
জেলি ত্রিপুরা, শান্ত ত্রিপুরা, রাজেশ ত্রিপুরা, অভি ত্রিপুরাসহ ৯জন ত্রিপুরা শিশু গ্রামের সামান্য ফাঁকা জায়গায় খেলছিল। ওদের সবার বয়স ৬ থেকে ১২ বছরের মধ্যে। কথা বলছে চাকমা ভাষা বিকৃত করে যেন নতুন এক ভাষায়। ৯ জন ত্রিপুরা শিশুর মধ্যে শুধু রাজেশ ত্রিপুরা একটু একটু ত্রিপুরা ভাষায় কথা বলতে পারে। অন্যরা চাকমা ভাষার সুর মিলিয়ে এক নতুন ভাষায় কথা বলছে। এরা ত্রিপুরা ভাষায় (মাতৃভাষায়) আর কথা বলতে পারে না।
তাদের মাতৃভাষার নাম ককবরক। ককবরক শব্দটি দুইটি অংশ নিয়ে গঠিত। কক অর্থ ‘ভাষা’ আর বরক অর্থ ‘মানুষ’, বিশেষায়িত অর্থে ত্রিপুরি জাতির মানুষ; অর্থাৎ ককবরক কথাটির অর্থ ত্রিপুরি মানুষের ভাষা।এ ভাষার নিজস্ব বর্ণমালা নেই। ককবরক ভাষায় দু ধরনের লিপিতে লেখার প্রচলন আছে— রোমান ও বাংলা। ককবরক ভাষা এই দুই লিপির কোনটিতে লেখা উচিত, তা নিয়ে বাংলাদেশে বিতর্ক আছে।
১ ফেব্রুয়ারি বিকেল সাড়ে ৫টা সময় তাদের পাড়ায় তাদের সাথে দেখা হয়। শধু এ শিশুরা নয়। এ গ্রামের ৭৩টি ত্রিপুরা পরিবারের প্রায় সবাই মাতৃভাষায় কথা বলতে পারে না। কথা বলে চাকমা ভাষার সাথে মিল রেখে কিছুটা বিকৃত করে। যেন এক নতুন ভাষায়। চিত্রটি খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার পানছড়ি ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের আদি ত্রিপুরা পাড়ার।
এরপর কর্ণ রায় ত্রিপুরার চা দোকানে দেখা হয় পূর্ণরানী ত্রিপুরা, নিঝুংগো ত্রিপুরা, অনিতা ত্রিপুরা আর বুড়িসোনা ত্রিপুরার সাথে। বুড়িসোনা ত্রিপুরার বয়স ৬০ বছরের উর্ধে আর অন্যদর বয়স ৩০-৪০ এর মধ্যে। চা দোকানদারসহ কেউ আর ত্রিপুরা ভাষায় কথা বলতে পারে না।
বুড়িসোনা ত্রিপুরা বলেন, আমার দাদা-দাদিরাও ত্রিপুরা ভাষায় কথা বলতে পারে না। সবাই চাকমা ভাষার সাথে সুর মিলিয়ে কথা বলে। কথার ফাঁকে এক ত্রিপুরা মেয়ে এসে চা দোকানদারকে বলে, মরে দ্বিবে চা দিয়োন (চাকমা ভাষায় হচ্ছে মরে দ্বিবে চা দিয়োন-এর বাংলা হচ্ছে ‘আমাকে দু’টি চা দেন’)।
বুড়িসোনা ত্রিপুরা হেসে বলেন, দেখেন, সবাই চাকমা ভাষার সাথে সুর মিলিয়ে এভাবে কথা বলে। তিনি আরো বলেন, কি মামা তারা তিয়োন দি ভাত হিয়োন? এভাবে আমরা কথা বলি। চাকমা ভাষায় এটি হলো ‘হি তোন দিনেয় ভাত হেয়োজ?’ বাংলায় ‘কি তরকারি দি ভাত খেয়েছেন?’ চা দোকানে বসা আদি ত্রিপুরা নিবাসী পানছড়ি সদর ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বার সুখময় চাকমা বলেন, সব আদি ত্রিপুরারা চাকমার ভাষার সাথে সুর মিলিয়ে এভাবে কথা বলেন।
শুধু এ আদি ত্রিপুরা পাড়ার নয়, উপজেলার টিএন্ডটি টিলার আদি ত্রিপুরা পরিবারগুলো, কালানাল ত্রিপুরা পাড়া, লোগাং ইউনিয়নের আমতুলির আদি ত্রিপুরারাও একই ভাষায় কথা বলে।
কখন থেকে মাতৃভাষাটি হারিয়ে ফেলেছে তারা, কেউ তা বলতে পারে না। আদি ত্রিপুরা পাড়ার ত্রিপুরাদের আদি নিবাস রাঙামাটি। ১৯৬০ সালে কাপ্তাই বাঁধের কারণে তারা উদ্বাস্তু হয়। বসতি গড়ে তোলে পানছড়ি বাজার থেকে অর্ধ কিলোমিটার দূরে। গ্রামের নাম দেয় আদি ত্রিপুরা পাড়া। সেই থেকে এখানে বাস করছেন তারা। এসব আদি ত্রিপুরারা ত্রিপুরা ভাষায় কথ বলতে পারে না। তবে তারা নিজেকে ত্রিপুরা জাতি বলেই পরিচয় দেয়। ওদের ধর্মটিও অন্যান্য ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের মতো সনাতন ধর্ম।
এ প্রসঙ্গে পানছড়ি ইউনিয়নের ৭, ৮, ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মহিলা সদস্যা ও আদি ত্রিপুরার স্থায়ী বাসিন্দা হিরামতি বড়ুয়া বলেন, আদি ত্রিপুরা পাড়ার ত্রিপুরারা কেউ আর ককবরক (ত্রিপুরা ভাষা) ভাষায় কথা বলতে পারে না। তবে পরিচয় দেয় ত্রিপুরা জাতি হিসেবে। এ গ্রামের অধিকাংশ ত্রিপুরা পরিবার গরিব, তাদের কোনো জায়গা-জমি নেই। প্রায় সবাই দিনমজুরি করে খেয়ে না খেয়ে থাকে। বসতবাড়ি করেছে আত্মীয়-স্বজনের জায়গায়। তাই তাদের সব সময় মাথা নিচু করে থাকতে হয়। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে অধিকাংশ শিশু বিদ্যালয়ে যায় না। গেলেও ৪, ৫ শ্রেণির পর ঝরে পড়ে। সেজন্য তিনি আদি ত্রিপুরা পাড়ায় একটি ত্রিপুরা গণশিক্ষাকেন্দ্র করে দেয়ার জন্য সচেতনমহলের কাছে দাবি জানান। এর ফলে আদি ত্রিপুরারা নিজস্ব ভাষায় কথা বলতে পারবে আর সচেতন হয়ে আস্তে আস্তে শিক্ষিত হতে পারবে।
এ ব্যাপারে পানছড়ির লতিবান ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও বর্তমান খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ সদস্য খগেশ্বর ত্রিপুরা বলেন, ত্রিপুরা ভাষা শেখার আগ্রহ থাকতে হবে এবং নিজেদের উদ্যোগে এ ভাষা শিখতে হবে। ককবরক ভাষার অভিধান পড়তে হবে। যারা ককবরক ভাষা পারে তাদের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে হবে। এতেই ককবরক ভাষা রক্ষা পাবে।
বিবার্তা/জিয়া
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]