাম।



বঙ্গ বজ্র নামের এই লঞ্চ দুটি নয় নম্বর সেক্টরের গানবোট হিসেবে ব্যবহৃত হয়।


বিবার্তা : প্রশিক্ষণের সময় কীভাবে দেশের খোঁজ নিতেন?


মাহফুজ আলম বেগ: ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাস। দেশ তখন উত্তপ্ত। আমাদের মধ্যে কিছু ইন্টেলিজেন্সের লোকজন ছিল। তাদের মুখেই শুনতাম পূর্ব পাকিস্তানে কিছু একটা ঘটবে। তখন উদগ্রীব হতাম। চিন্তা হতো দেশকে নিয়ে। আন্ডার ওয়াটার ফিশিং করার ঝোক ছিল আমার। একদিন করাচি নেভাল পোর্টে ফিশিং করতে গিয়ে দেখি পূর্ব পাকিস্তানে আসার জাহাজে হেভি আর্মস অ্যামুনেশন লোড করা হচ্ছে। তখনই বুঝে যাই ওরা খারাপ কিছু ঘটাবে। কিন্তু কমান্ডো হয়ে তো বসে থাকতে পারি না! ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। কয়েকদিনের ছুটিতে দেশে আসি। সুলতান সাহেব ও নূর মোহাম্মদ ভাই ইতিমধ্যে অবসরে ফিরে এসেছেন। তাদের সঙ্গেই মিটিংয়ে বসি। পরিকল্পনা হয় খারাপ কিছু ঘটার আগে তারাই করাচিতে আমাকে মেসেজ পাঠাবেন। ফিরে এসে তাদের সঙ্গে যুক্ত হবো।


বিবার্তা : তারপর. . .


মাহফুজ আলম বেগ : ছুটি কাটিয়ে পাকিস্তান ফিরে গেলাম। হঠাৎ একদিন কমান্ডিং অফিসার টি এ খান একটি টেলিগ্রাম হাতে ছুটে আসেন। টেলিগ্রামে লেখা, ‘মাদার সিরিয়াস কাম শার্প।’বুঝে গেলাম এটি নূর মোহাম্মদ ভাই পাঠিয়েছেন। ‘মাদার’মানে মাতৃভূমি। আর ‘সিরিয়াস’ লিখলে বুঝতে হবে যেভাবেই হোক ফিরে যেতে হবে। টি এ খান ছুটি দিতে চাইলেন। কিন্তু আমি নিজেকে সংযত রাখলাম। ‘মায়ের চেয়ে দেশ আগে’ এমন উত্তর শুনে অবাক হয়ে উনি মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। পালিয়ে যাব এটা বুঝতে দিলাম না তাকে। কারণ ওরা নানাভাবে আমাদের সন্দেহ করতো। তখন ফরমাল ছুটি না নিয়েই পালানোর পরিকল্পনা করি। টাকার প্রয়োজনে শখের মোটরসাইকেলটাও বিক্রি করি নয়শ টাকায়। ঘনিষ্ট বন্ধু ছিল অলি। দেশ নিয়ে সেও চিন্তিত। পরিকল্পনার কথা শুনে তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকেও সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করলো। রাজি হলাম। কিন্তু প্লেনের টিকিট তো নাই। অলরেডি পাকিস্তান থেকে লোকজন আসা বন্ধ। শুধু হাজিদের ফ্লাইট ওপেন ছিল।


বিবার্তা : তাহলে দেশে ফেরেন কীভাবে?


মাহফুজ আলম বেগ : তখন মনে পড়ে গেলো লেফটেন্যান্ট ইমতিয়াজের কথা। পাকিস্তানের বাইশ ফ্যামিলির, ধনী পরিবারের সন্তান। চেরিয়ট ট্রেনিংয়ে আমি ছিলাম তার ট্রেনার। ওই সময় সে প্রায় ৬০ ফিট পানির নিচে চলে যায়। ফলে আনকনশাস অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে প্রাণে বাঁচিয়েছিলাম। সেই থেকেই পরিবারিকভাবে একটা বিশ্বস্ত সম্পর্ক ছিল তার সঙ্গে। পাঞ্জাবি হলেও তার কাছেই সাহায্য চাইলাম। সেও সবকিছু গোপন রেখেছিল।পাকিস্তান এয়ারলাইন্সে চাকরি করতেন তার এক আত্মীয়। তৎকালীন আওয়ামী লীগের সেন্ট্রাল নেতা গগন ভাই। তার মাধ্যমে দুটো টিকেট জোগাড় করে দেন ইমতিয়াজ। রাত দুটোর ফ্লাইটে পাকিস্তান থেকে রওনা হয়ে ৪ মার্চ ১৯৭১ তারিখ ভোরে পৌঁছি ঢাকায়।



বরিশাল যাওয়ার পথে নয় নম্বর সেক্টরের ‘হার্ড কর্পস অব সার্জেন্টস’ (বিচ্ছুবাহিনী)।


বিবার্তা : দেশের ফেরার পরের ঘটনা জানতে চাই।


মাহফুজ আলম বেগ : ছোট ভাই মাহবুব আলম বেগ তখন ছাত্রলীগ করতো। তোফায়েল আহম্মেদসহ তৎকালীন ছাত্র নেতাদের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক ছিল। তাকে নিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করে সব কথা খুলে বললাম। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘তুই যা বললি সেটা আমি জানি। পায়জামা পাঞ্জাবি পরে সেলিমদের সাথে মিশে থাকবি। সেলিম তোকে বলবে তোর কি করতে হবে।’বুঝলাম বঙ্গবন্ধু নিজেও একটা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ৭ মার্চ ভাষণের পর শেখ সেলিম ও কিছু ছেলেসহ আমরা নারায়ণগঞ্জে একটা বাড়িতে আস্তানা গাড়ি। সেখানে পেট্রোল আর সাবান এনে মনোটল ককটেল বানানো শুরু করি। অসহযোগে ঢাকায় ও আশপাশে যত ককটেল ব্যবহৃত হয়েছে সেগুলো অধিকাংশই ছিল নারায়ণগঞ্জের। এরপর বলা হলো কলাতিয়া চলে যেতে। ওখানে গগনদের বাড়িতে ক্যাম্প করতে হবে। যদি কোনো ঘটনা ঘটে বা পাকিস্তানিরা বিশ্বাসঘাতকতা করে তখন নেতারা কলাতিয়াতে আশ্রয় নিবেন। আমার দায়িত্ব তাদের সেভ ডেসটিনিতে পাঠিয়ে দেয়া। গগন ছিল ওখানকার আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। তার বড় ভাই গ্রামের চেয়ারম্যান। সেখানে গিয়েই ক্যাম্প করলাম। ট্রেনিং দেয়াও শুরু হয়। বাড়ির সামনে ছিল একটা পুকুর। পুকুরের ওপারে বোতল রেখে গুলির ট্রেনিং দিতাম। অস্ত্র ছিল একটা পয়েন্ট টু টু রাইফেল। ওখানে ছিলেন তোফায়েল আহমেদ, রাজ্জাক সাহেব, সিরাজুল আলম খান, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, শেখ ফজলুল হক মনি, আমেনা বেগম, মন্টু, আরেফ প্রমুখ।


বিবার্তা : এরপর. . .


মাহফুজ আলম বেগ : ধীরে ধীরে আমরা স্থানীয়দের বন্দুক সংগ্রহ করা শুরু করি। জয়দেবপুরে বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেনারা তখন বিদ্রোহ করে বেরিয়ে এসেছে। একদিন ক্যাম্পে আসেন আ স ম আব্দুর রব। সঙ্গে বেঙ্গল রেজিমেন্টের ৫ জন সেনা। তাদের কাছে ছিল একটা চাইনিজ এসএমজি আর চারটা চাইনিজ রাইফেল। তখনই প্রথম মর্ডান আর্মস পাই। ২৫ মার্চ রাতে গণহত্যা শুরু হলে ক্যাম্প ছেড়ে চলে যাই নরসিংদীতে, ক্যাপ্টেন মতিউর রহমানের গ্রুপে। শিল্পী আপেল মাহমুদও ছিলেন ওখানে।


বিবার্তা : নরসিংদীতে তখন কী ঘটেছিল?


মাহফুজ আলম বেগ : পাকিস্তানি সেনারা ঢাকা থেকে তারাবো দিয়ে নরসিংদীর দিকে অ্যাডভান্স হচ্ছে। তখন আমাকে দায়িত্ব দেয়া হয় ঠেকানোর। একটা দল নিয়ে আমি এগিয়ে যাই অ্যাম্বুশের জন্য। আমাদের প্রথম অ্যাটাকেই পাকিস্তানি সেনাদের দুটি ট্রাক রাস্তার দুদিকে পড়ে যায়। ফলে হতাহত হয় অনেক সেনা। কিন্তু পরদিনই তারা ফুলফেইজে বম্বিং করে অ্যাডভান্স হয়। ফলে তাদের আক্রমণের তোপে আমরা টিকতে পারিনি। পরে ফিরে এসে দেখি ডিফেন্স নেই। তখন যে যার মতো আত্মোগোপনে চলে যাই। আমি নৌকায় করে চলে যাই লৌহজং।



যুদ্ধের সময় মাহফুজ আলম বেগ।


খুলনার শ্যামনগর, কালিগঞ্জ, দেবহাট্টার বিশাল অঞ্চল মুক্ত করার আমাকে দায়িত্ব দেয়া হয়। তখন একটা বিশাল লঞ্চ ছিল বিউটি অব খুলনা। এটা মুক্তিযোদ্ধাদের বেটালিয়ন ছিল। এখানে উন্নত মানের মেশিনগান ও যুদ্ধের অস্ত্র ছিল। আমরা সেগুলো নিয়ে বরিশালের দিকে রওনা হই। বরিশালে গিয়ে দখল করার পরে আামাকে সাব-সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব দেয়া হয়। কারণ বরিশালের আগের যে সাব-সেক্টর কমান্ডার ছিলেন উনার পায়ে গুলি লাগায় অসুস্থ হয়ে যান।


বিবার্তা : বরিশালে গিয়ে কী করেন?


মাহফুজ আলম বেগ : বরিশাল গিয়েই ছাত্রদের ত্রিশজনের একটা গ্রুপকে রাইফেল ট্রেনিং দেয়া শুরু করি। চিফ হুইপ ফিরোজ, আফজাল, প্রফেসার সালাম এরাও ছিলেন ওখানে। ইছাকাঠি গার্ডেন, কাশিপুরে ট্রেনিং করাই। জায়গাটা ছিল লাকুটিয়া জমিদার বাড়ির একটা মাঠে। প্রথমে বরিশাল ক্যান্টনমেন্ট মুক্ত করি। পাকিস্তান আর্মিদের সারেন্ডার করাই। তাদেরকে বন্দি করে বরিশাল ক্যান্টনমেন্ট নিয়ে রাখা হয়। বাঙালি মুক্তিযোদ্ধারা ছিল সাধারণ, লুঙ্গি, শার্ট, পাঞ্জাবি পরা অবস্থায় আর তাদের কাছে ওই পাকিস্তানি আর্মিরা তাদের কাছে সারেন্ডার করতে বাধ্য হয়। ওই দৃশ্যটা আজো আমার মনে পড়লে শিউরে উঠি। পাকিস্তানিদের ক্যান্টনমেন্টে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। কিছু দিন পর স্টিমারে করে পাকিস্তান আর্মিরা আসে। আমি তাদের বলেছি দেখুন আপনাদের আর্মিরা আমাদের কাছে কারাবন্দি আছে। তাদের নিয়ে যান। তখন তারা স্টিমারে করে তাদের বন্দিদের নিয়ে যায়।


সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন বিবার্তার নিজস্ব প্রতিবদেক। ছবি : খলিলুর রহমান।


ওই সময়টাতে ‘জয়বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ -স্লোগানই ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। প্রথম দিকে সবাই ছিল আইডিওলজিক্যাল ফ্রিডম ফাইটার। যারা হৃদয় দিয়ে বিশ্বাস করতো বাংলাদেশ একদিন স্বাধীন হবে। পাকিস্তানি সেনারা বরিশাল দখল করলে আমরা চলে যাই আটঘর কুড়িআনায়। পেচানো খাল আর পেয়ারাবাগান ওখানে। চলাচলের জন্য ‘হাক্কা’ছিল একমাত্র উপায়। বরিশালের ভাষায় ‘হাক্কা’হলো একটি বাঁশ। একটি বাঁশ দিয়ে তৈরি পুল দিয়েই চলাচল করতে হতো। ফলে বুট পরে তার ওপর দিয়ে যাওয়া খুব কঠিন। এসব কারণে জায়গাটা আমাদের জন্য নিরাপদ ছিল। তবুও পাকিস্তানি সেনারা গানবোট নিয়ে আক্রমণের চেষ্টা করতো।


রমা দাস, বিথিকা রাণী বিশ্বাস, সমিরন, হরিহর বিশ্বাসসহ আরও অনেক ছেলে ও মেয়ে ওখানে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। অধিকাংশই ছিল কলেজের ছাত্রী। এছাড়া সেখানে ছিল তোফাজ্জল হোসেন খোকা, পরিমল, ভুলু, তারেকসহ প্রায় ৫০ জনের মতো মুক্তিযোদ্ধা। আমাদের কাছে দুইটা স্টেনগান, ত্রিশটার মতো রাইফেল। তা দিয়েই যতটা সম্ভব ঠেকিয়েছি। রাজাকার বাহিনীও মাঠে নেমেছে তখন। ছোটখাট যুদ্ধও চলেছে। এক সময় অস্ত্রের সংকটে পড়ি। তখন নির্দেশ আসে ছোট্ট ছোট্ট দলে ভাগ হয়ে ইন্ডিয়ায় চলে যাওয়ার। ফলে সবাইকে ট্রেনিংয়ের জন্য ইন্ডিয়ায় পাঠিয়ে দিই।



বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহফুজ আলম বেগ যুদ্ধের ছবি দেখাচ্ছেন বিবার্তা প্রতিবেদক খুললুর রহমানকে।


বিবার্তা : আপনার পরিকল্পনা কী ছিল?


মাহফুজ আলম বেগ : সবাইকে ট্রেনিংয়ের জন্য ইন্ডিয়ায় পাঠিয়ে আমি বরিশাল থেকে লঞ্চে করে ঢাকায় ফিরি। পরিকল্পনা করি বোনের সঙ্গে দেখা করে রাজশাহী হয়ে মালদহে ঢোকার। বোনের শশুড়বাড়ি ছিল কানসাটে। সেখানে বর্ডার ক্রস করতেই প্যাচানো গোফ দেখে পাকিস্তানি স্পাই ভেবে বিএসএফ আমাকে থানায় নিয়ে যায়। পরে ছাড়া পেয়ে চলে যাই কলকাতায়, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক অফিসে। তখন প্রখ্যাত আওয়ামী লীগ নেতা ফণিভুষণ মজুমদার আমাকে নাইন সেক্টরের হেডকোয়ার্টার হাসনাবাদে যাওয়ার পরামর্শ দেন। নাইন সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন মেজর এম এ জলিল। তিনি আমাকে পেয়ে খুব খুশি হন এবং ওই দিনই ট্রেনিং থেকে আসা একটি কোম্পানির দায়িত্ব দেন। দায়িত্ব পেয়ে ভারতের বসন্তপুরের পাশে বর্ডারে রাইস মিলে প্রথম ঘাঁটি গড়ি। সামনে নদী। ওপারে ছিল পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্প। আমার গ্রুপে প্রথম দুইশজন মুক্তিযোদ্ধা থাকলেও পরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫০০তে। নাইন সেক্টরের অপারেশনাল কমান্ডারেও দায়িত্ব পালন করি। পরে আমাকে শমশেরনগর সাবসেক্টরের দায়িত্ব দেয়া হয়।


বিবার্তা/গমেজ/জাই


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com