একই উঠানে মসজিদ-মন্দির
প্রকাশ : ১৭ অক্টোবর ২০১৮, ২০:৫৮
একই উঠানে মসজিদ-মন্দির
লালমনিরহাট প্রতিনিধি
প্রিন্ট অ-অ+

ধর্ম যার যার উৎসব সবার- এ কথাটির যথার্থই প্রমান মিলে সীমান্তবর্তী জেলা লালমনিরহাট শহরের কালীবাড়ি বাজারে। ধর্মীয় সম্প্রতির উজ্বল নিদর্শন হিসেবে একই উঠানে মসজিদ ও মন্দির অবস্থান করছে। এক পাশে ধুপকাঠি অন্য পাশে আতরের ঘ্রাণ। এক পাশে উলুধ্বনী, অন্যপাশে মসজিদে চলছে আল্লাহর জিকির। এভাবে ধর্মীয় সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করে যুগ যুগ ধরে চলছে পৃথক ধর্মের এ উপাসনালয় দুটি।


এলাকাবাসী জানান, দীর্ঘদিন ধরে একই উঠানে মসজিদ-মন্দির হলেও উভয় ধর্মের মানুষ সম্প্রীতির বন্ধনে থেকে স্ব-স্ব ধর্ম পালন করে আসছে। ধর্ম পালন নিয়ে কখনো কোনো বাক-বিতণ্ডা বা রেষারেষি হয়নি কখনই। উভয় ধর্মের শালীনতা বজায় রেখেই একই উঠানে দীর্ঘ দিন ধরে বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব পালন করে আসছেন উভয় ধর্মের মানুষ।


শুধু নামাজ বা পূজা অর্চনাই নয়, উভয় ধর্মের সকল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শান্তিপূর্ণ ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়েই পালন করছেন এলাকার মানুষ। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ইতিহাস অনেক সমৃদ্ধ। যার অনেক নিদর্শন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে দেশের নানা প্রান্তে। তারই একটি বড় নিদর্শন এটি।


কেন্দ্রীয় কালীবাড়ি মন্দির কমিটির কোষাধ্যক্ষক সনদ চন্দ্র সাহা জানান, প্রায় দেড়শ বছর আগে কালীমন্দির হিসেবে এ মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। যার কারনে এলাকাটির নামকরণও করা হয় কালীবাড়ি। বাজার গড়ে উঠলে বাজারের ব্যবসায়ী ও শহরের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা মন্দিরের পাশেই এ পুরান বাজার জামে মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন। সেই থেকে একই উঠানে চলছে দুই ধর্মের দুই উপাসনালয়।


তিনি আরো জানান, পূজা শুরুর আগে মসজিদ ও মন্দির কমিটি বসে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সিদ্ধান্ত মতে, আযানের সময় থেকে প্রথম নামাজের জামায়াত পর্যন্ত মন্দিরের মাইক, ঢাক-ঢোলসহ যাবতীয় শব্দ বন্ধ থাকবে। কিন্তু ওই সময় পুরোহীত ও পুজারীরা কোন রকম শব্দ ছাড়াই নিরবে তাদের পূজা চালিয়ে যাবে। নামাজের প্রথম জামায়াত শেষ হলে মন্দিরের কার্যক্রম আবার স্বাভাবিক হয়। সামান্যতম বিশৃঙ্খলা হয় না এখানে। তার জন্ম থেকে এভাবে চলতে দেখে আসছেন বলে জানান সনদ চন্দ্র সাহা।


লালমনিরহাট পুরান বাজার কালীবাড়ি দূর্গা মন্দিরের সভাপতি জীবন কুমার সাহা জানান, ১৮৩৬ সালে দুর্গা মন্দির প্রতিষ্ঠার আগে এখানে কালী মন্দির প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় পুরান বাজার এলাকা অনেকের কাছে কালীবাড়ি নামে পরিচিত হয়ে উঠে। এরপর মন্দির প্রাঙ্গনে ১৯০০ সালে একটি নামাজ ঘর নির্মিত হয়। এ নামাজ ঘরটিই পরবর্তীতে পুরাণ বাজার জামে মসজিদ নামে পরিচিতি লাভ করে। শুরু থেকেই কোনো বিবাদ ও ঝামেলা ছাড়াই সম্প্রীতির সঙ্গে ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালন করে আসছে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ।


দূর্গাপূজার সময় ঢাক ঢোল ও বাদ্য যন্ত্র বাজানো নিয়ে সমস্যা হয় কিনা এ বিষয়ে জানতে চাইলে মন্দির কমিটির সাধারন সম্পাদক গোবিন্দ চন্দ্র সাহা জানান, আমরা মসজিদ ও মন্দির কমিটির সদস্যরা বসে ঠিক করে নেই কখন এবং কিভাবে ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালন করা হবে। নামাজের সময়গুলোতে সকল প্রকার বাদ্য বাজনা বন্ধ রাখা হয় এবং নামাজ শেষে মসুল্লিরা দ্রুত মসজিদ ত্যাগ করে পুজারীদের জন্য সুযোগ করে দেন। এটাই এখানে নিয়ম।



পুরান বাজার জামে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি ফজল মিয়া জানান, ধর্মীয় সম্প্রীতির এটি এক জ্বলন্ত প্রমাণ বা উদাহারন। যুগ যুগ ধরে একই উঠানে চলছে নামাজ ও পূজা অর্চনা। নামাজের সময় মন্দিরের ঢাক ঢোল বন্ধ রাখা হয়। নামাজ শেষ হলে মন্দিরে পূজা চলে পুরোদমে। আযান ও নামাজে তো খুব বেশী সময় লাগে না। এ সময় টুকু তারা (পুজারী) ঢাক ঢোলসহ শব্দযন্ত্র বন্ধ রাখেন।


পুরাণ বাজার জামে মসজিদ সহকারী ইমাম মওলনা শফিকুল ইসলাম জানান, ধর্ম যার যার উৎসব সবার। উভয় ধর্মের লোকদের সম সুযোগ দিয়েই এখানে সম্প্রীতির বন্ধন তৈরী করে ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করা হয়। তাই ধর্ম পালনে কারো কোনো সমস্যা হয় না।


লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক শফিউল আরিফ বলেন, ধর্মীয় সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ এ জেলার মানুষ। ধর্ম যার যার উৎসব সবার - এটাই এখানকার মানুষ লালন করে এবং বিশ্বাস করে। যার মুর্তপ্রতিক এক উঠানে কেন্দ্রীয় কালীবাড়ি মন্দির ও পুরান বাজার জামে মসজিদ।


বিবার্তা/জিন্না/সোহান

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com