হাওরের বুকে ইটভাটা, হুমকিতে জীববৈচিত্র
প্রকাশ : ২২ মে ২০১৮, ১২:৩৫
হাওরের বুকে ইটভাটা, হুমকিতে জীববৈচিত্র
তানভীর আঞ্জুম আরিফ, মৌলভীবাজার থেকে
প্রিন্ট অ-অ+

মৌলভীবাজার ও সিলেট অঞ্চলের বিশাল জায়গা জুড়ে বিস্তৃত এশিয়ার বৃহত্তম হাকালুকি হাওর। এই হাওরের বনাঞ্চলে রয়েছে হিজল, তমাল, করচসহ ৫২৬ প্রজাতির বিভিন্ন প্রজাতির গাছ ও বিভিন্ন ধরনের প্রাণীর আবাসস্থল। ১৯৯৯ সালে সরকার প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করে।


ফলে ইসিএ এলাকায় পরিবেশ দূষণ করে এমন কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা নিষিদ্ধ। এমন ঘোষণার পরও হাকালুকি হাওরে চারপাশে গড়ে উঠেছে কমপক্ষে এক ডজনেরও বেশি ইটভাটা। ফলে হুমকির মুখে রয়েছে হাকালুকি হাওরের জলজ জীববৈচিত্র ও বনাঞ্চল।


তবে সূত্রে জানা যায়, হাকালুকি হাওর ইসিএ ঘোষণার আগ থেকেই থেকেই মুলত সবগুলো ইটভাটা গড়ে উঠেছে। ২০০২ সাল থেকে হাকালুকি হাওর উন্নয়নে পরিবেশ অধিদফতর কাজ শুরু করে। আর ইটভাটার শুরু করার আগে প্রথমে স্থানীয় পর্যায়ে কৃষি অফিস এবং পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র নিতে হয়।


তাহলে ইটভাটাগুলো কিভাবে গড়ে উঠলো ? এমন প্রশ্নই স্থানীয়দের।


সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, হাকালুকির ইসিএ এলাকায় কুলাউড়া উপজেলায় শাপলা ব্রিকস নামের একটি ইটভাটা রয়েছে। জুড়ী উপজেলায় এমকো নামে দুটি এবং মেসার্স বাবু ব্রিকস নামে ইটভাটা রয়েছে। এমকো নামের এটভাটা দুটির মালিক স্থানীয় উপজেলা চেয়ারম্যান। বড়লেখা উপজেলায় দক্ষিণভাগের রাঙাউটি এলাকায় ভাই ভাই ব্রিকস, সুজানগরের ভোলারকান্দি গ্রামে এনবি, গাঙকুল ব্রিকস, সুজানগরে তেরাকুড়ি এলাকার নিম্নাঞ্চলে এবিএস নামের ইটভাটা রয়েছে।



হাকালুকির পশ্চিম তীর ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় রয়েছে দুটি ইটভাটা। এর একটির মালিক উপজেলা যুবলীগের সহ-সভাপতি আবদুল মছব্বির। অপর ভাটাটির মালিক মছব্বিরের বন্ধু হুমায়ূন কবীর। এছাড়া গোলাপগঞ্জ উপজেলায়ও দুটি ইট ভাটা রয়েছে।


ইসিএ আওতাভুক্ত এলাকায় সনাতন পদ্ধতির এসব ব্রিকস ফিল্ডগুলো প্রায় ৭ বছর আগে পরিবেশ অধিদফতর বন্ধ ঘোষণা করে। তবে প্রশাসনের নাকের ডগায় অবৈধ এসম ব্রিক ফিল্ডে অবাধে কাঠ পুড়িয়ে ইট তৈরি করা হচ্ছে।


স্থানীয় বাসীন্দাদের অভিযোগ, কুলাউড়া জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলার সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে রাতের আধারে কাঠ এনে স্তুপ করে রাখা হয়। পরে প্রকাশ্যে দিনের আলোয় এসব কাঠগুলো পোড়ানো হয়। এমনকি স্থানীয় প্রশাসন ও বন বিভাগকে ম্যানেজ করেই অবৈধ এসব ইট ভাটাগুলো কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। অনেক ইটভাটার মালিক ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। তাই কেউ এ বিষয়ে মুখ খুলতে চায় না।


মেসার্স শাপলা ব্রিকসের ম্যানেজার বকুল ধর ইট তৈরিতে কাঠ পুড়ানোর অভিযোগ অস্বীকার করে বিবার্তাকে জানান, শ্রমিকের রান্নার জন্য কিছু কাঠ রয়েছে। আগামী বছর ইটভাটাটি জিগজাগ পদ্ধতিতে রূপান্তরিত করা হবে বলে জানান।


জুড়ি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা অসীম চন্দ্র বণিক বিবার্তাকে জানান, এখনো কোনো ইটভাটায় আমরা অভিযান করিনি।


মৌলভীবাজার পরিবেশ আন্দোলনের সভাপতি ড. একে জিল্লুল হক বিবার্তাকে জানান, হাকালুকি হাওর হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম একটি হাওর। কিন্তু বর্তমানে এই হাওরটি হুমখির মুখে। ইটভাটাগুলো আধুনিকায়নের জন্য আমরা উপর মহলে অনেক আবেদন করেছি তারপরও কোনো সুফল পাচ্ছি না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে উদাসীন। আমরা চাই সরকার এদিকে সুনজর দিয়ে এই হাওরটিকে রক্ষা করবে।


সাধারণ সম্পাদক নুরুল মোহাইমিন মিল্টন বিবার্তাকে জানান, ইট তৈরির জন্য কাঠের ব্যাপক ব্যবহারের কারণে এলাকার পরিবেশের হুমকির মুখে। এখনই এগুলো বন্ধ করতে না পারলে তা ভবিষ্যৎতে আরো মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।


হাকালুকি যুব পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হোসাইন আহমদ বিবার্তাকে জানান, ইসিএ এলাকায় এসব ইটভাটা সম্পন্ন নিষিদ্ধ। আমরা চাই সরকার ইটভাটাগুলো বন্ধ করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করবে।


বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবু মুছা শামসুল মোহিত চৌধুরী বিবার্তাকে জানান, হাকালুকি হাওর এলাকায় ইটের ভাটায় কাঠ পোড়ানোর বিষয়ে আমি খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেব। দুজন বনরক্ষী দিয়ে এই বিশাল হাওরের গাছ কাটাও বন্ধ করা যাচ্ছে না। এর জন্য সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।


বিবার্তা/আরিফ/জাকিয়া

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com