লামায় জমি দখলে ব্যর্থ হয়ে সম্প্রীতি বিনষ্টের চেষ্টা
প্রকাশ : ১৬ অক্টোবর ২০১৬, ১১:০৭
লামায় জমি দখলে ব্যর্থ হয়ে সম্প্রীতি বিনষ্টের চেষ্টা
নুরুল করিম আরমান, লামা
প্রিন্ট অ-অ+

জমি দখল করতে না পেরে একটি বহিরাগত সংঘবদ্ধ চক্র বান্দরবানের লামা উপজেলার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের পাঁয়তারা করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ সংঘবদ্ধ চক্রটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলার বাসিন্দা বজেন্দ্র মহাজনের ছেলে অর্পন মহাজন ও ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের বনপুর বাজার এলাকার তয়েরা মুরুয়ের ছেলে চম্পাত মুরু।


শুধু তাই নয়, সংঘবদ্ধ চক্রটি জমি দখল করতে না পেরে বৌদ্ধ মূর্তি ভাংচুরের মত স্পর্শকাতর মিথ্যা ঘটনার সৃষ্টি করে গত মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলা পরিষদ সম্মুখ সড়কে মানববন্ধন ও প্রধানমন্ত্রী বরাবরে স্মারকলিপি পাঠিয়েছে। এ ধরনের স্পর্শকাতর ঘটনার মিথ্যে খবর রটিয়ে রাজপথে মানববন্ধন ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর আবেদন করায় সচেতন সমাজ বিস্ময় প্রকাশ করেন।


এদিকে মিথ্যা অভিযোগ এনে সম্প্রীতি বিনষ্ট করে জমি দখল চেষ্টার অভিযোগে জমির মালিকের ছেলে এসএম আজিজ প্রতিকার চেয়ে বান্দরবান জেলা প্রশাসকসহ প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেছেন। এতে অভিযুক্ত অন্য ব্যক্তিরা হলেন, বনপুর বাজার এলাকার মৃত জোগেন্দ্র ধরের ছেলে রিংকু বাবু ধর, মে অং মার্মার ছেলে মংথোয়াইচিং মার্মা, রাঅং হেডম্যানের ছেলে লাংকম মুরুংসহ অজ্ঞাত নামা আরও ১০-১২জন।


স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২৮৫নং সাঙ্গু মৌজার ১৬১নং হোল্ডিং মূলে ৫ একর জমির মালিক হন মাস্টার জয়নাল আবেদীন। পাশে একই সময় ২০৪ নং হোল্ডিং মূলে ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. জাকের হোসেন মজুমদার ৫ একর দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণীর জমি বন্দোবস্তি পায়। বন্দোবস্তিকৃত এসব জমির উপর খামার ঘর, ফলজ ও বনজ গাছের বাগান সৃজন করে ৩০-৩৫ বছর ধরে ভোগ দখল করে আসছেন।



হঠাৎ করে পাশ্ববর্তী জমির মালিক ইমারত হোসেনের কেয়ারটেকার অর্পন মহাজন লোকজন নিয়ে ২০১৫ সালের ৭ আগস্ট মো. জাকের হোসেন মজুমদার ও জয়নাল আবেদীনের খামার ঘর ভেঙ্গে দিয়ে সৃজিত রাবার, সেগুন, একাশিয়া, আম, কলাসহ বিভিন্ন জাতের গাছের চারা কেটে জবর দখল করার চেষ্টা করে। এতে না পেরে সাংবাদিকদের মিথ্যা তথ্য দিয়ে গীর্জা ভাঙ্গার সংবাদ পত্রিকায় পরিবেশন করে প্রশাসনের মাঝে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে।


পরে দু’পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ৮ আগস্ট তৎকালীন বান্দরবান জেলা পরিষদের সদস্য মো. জহিরুল ইসলাম, উপজেলার সনাতন ও আওয়ামী লীগ নেতা বিজয় আইচ, লামা সদর ইউপি চেয়ারম্যান মিন্টু কুমার সেন, ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি নুর হোসেন চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক ও ইউপি সদস্য শহীদুজ্জামান, উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম-সম্পাদক প্রদীপ কান্তি দাশ, উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ওসমান গনি বাদশা, কানু লাল, স্থানীয় ইউপি সদস্য আপ্রুচিং মার্মা ও নাছিমা আক্তারসহ গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ সরেজমিন পরিদর্শন করে ঘটনার সত্যতা পাননি।


সম্প্রতি চক্রটি পুনরায় জায়গা দখলে নেয়ার জন্য হঠাৎ মথাচড়া দিয়ে বৌদ্ধ মূর্তি ভাংচুরসহ চুরির মত স্পর্শকাতর ঘটনার রুপ দেয়। বিষয়টি জানতে পেরে তাৎক্ষণিকভাবে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান থোয়াইনু অং চৌধুরী, নির্বাহী অফিসার খালেদ মাহমুদ, সহকারী পুলিশ সুপার আল্ মাহমুদ হাসান, থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেনসহ স্থানীয় সাংবাদিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ সরজমিন পরিদর্শন করে সত্যতা পায়নি বলে জানা গেছে।


লিখিত অভিযোগে ভুক্তভোগী এসএম আজিম আরও জানায়, অভিযুক্তরা সম্প্রতি তার বাবার নামীয় ও ভোগদখলীয় জমিতে সৃজিত ২০০টি আম গাছ কেটে নিয়ে যায় এবং চার লাখ টাকা চাঁদা দিলে আর মন্দির নির্মাণ বা জমি নিয়ে ঝামেলা করবেন না। চাঁদার টাকা না দিয়ে জমিতে গেলে অপহরণপূর্বক হত্যা করবে বলেও হুমকি দেয়। এছাড়া প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে মিথ্যা মামলা, অভিযোগ ও সাংবাদিক সম্মেলন করে সুনাম ক্ষুণ্ন ও মানহানি করে এলাকার শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট করছে অভিযুক্তরা। এসব থেকে রক্ষা পেতে শনিবার বান্দরবান জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে।


স্থানীয় আবুল কালামসহ ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি লুৎফর রহমান বলেন, ‘মূর্তি ভাংচুরের ঘটনা সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত। ঘটনাস্থলে কখনো বৌদ্ধ মন্দির কিংবা কোন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ছিল না। একটি মহল স্থানীয়দের মধ্যে সাম্প্রদায়িক উস্কানি দিয়ে এলাকার শান্তি শৃঙ্খলা নষ্টের পাশাপাশি জমি দখলের পাঁয়তারা করছে মাত্র।’


তিনি আরও জানান, ২০১৫ সালে অর্পন মহাজন নামের এক ব্যক্তি বনফুল এলাকায় প্রবেশ করে কিছু মুরুং ও ত্রিপুরা সম্প্রদায় নিয়ে গির্জা-মন্দির ও ক্যায়াং করার নামে জমি জবর দখলের চেষ্টা করছে।


এর আগে ২০১৫ সালে সরজমিনে বিরোধীয় জমি পরিদর্শনে গেলে স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা আবু ছালেহ (৭৫) ও মোহাম্মদ আলীসহ (৬০) আরো অনেকে এ প্রতিবেদককে জানান, ‘পাকিস্তান আমল থেকে বনপুর এলাকায় বসবাস করে আসছি। কখনো শুনিনি ওই জমিতে গীর্জা, কেয়াং কিংবা কোন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান আছে।’ তারা আরো বলেন, গত বছর অর্পন মহাজন চকরিয়া উপজেলা থেকে বনপুরে এক ব্যক্তির জমির কেয়ারটেকারের দায়িত্ব নেন। এলাকায় তার নামে কোনো জমি নেই, এলাকার স্থায়ী বাসিন্দাও নন। তিনি লোভের বশবর্তী হয়ে মাস্টার জয়নাল আবেদীন ও চেয়ারম্যান জাকের হোসেন মজুমদারের জমি দখলে ব্যর্থ হয়ে প্রশাসনকে বিভ্রান্ত করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের চেষ্টা করছে মাত্র। তাই বিষয়টি সমাধানে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ জরুরি।


এ বিষযে অভিযুক্ত অর্পন মহাজন বলেন, ‘আমরা কারো জমি দখলের চেষ্টা করছি না। জমিটি খাস, তাই আমাদের উদ্দেশ্য হলো- ধর্মীয় স্বার্থে খাস জায়গায় মন্দির, গির্জা ও বৌদ্ধ বিহার নির্মাণ করা।’ তবে বৌদ্ধ মূর্তি ভাংচুর কিংবা চুরির বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে জানান।


ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জাকির হোসেন মজুমদার জানায়, মূর্তি ভাংচুর বা জবরদখলের কোনো ঘটনা ঘটেনি। অর্পন মহাজন গং কাল্পনিক ঘটনার রূপ দিয়ে ঘোলাপানিতে মাছ শিকার করে আমাদের দীর্ঘ লালিত সম্প্রীতি নষ্টের চেষ্টা করছেন। তিনি আরও বলেন, ২০১৫ সালেও একইভাবে মিথ্যাচার করে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে ফল পায়নি ওই চক্রটি।


লামা উপজেলা নির্বাহী অফিসার খালেদ মাহমুদ বলেন, ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে একটি তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে। তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অন্যদিকে উপজেলা চেয়ারম্যান থোয়াইনু অং চৌধুরীও জানান, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে কথিত মূর্তি ভাংচুর কিংবা চুরির সত্যতা পাওয়া যায়নি।


বিবার্তা/আরমান/জিয়া


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com