১১২ বছর বয়সী নিমাই কারিগর আর নেই
প্রকাশ : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৯:০৬
১১২ বছর বয়সী নিমাই কারিগর আর নেই
তানোর (রাজশাহী) প্রতিনিধি
প্রিন্ট অ-অ+

সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন বার বছর আগে। অবশেষে শুক্রবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৭টার দিকে না ফেরার দেশে চলে গেলেন তিনি। বলছি শতবর্ষী এক পাঁপড় বিক্রেতা নিমাই কারিগরের কথা। খেলে গেলেন জীবন ও জীবিকার অক্লান্ত ইনিংস। একেকটা দিন একটা ইতিহাস তৈরি করে এগিয়ে গিয়েছেন অপরাজেয় নিমাই চন্দ্র কারিগর।


তবে জীবনের ছন্দপতন হয়েছিল ৩৫ বছর আগে। প্রিয়তমা স্ত্রী না ফেরার দেশে চলে যায় সে সময়। তারপর একাই চালিয়ে গিয়েছেন সাংসারিক জীবন। চল্লিশের চালশে, ষাটের বার্ধক্য, সত্তরের পৌঢ়ত্ব এসব ছাপিয়ে নিমাই চন্দ্র কারিগর এগিয়ে গেছেন আপন গতিতে। কিন্তু গত ৬ মাস আগে হঠাৎ পড়ে গিয়ে বিছানাগত হন। তারপরও মাঝে-মধ্যে দু’হাতের তালুতে ভর দিয়ে টেনে-হেঁচড়ে ঘরের বাহিরে বের হতেন। এরপর গত এক মাস হঠাৎ তিনি নিথর হয়ে যান। তাঁর পরিবারের লোকজন জানান, গত বৃহস্পতিবার কথা-বার্তা বন্ধ হয়ে যায়। শুধু অপলক তালিয়ে ছিলেন। আজ সকালে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করে না ফেরার দেশে চলে গেলেন তিনি।


গত ৬মাস আগে তার সাথে কথা হয়। তখনও তাঁর দৃষ্টিশক্তি একটুকু ঝাপসা হয়নি, কথা বলেন সাবলীল ভাবে। আশার কথা, তখন দুই পায়ে মাড়িয়ে চলেন একপ্রাপ্ত থেকে অন্যপ্রন্তে। জীবনে বেঁচে থাকার তাগিদে বিক্রি করতেন পাঁপড়। এই জীবনযোদ্ধা বাস করতেন রাজশাহীর তানোর পৌর এলাকার গোল্লাপাড়া গ্রামে। তিন মেয়ে থাকেন ভারতে। অন্যের জায়গায় একটি ছোট্ট একচালা ঘর বানিয়ে বাস করতেন এই শতবর্ষী।


নিজেই রাঁধতেন, কাপড় কাচতেন। খেতে ভালোবাসতেন শাকসবজি, মাছ, ডাল, ডিম। একসময় বাদামের তেল খুব প্রিয় ছিল তার। কিন্তু সেই ভাগ্য আর হয়ে ওঠে না। হাতেপায়ে সরিষার তেল মেখেই দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতেন নিমাই চন্দ্র কারিগর। অবসরে বেড়িয়ে পড়তেন গুরুঠাকুরের সঙ্গে শিষ্যের বাড়ি।


তিনি জানিয়েছিলেন, নিজেই সব রান্না করে খান। অন্যের হাতের রান্না ভালো লাগে না। তবে গুরুঠাকুরের সাথে শিষ্যের বাড়িতে গেলে শুধু ফলমূল ও দুধ খান।


তখন তিনি আফসোস করে জানিয়েছিলেন, এখন নাকি সব কিছুতেই ভোজাল! রান্না করেন সরিষার তেল দিয়ে। আগে এক বিঘা জমিতে একবার আবাদ করে ১০ মণ ধান পাওয়া যেতো। খেতেও সুস্বাদু ছিলো। এখন তিন ফসলী জমিতে অনেক ধান পাওয়া গেলেও সেই পুরনো দিনের মতো স্বাদ নেই।


আমাশয়ে তিনি বরই টক খান। তাতে আমাশয় সেরে যায়। সর্দি-জ্বর হলে সরিষার তেল গরম করে বুকে-পিঠে দিতেন এতে উপশম হতো। শরীর কোথাও কেটে গেলে লবণ দিয়ে বেঁধে দিতেন। আস্তে আস্তে সেই ক্ষতস্থান পূরণ হয়ে যায়। খুব খারাপ অবস্থা না হলে তিনি কখনও চিকিৎসকের কাছে যেতেন না।


৪৭-এর দেশ ভাগের সময় তার বয়স ছিল ৩৮ বছর। সেই সময় স্বদেশী আন্দোলনে জমিদার পুত্রদের সঙ্গে তার সখ্যতা গড়ে উঠে। দেশভাগের পর তিনি ভারতে যান। সেই সময় নাকি মহিষের লেজ ধরে রাজশাহীর পদ্মানদী পার হয়েছিলেন। কিছুদিন পর আবার ফিরে আসেন বাংলাদেশে সিরাজগঞ্জ সদরের ধানবাঁন্ধি এলাকায়। পরে পার্বতীপুর ঔষুধের ল্যাবটারীতে পাঁচ টাকা বেতনে চাকরি করেন।


কারিগর বলেছিলেন, ৫৪ সালের দুর্ভিক্ষে খুব কষ্ট পেয়েছি। সেই দুর্ভিক্ষের সময় খেসারি ডালের ছাতু ও মিষ্টি আলু খেয়ে কাটিয়েছি। এমন কষ্টের দিনে মানুষ একটু খাওয়ার জন্য বাড়ি-ঘর পর্যন্ত মানুষকে দিয়ে দিতো। সেইসব কথা মনে হলে খুব কষ্ট হয়।


উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি সুনীল দাস, গোল্লাপাড়া গ্রামপ্রধান বিশ্ব দাসসহ একাধিক ব্যক্তিরা জানান, নিমাই কারিগর পূজা, হরিবাসর কিংবা যে কোনো অনুষ্ঠানে পাঁপড় বিক্রি করতেন। কারিগরকে তারা জন্মের পর থেকে একইভাবে দেখছেন। এমন প্রবীণ লোক আর দেখা যাবে না। কারিগর তানোর উপজেলার সবচেয়ে বেশী বয়সী লোক ছিলেন বলে তারা মনে করেন।


বিবার্তা/অসীম/এসএ

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com