‘৩ নভেম্বরের হত্যাকারীরা শঙ্কাময় বাংলাদেশ তৈরি করতে চেয়েছিল’
প্রকাশ : ০৩ নভেম্বর ২০২২, ২০:৪৮
‘৩ নভেম্বরের হত্যাকারীরা শঙ্কাময় বাংলাদেশ তৈরি করতে চেয়েছিল’
বিবার্তা প্রতিবেদক
প্রিন্ট অ-অ+

যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে জেল হত্যা দিবস ২০২২ পালন করেছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।


বৃহস্পতিবার (৩ নভেম্বর) এ উপলক্ষ্যে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গীভূত বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশ গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।


জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. মশিউর রহমানের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন সাবেক শিল্পমন্ত্রী ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য বর্ষীয়ান রাজনীতিক আমির হোসেন আমু এমপি।


অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এমপি। এছাড়া সম্মানিত আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ড. হারুন-অর-রশিদ, গাজীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় চার নেতার একজন তাজউদ্দীন আহমদের কন্যা সিমিন হোসেন রিমি, কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় চার নেতার একজন সৈয়দ নজরুল ইসলামের কন্যা ডা. সৈয়দা জাকিয়া নূর লিপি।


সভাপতির বক্তব্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. মশিউর রহমান বলেন, ‘৩ নভেম্বরের হত্যাকারীরা অনিরাপদ ও শঙ্কাময় বাংলাদেশ তৈরি করতে চেয়েছিল। এ দিন একটি শিশুপুত্র অপেক্ষায় ছিল পিতা ফিরবে। পিতা ফিরেছে। কিন্তু লাশ হয়ে। ওই শিশুটির বয়স তখন ছয় বছর। নাম সোহেল তাজ। বাবার লাশ পেয়ে নিজে দাফন করেছে। বাবার লাশ দাফন করে মাকে বলেছে, দাফন করে এসেছি। শিশুপুত্রের জন্য খুনীরা, বাংলাদেশ বিরোধীরা অনিরাপদ বাংলাদেশ তৈরি করতে চেয়েছে। তারা হত্যাকারী, ষড়যন্ত্রকারী, পিতা হত্যাকারী, বাংলাদেশ হত্যাকারী। ৩ নভেম্বর, ১৫ আগস্ট, ২১ আগস্ট- এসব অভিন্ন যোগসূত্রে গাঁথা। তারা বাংলাদেশ বিরোধী অপশক্তি।’


দেশের প্রথিতযশা এই সমাজবিজ্ঞানী বলেন, ‘আজও তারা যখন গণতন্ত্রের কথা বলে মূলত শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানাসহ বঙ্গবন্ধুর উত্তরাধিকার ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে অনিরাপদ করতে চান। আমাদের সকল বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি দিয়ে, সাংস্কৃতিক জাগরণ দিয়ে, বাংলাদেশ বিরোধী অপশক্তিকে সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ করতে হবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা দিয়ে জ্ঞানের আলোয় মুক্তবুদ্ধির মানুষ তৈরি করবে। বিশ্বজনীন মানবতাবাদী রাষ্ট্র কায়েম করে, বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লব প্রতিষ্ঠা করে নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত করে একটি জাতি বিনির্মাণই হোক আমাদের প্রত্যয়।’


প্রধান অতিথির বক্তব্যে সাবেক শিল্পমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমু বলেন, ‘১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করার ঘটনা কোনো ব্যক্তি বা পরিবার কেন্দ্রিক ছিল না। এটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। এটি আরও বেশি স্পষ্ট হয়েছে ৩রা নভেম্বর যখন জাতীয় ৪ নেতাকে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের মধ্যদিয়ে পরিষ্কার হয়েছে- বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে যারা ছিল তাদের ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে পরিকল্পিতভাবে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে এবং জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়েছে।’


দেশের বর্ষীয়ান এই রাজনীতিক বলেন, ‘১৫ আগস্টের পর বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লব বাকশাল নিয়ে এত কথা বলা হয়েছে। তাহলে কেন জিয়াউর রহমান চিঠির পর চিঠি দিয়ে বাকশালের সদস্য হওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধুর কাছে তদবির করেছিলেন। জিয়াউর রহমানের সদস্য হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু জোর করে তদবির করে তিনি কেন সদস্য হলেন। এর কোনো প্রতিবাদ হয়নি। শেখ হাসিনা দেশে আসার আগ পর্যন্ত এই দেশে কয়জন বুদ্ধিজীবী ১৫ আগস্টে হত্যাকাণ্ড, ৩ নভেম্বরের হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে, কথা বলেছে? আমার জানা মতে কেউ করেনি। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে যারা এই দেশকে পেছনে নিয়ে যেতে চায় তারাই ষড়যন্ত্র করে। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে আসার পর তাঁকে বার বার হত্যার ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। কয়জন এর প্রতিবাদ করেছেন? আজকে যারা গণতন্ত্রের কথা বলেন- তারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে দেশে স্বৈরশাসন কায়েম করেছিলেন। হত্যাই ছিল তাদের একমাত্র রাজনীতি। কিন্তু এখন তারা গণতন্ত্রের কথা বলে এদেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করছে।’


প্রধান আলোচকের বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, ‘জাতীয় ৪ নেতাকে খন্দকার মোশতাক সমঝোতার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। মোশতাকের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও তাঁরা তা গ্রহণ করেননি। সমঝোতার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে মৃত্যুকেই আলিঙ্গন করলেন জাতীয় ৪ নেতা। যারা এই নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটিয়েছে, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ছিল, যারা হত্যাকারীদের শুধু পুরস্কারই দেয়নি, তাদের দায়মুক্তি দিয়েছে। আজ তারা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। তাদের মুখে আস্ফালন শুনি- তারা চায় আবার পঁচাত্তরের হাতিয়ার জেগে উঠুক। যেকোনো মূল্যে তাদের প্রতিহত করতে হবে।’


তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের এখন আর স্বাধীনতা এবং ভাষার জন্য রক্ত দেয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের পূর্বসূরিরা এ কাজগুলো করে গেছেন। অনেক পূর্বসূরিরা গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় রক্ত ঝরিয়েছেন। এখন আমাদের কাজ, যে গণতন্ত্র আছে তা আরও সুসংহত করা। উন্নয়নকে আরও উন্নত করা। জীবনমান বাড়ানোর চেষ্টা আমাদের করা দরকার। এটি করতে হলে তরুণ প্রজন্মকে নৈতিক মূল্যবোধে বলীয়ান হতে হবে। নতুন প্রজন্মকে দক্ষ, যোগ্য ও মানবিক, সংস্কৃতিবান, ইতিহাস সচেতন সুন্দর মানুষ হিসেবে গড়ে তোলতে হবে; যেন আমাদের গণতন্ত্রকে আরও সুসংহত করতে পারি। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়তে পারি।’


সম্মানিত আলোচকের বক্তব্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ড. হারুন-অর-রশিদ বলেন, ‘১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন জিয়াউর রহমান। অনেকে তাকে বলে তিনি ঘটনাক্রমে বেনিফিশিয়ারি হয়েছেন। কিন্তু তা নয়, তিনি এই হত্যাকাণ্ডর পরিকল্পনায় যুক্ত ছিলেন। এটি ছিল দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীদের পূর্বপরিকল্পিত ও নিলনকশার হত্যাকাণ্ড।’


সিমিন হোসেন রিমি বলেন, ‘জাতীয় ৪ নেতার জীবনী আমাদের নতুন প্রজন্মের অনেকেই জানেন না। তাদের জানাতে হবে। পাঠ্যবইয়ে তাদের জীবন, কর্ম, রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধে অবদানের বিষয়ে যুক্ত করতে হবে। তাহলে তরুণ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানবে। নিজের কাজটি সুচারুরূপে সম্পাদন করাই হলো প্রকৃত দেশপ্রেমিক নাগরিক হয়ে ওঠা।’


ডা. সৈয়দা জাকিয়া নূর লিপি তার বাবার স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘বাবাকে হত্যার আগে অনেক প্রলোভন দেয়া হয়েছিল কিন্তু তিনি কোনো চাপের কাছে, প্রলোভনে মাথা নত করেননি। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ ছিলেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত।’ বক্তব্যে বাবার সঙ্গে শৈশবের কিছু পারিবারিক স্মৃতিচারণ করেন সৈয়দা জাকিয়া নূর লিপি। এ সময় পুরো অডিটোরিয়ামে এক আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়।


আলোচনা সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. নিজামউদ্দিন আহমেদ, ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার প্রফেসর আবদুস সালাম হাওলাদার। অনুষ্ঠানের শুরুতেই জাতীয় ৪ নেতার প্রতি সম্মান জানিয়ে নিবেদিত সংগীত পরিবেশন করেন রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী শামা রহমান। জাতীয় ৪ নেতা স্মরণে কবিতা আবৃত্তি করেন আবৃত্তি শিল্পী শিমুল মুস্তাফা। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মোল্লা মাহফুজ আল-হোসেন। আলোচনা সভায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজগুলোর অধ্যক্ষ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভিন্ন দফতরের বিভাগীয় প্রধান, শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।


বিবার্তা/রাসেল/জেএইচ


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com