রাজা এখন খেয়া ঘাটের মাঝি
প্রকাশ : ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ১৩:৫৩
রাজা এখন খেয়া ঘাটের মাঝি
গুরুদাসপুর (নাটোর) প্রতিনিধি
প্রিন্ট অ-অ+

এক সময় অনেক জমিজমা ছিল। ধনী পরিবারের সন্তান হওয়ায় মা-বাবা নাম রেখেছিল রাজা। সব শেষ হয়ে যাওয়ার পর খেয়া নৌকা বেয়ে দশ গ্রামের মানুষ পারাপার করেন রাজা। বর্তমানে তাকে রাজা মাঝি হিসাবে এক নামে চেনে সবাই। মানুষ পারাপার করেই চলে তার সংসার। ৮৬ বছরের রাজা মাঝি বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন। শরীর জুড়ে বার্ধক্যের ছাপ ফুটে উঠেছে। কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারেন না। কানেও শোনেন না ঠিকমতো। জীবিকার তাগিদে এ বয়সেও বেয়ে চলেছেন খেয়া নৌকা।


সব প্রতিকূলতা ছাপিয়ে রাজা মাছি এখনো সেই পেশাতেই আছেন। প্রভাত ফেরি থেকে সন্ধ্যা নাগাদ রাজা মাঝি বৈঠা বেয়ে পথচারীদের গুমানী নদী পারাপার করেন। প্রতি যাত্রায় অন্তত ১৫ জন যাত্রী উঠেন তার এই খেয়া নৌকায়।


দুই হাতে বৈঠা বেয়ে খেয়া নৌকাতেই কেটে গেল রাজা মাঝির ৫৫টি বছর। এখন গুমানী নদীতে ভাটা পড়েছে। ভাটা পড়েছে রাজা মাঝির যৌবনেও। তবুও টানা অর্ধশত বছরাধিক এই একই পেশাতেই আছেন রাজা মাঝি।


স্থানীয়দের মতে,রাজা মাঝির ছিল গোলা ভোরা ফসল, গোয়াল ভোরা গরু। এখন ধন সম্পদে রাজা না হলেও খেয়াঘাটের রাজা। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের পারাপার, তাঁদের নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতায় অবদান রয়েছে তার। তাছাড়া রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ের সময় অপেক্ষমাণ যাত্রীদের পারাপারের দক্ষ নাবিক এই রাজা মাঝি।


নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার মশিন্দা ইউনিয়নের বাহাদুপাড়া গ্রামের বাসিন্দা রাজা মাঝি। বাড়ি সংলগ্ন গুমানী নদীতে খেয়া নৌকায় মানুষ পারাপারের কাজটি করছেন তিনি। তার জাতীয় পরিচয়পত্রে মো. রাজা উল্লা মণ্ডল, আর জন্ম তারিখ (৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৩২) উল্লেখ রয়েছে। তবে এলাকায় তিনি রাজা মাঝি নামেই পরিচিতি।


শনিবার রাজা মাঝির খেয়া ঘাটে গিয়ে দেখা গেল, উদাম শরীর। চামড়ায় পড়েছে বার্ধক্যের ভাঁজ। শরীরজুড়ে রগ জেগে উঠেছে। মাথায় সাদা কাপড় জড়িয়ে শক্ত হাতে বৈঠা বেয়ে খেয়া নৌকায় যাত্রী পারাপার করছেন।


নৌকায় ৮-১০ জন যাত্রী রয়েছেন। নদীর পানিতে ভাটির টান, প্রচণ্ড স্রোত উপেক্ষা করেই পারাপারের কাজটি করছেন তিনি। শরীরে শক্তি, চোখের দৃষ্টি ঠিক থাকলেও ভালভাবে কথা বলতে পারেন না তিনি। আধাভাঙা কণ্ঠে শুধুই বললেন ‘পারাপারে ১০ টিকা’।


নৌকার যাত্রী আবিদ মুন্সি ও রায়হান প্রামানিক বলেন, প্রায় পাঁচ দশক ধরে মানুষ পারাপারের কাজ করছেন তিনি। এলাকার সব মানুষকেই কম বেশি চেনেন তিনি। গ্রামের প্রায় সব বাড়ি থেকেই মাসোয়ারা পান। অপরিচিত মানুষ হলে পারাপারের জন্য ১০ টাকা করে নেন তিনি। কেউ তাকে ঠকায় না।



বাহাদুরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আলমগীর হোসেন জানালেন, যুবক বয়স থেকেই জীবিকা হিসেবে মানুষ পারাপারের পেশাটি বেছে নিয়েছিলেন রাজা মাঝি। নাটোর-সিরাজগঞ্জ জেলার সীমান্তবর্তী বাহাদুরপাড়া গ্রাম। একটা সময় প্রমত্ত ছিল গুমানী নদী। সাঁতরে পার হওয়া কঠিন ছিল। এখন নদীর সাথে রাজা মাঝির যৌবনেও ভাটা পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা কলেজ শিক্ষক আবু শামা মণ্ডল বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের পারাপারে অবদান রয়েছে এই মানুষটির। দেশ স্বাধীন হলেও রাজা মাঝির ভাগ্য বদলায়নি। জীবন-জীবিকা আর নদী-নৌকার মায়ায় এখনো বৈঠা হাতে নৌকা পারাপার করে চলছেন তিনি। বড়ই সহজ-সরল মানুষ তিনি।


রাজা মাঝির খোঁজ নিয়ে জানা গেল, তার তিন স্ত্রী। তিন পক্ষের ১৫ ছেলে ও ৫ মেয়ে। এদের মধ্যে মারা গেছেন ৫ ছেলে ও প্রথম স্ত্রী। দ্বিতীয় স্ত্রীর সাথে বনিবনা না হওয়ায় সে সন্তানদের নিয়ে অন্যত্র বসবাস করছেন। ছোট স্ত্রী বৃদ্ধ হয়েছেন। তার ৫ ছেলে।


তাদের একজন মো. জামাল মণ্ডল জানালেন, কী শীত, কী গরম। কাকডাকা ভোরে তার বাবা নৌকায় ওঠেন। বারন করলেও বৈঠা নিয়ে নৌকায় ওঠেন। নেশায় পরিণত হয়েছে। তার ভাষ্যমতে, অপরিকল্পিত সংসার ছিল বাবার। সংসারের ঘানি টানতেই নৌকার সাথে মিতালী গড়ে ওঠে তার। তবে তারা ৫ ভাই বড় হয়ে ওঠায় বাবার ওপর আর্থিক চাপ কমেছে।


খেয়াঘাটটি ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ইজারা নিয়েছেন তিনি। মানুষ পারাপার করে প্রতিদিন ২০০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা আয় হয়। তাছাড়া গ্রামের মানুষের কাছ থেকে বছর চুক্তিতে ফসলও তোলা হয়। এ আয়ের টাকায় বাবা-মায়ের জন্য একটি টিনের ঘর করে দেয়া হয়েছে। এখন সুখেই কাটছে তাদের দিন।


মশিন্দা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রভাষক মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, রাজা মাঝি একজন খাঁটি দেশ প্রেমিক মানুষ। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের পারাপারসহ নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন তিনি। পরিষদের পক্ষ থেকে তাকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা দেয়া হয়ে থাকে।


বিবার্তা/দিলু/জহির

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com