‘আমি জানি না এ স্ট্যাটাস লেখার জন্য বেঁচে থাকতাম কিনা’
প্রকাশ : ০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ২০:৪০
‘আমি জানি না এ স্ট্যাটাস লেখার জন্য বেঁচে থাকতাম কিনা’
বিনোদন ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

রাজধানীর কুড়িলে যমুনা ফিউচার পার্কে শুক্রবার সন্ধ্যায় বাবার সঙ্গে কেনাকাটা করতে গিয়ে আহত হন বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পী তাসনিয়া ফারিণ। এ ঘটনায় তার দুই পা জখম হয়। পরে তাকে রাজধানীর একটি হাসপাতালে নিয়ে জরুরি বিভাগে চিকিৎসা দেয়া হয়।


এবার আহত হওয়ার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বিস্তারিত লিখেছেন তাসনিয়া। তার পোস্টটি হুবহু তুলে দেয়া হলো-
`গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার আশেপাশে যমুনা ফিউচার পার্কের প্রথম ফ্লোর থেকে গ্রাউন্ড ফ্লোরে নামার সময় গেট দিয়ে ঢুকেই যে মেইন এস্কেলেটরটা সেটায় আমার দুর্ঘটনা ঘটে। সিঁড়ির নিচে যে অ্যালুমিনিয়ামের নাকি স্টিলের সেটা জানি না, সে পাত খুলে বের হয়ে ধারালো কোণা আমার পায়ে আঘাত করে।


আমি সিঁড়ির ডান পাশে ছিলাম। আর ওইটা ছিল ঊর্ধ্বমুখী। সংঘর্ষ হয় আমার পরনের প্যান্ট ছিঁড়ে যায় অনেকটুকু। আর পায়ের বিভিন্ন স্থান ছিলে যায় ও ডিপ কাট হয়, যেটা পরবর্তীতে টের পাই। কিন্তু ওই মুহূর্তের শুধু একটা ইমেজ আমার মাথায় ঘুরে ফিরে বারবার আসছে তা হলো কিছু বোঝার আগে সবাই গগনবিদারী চিৎকার করে উঠল। আমি দেখলাম ডান পা স্ক্র্যাচ করে পায়ের পাশ দিয়ে মাঝখান হয়ে বাম পায়ের উপরের দিকে একটা পাত ঢুকে যাচ্ছে। আর চলন্ত সিঁড়িটিও আমাকে আরো সেদিকেই ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে।


যদি গতকাল ফ্র্যাকশন অব সেকেন্ডের মধ্যে আমাকে আমার ভাই পেছন থেকে টান দিয়ে না সরাত কিংবা আমার বাবা যদি আমাদের দুজনকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে না দিতো, আমি জানি না আজকে এ স্ট্যাটাস লেখার জন্য বেঁচে থাকতাম কিনা। হয়তো থাকতাম। তবে আমার পা থাকতো না অথবা আমি কখনো মা হতে পারতাম না। সে পরিস্থিতির ভয়াবহতা হয়তো লিখে বা বলে বোঝানো সম্ভব নয়। আমি নিচে নেমে দাঁড়ানোর কয়েক সেকেন্ডের কিছুই আমার মনে নেই। সম্বিত ফেরার পর দেখি আমার হাঁটুর উপর থেকে প্যান্ট ছেঁড়া এবং পুরো পা ঝা ঝা করছে। ততক্ষণে অনেক লোক জড়ো হয়ে গেছে।


মজার ব্যাপার হলো আমার এই ঘটনাকে আমি এক্সিডেন্ট মানতে নারাজ। কারণ, আমার এ ঘটনা ঘটার কমপক্ষে ১৫ মিনিট আগে আরেক ব্যক্তির সঙ্গে একই ঘটনা ঘটে। তার পায়ের মাংস ভেদ করে ওই পাতের কোণা ঢুকে যায়। উনি নিজে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে লোকজন নাকি সাবধান করছিলেন এবং দায়িত্ববান কাউকে খুঁজছিলেন। শেষে কাউকে না পেয়ে হেল্প ডেস্কে যান। এর মধ্যে আমার এ ঘটনা ঘটে। সঙ্গে আরো একজন ভুক্তোভোগীকে খুঁজে পাই।


আমার চিৎকার চেঁচামেচিতে ফাইনালি একজন স্টাফ আসেন। অনেকবার বলার পর ম্যানেজার কল করেন। ততক্ষণে প্রচুর মানুষ জড়ো হয়ে গেছে। ব্যথার চেয়ে বেশি ফিল হচ্ছিল হিউমিলিয়েশন। ওখানে কোনো সিন ক্রিয়েট করার চেয়ে আমার মনে হয়েছে, ঠাণ্ডা মাথায় এটার সমাধান করা দরকার। তাই আমি বলার পর দুই কর্মচারী আমাদের তিনজন আহত ব্যক্তি এবং তাদের সঙ্গে যারা ছিলেন, সবাইকে বেসমেন্ট ১ এ নিয়ে যায়।


আমাদের ধারণা ছিল নিশ্চয়ই দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে। আশ্চর্য বিষয় হলো এত বড় মলে কোনো অ্যাম্বুলেন্স অথবা ফার্স্ট রেস্পন্ডার তো দূরে থাক, একটা ফার্স্ট এইড বক্স নেই!! ১৫/২০ মিনিট তারা শুধু এ ফার্মেসি সেই ফার্মেসি ফোন করল। কেউ নাকি দোকান ছেড়ে আসতে পারবে না। অবশেষে আধা ঘণ্টা পর একজন আসেন। আর ওই দুই ব্যক্তির চিকিৎসা করেন। কিন্তু ফিমেল ডক্টর ছাড়া আমার চিকিৎসা সম্ভব ছিল না।


এর মধ্যে আমার ভাইকে পাঠালাম একটা ট্রাউজার কিনে আনার জন্য। যমুনা ফিউচার পার্কের কর্তৃপক্ষের মতে এই দুর্ঘটনা নাকি বেশি লোক ওঠার কারণে হয়েছে! তার মানে কি আপনারা আগে থেকেই জানতেন? নাকি ধারণক্ষমতার বেশি লোড নিয়ে আগে থেকেই এ অবস্থায় ছিল তা আপনারা টেরই পাননি? আর একজনের সঙ্গে এটা হওয়ার পরও কেনো কোনো একশন নেননি আপনারা?


এস্কেলেটরের দায়িত্বে থাকা কাউকে ডাকতে বললে বলে সে আসেনি। আর আমার এ পরিস্থিতিতে তারা আমাকে চা কফি অফার করেন, যেখানে আমার বসার মতো পরিস্থিতিতে নেই। যা হোক কাপড় বদলে আমাদের গাড়ি করে এভারকেয়ারের ইমার্জেন্সিতে যাই। ড্রেসিং, স্টিচিং, এক্স-রে, ইনজেকশনের পর রাত ১২টায় ছাড়া পাই।


তাদের একজন কর্মকর্তা হসপিটাল পর্যন্ত আসেন আমরা বলার কারণে। বিলের প্রসঙ্গ উঠতে বলেন, আমি কেন দেব? আপনাদের ২/৪ টাকার আমার দরকারও নেই। কিন্তু মানবিকতাও নেই?! যেখানে আপনারা নিজে দোষ স্বীকার করেছেন এবং আপনার কাছে কোনো ক্ষতিপূরণ পর্যন্ত আমি চাইনি। একটা সামান্য ইমারজেন্সির বিল দেয়ার মানসিকতা আপনাদের নেই? উনাদের মতে, এটার বিচার হচ্ছে তারা অভ্যন্তরীণভাবে সুষ্ঠ (!) তদন্ত করবেন।


আজকে আমার বা অন্য কারো প্রাণ গেলেও তাদের কিছুই হতো না। আমার সারারাত ঘুম হয়নি। মেন্টালি ট্রমাটাইজড। আমার ভাই যদি আমার পেছনে আজকে না থাকত বা আমাকে ধরতে যদি একটু দেরি করে ফেলত, তারপর কী হতো আমি চিন্তাও করতে চাই না। আল্লাহ যাতে কাউকে জীবনে এই পরিস্থিতিতে না ফেলে। আর আপনারা লিফট বা এস্কেলেটর যাই ব্যবহার করেন না কেন নিজের সাবধানতা অবলম্বন করবেন।


আমি শারীরিকভাবে সুস্থ আছি। ডক্টর পাঁচ দিন বেড রেস্ট আর এন্টিবায়োটিক দিয়েছে। বোন ইনজুরি হয়নি। বসতে পারছি না। আর ডান দিকে কাত হয়ে শুতে হচ্ছে। তবে মানসিক এই ট্রমা কি আদৌ কোনো দিন কাটবে কিনা জানি না। সবচেয়ে বেশি ফিল হচ্ছে হতাশা। মরে গেলেই মানুষ কোনো বিচার পায় না। আমি তো বেঁচে আছি আমার আর কি বিচার হবে।


উল্লেখ্য, ১৫ ডিসেম্বর মুক্তি পাবে তাসনিয়ার আলোচিত ওয়েব সিরিজ ‘কারাগার’-এর দ্বিতীয় কিস্তি। চলতি মাসেই ‘আরও এক পৃথিবী’ দিয়ে বড় পর্দায় অভিষেক হওয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু ছবিটির মুক্তি পিছিয়ে গেছে।


বিবার্তা/বিএম

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com