লক্ষ্মীপুরে আমন সংগ্রহের বরাদ্দ সুবিধা নিচ্ছে অসাধুরা
প্রকাশ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৫:৪৮
লক্ষ্মীপুরে আমন সংগ্রহের বরাদ্দ সুবিধা নিচ্ছে অসাধুরা
লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি
প্রিন্ট অ-অ+

লক্ষ্মীপুরের খাদ্য বিভাগের কারসাজিতে সরকারি গুদামে ধান বিক্রয়ে অনীহা প্রকাশ করছে সদর উপজেলার কৃষকরা। এক টন ধান বিক্রয়ে খরচ না পোষায় কৃষকরা অনাগ্রহী হয়ে পড়ছেন। কৃষক প্রতি ধান বিক্রয়ের বরাদ্দ এক টন থেকে তিন টন করার দাবি জানিয়েছে তারা।


এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদনও জানিয়েছে জেলার সদর উপজেলার কয়েকজন কৃষক। তবে, জেলা খাদ্য কর্মকর্তা বলেছে- শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য কৃষক প্রতি এক টন করে ধান ক্রয় করা হচ্ছে। কৃষকদের দাবি, তাদের কাছে যথেষ্ট পরিমাণ ধান মজুদ থাকার পরও খাদ্য বিভাগের কৃত্রিম কারসাজিতে পড়ে তারা ধান বিক্রিতে আগ্রহ হরিয়ে ফেলেছেন। ফলে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ ব্যহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর এতে লাভবান হচ্ছে সংশ্লিষ্ট বিভাগের অসাধু কর্মকর্তা ও ফড়িয়াবাজরা।


এদিকে, ধান সংগ্রহের নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পর্যায়ে থাকলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে অভিযোগ কৃষকদের। আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি সরকারিভাবে ধান ক্রয়ের শেষ দিন বলে জানা গেছে।


জানা যায়, চলতি মৌসুমে কৃষকদের কাছ থেকে নায্যমূল্যে আমন ধান ক্রয়ে জেলার সদর উপজেলার লক্ষ্যমাত্রা ছিলো ২ হাজার ২০৮ মে. টন। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ধান সংগ্রহ করা হয়েছে সাড়ে ১১শ’ মে. টন। এ উপজেলায় ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ায় বরাদ্দ কর্তন করে পাঠানো হয়েছে জেলার রায়পুর ও রামগঞ্জ উপজেলাতে। তবে জেলার ৫টি উপজেলার মধ্যে সর্বোচ্চ ধান উৎপাদন হয় সদর উপজেলাতে। কৃষদের কাছে যথেষ্ট ধান মজুদ থাকার পরেও লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার পেছনে সংগ্রহ কামিটিকে দায়ি করছেন কৃষকসহ সচেতন মহল। তাদের মতে, ধান ক্রয়ে আন্তরিকতার অভাব থাকায় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। সদর উপজেলায় ধান বেশি উৎপাদন হলেও কৃষক প্রতি বিক্রয় বরাদ্দ দেয়া হয়েছে মাত্র এক টন। আর অন্যান্য উপজেলাতে ধান কম উৎপাদন হলেও সেখানে বিক্রয় বরাদ্দ দেয়া হয় তিন টন করে। এতে ধান বিক্রয়ে অনাগ্রহী হয়ে পড়েছে সদর উপজেলার কৃষকরা।


সদর উপজেলার পৌর এলাকার লামচরী গ্রামের তালিকাভূক্ত কৃষক মারজু লুরুল্যা জানান, তার কাছে বিক্রির মতো প্রায় ১০ টনের মতো ধান রয়েছে। কিন্তু তিনি মাত্র একটন ধান সরকারি গুদামে বিক্রি করতে পেরেছেন। যথেষ্ট ধান মজুদ থাকার পরও তিনি কৃষক প্রতি এক টনের বেশি বরাদ্দ না থাকায় বিক্রি করতে পারছেন না।


তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সদর উপজেলা ব্যাতীত অন্যসব উপজেলাতে সরকারি গুদামে তিন টন করে ধান বিক্রি করছে কৃষকরা। শুনেছি সদর উপজেলার ৩০০ মে. টন বরাদ্দ কর্তন করে অন্য উপজেলাতে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু অন্য উপজেলার মতো এখানে কৃষক প্রতি রবাদ্দ বাড়ালে এখানকার কৃষকরাই উপকৃত হতো।


সদর উপজেলার দিঘলীর কৃষক মানিক ও আবুল হাসেম জানান, পরিবহন খরচ বেশি পড়ায় এক টন ধান বিক্রি করে তাদের পোষায় না।


মান্দারী ইউনিয়নের গন্ধ্যব্যপুর গ্রামের আবদুল মান্নান বলেন, সরকারি গুদামে মাত্র এক টন করে ধান নেয়া হচ্ছে। তাই তেমন একটা আগ্রহ প্রকাশ করছি না। এছাড়া এখানে ধান বিক্রি করতে হলে পরিবহন বাবদ খরচ বেশি পড়ে। আড়াই থেকে ৩০০ মন ধান আছে আমার। সেগুলো খোলা বাজারে বিক্রি করে দেব।


খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রায়পুর এবং রামগঞ্জ উপজেলাতে ধান উৎপাদন কম হলেও অনান্য উপজেলার তুলনায় ধান সংগ্রহে বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে বেশি। সম্প্রতি রামগতি উপজেলায় নির্ধারিত বরাদ্দের ৫০০ মে. টন সংগ্রহের বরাদ্দ দেয়া হয়েছে রায়পুরে। বর্তমানে সদর উপজেলার কর্তনকৃত ৩০০ টনের মধ্যে ১০০ টন রায়পুরে এবং ২০০ টন দেয়া হয়েছে রামগঞ্জে।


খোঁজ নিয়ে আরো জানা গেছে, রায়পুরে ধান বিক্রয় হচ্ছে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে কৃষক এবং ধান উৎপাদন কম থাকার পরও অন্য উপজেলার বরাদ্দ কর্তন করে রায়পুরে সংগ্রহের বরাদ্দ বাড়িয়ে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এ ধান বিক্রয় করা হয়।


জেলা খাদ্য অফিসের সংগ্রহ শাখার দায়িত্বে নিয়োজিত উপ খাদ্য পরিদর্শক মাইন উদ্দিন সিন্ডিকেটের সাথে আঁতাত করে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) সাহেদ উদ্দিনকে ম্যানেজ করে রায়পুরে অধিক বরাদ্দ দেয়ার পাঁয়তারা করে যাচ্ছে। আর সদর উপজেলার কৃষক প্রতি ধান সংগ্রহে বরাদ্দ দেয়া হয় মাত্র একটন। ফলে তাদের এমন কারসাজিতে পড়ে কৃষকরা অনীহা প্রকাশ করে সরকারি গুদামে ধান বিক্রিতে বিরত থাকে। আর এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অবৈধ সুবিধা নিচ্ছে খাদ্য অফিসের অসাধু এসব কর্মকর্তারা।


জানা গেছে, সদর উপজেলাতে ধান সংগ্রহে জেলা প্রশাসনের কঠোর নজরদারি থাকায় এ সিন্ডিকেটটি অনিয়মের জন্য রায়পুর ও রামগঞ্জ উপজেলা খাদ্য গুদামকে নিরাপদ মনে করে বরাদ্দ কর্তন করে সেখানে পাঠাচ্ছে বলে জানা গেছে।


এদিকে, কৃষকদের ধান বিক্রির অনীহার কথা স্বীকার করে সদর খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রামিম পাঠান বলেন, এক টন করে ধান নেয়ার কারণে কৃষকরা ধান বিক্রিতে তেমন সাঁড়া দিচ্ছে না। ফলে আমাদের ধান ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হচ্ছেনা।


জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) সাহেদ উদ্দিন আহম্মদ বলেন, সদর উপজেলা খাদ্য গুদামে যে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে সেটার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ায় জেলা ধান সংগ্রহ কমিটির সিদ্ধান্তে বরাদ্দ সমর্পন করা হয়েছে। সমর্পনকৃত বরাদ্দের ধান অন্য উপজেলা থেকে ক্রয় করা হবে।


সদর উপজেলায় ধানের উৎপাদন বেশি থাকার পরেও কেন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হচ্ছে না এ প্রশ্নের জবাবে খাদ্য নিয়ন্ত্রক বলেন, যে সকল তালিকাভূক্ত কৃষক ধান নিয়ে আসছে তাদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করা হচ্ছে। অন্য উপজেলাতে কৃষক প্রতি তিন টন আর সদর উপজেলাতে কৃষক প্রতি এক টন কেন- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, তিন টন করে বরাদ্দ দিলে শৃঙ্খলা বজায় থাকে না। এখন এক টন করে নেয়ায় গুদামে কোনো ঝামেলা হচ্ছে না।


এ ব্যাপারে উপজেলা পর্যায়ের ধান ক্রয় কমিটির সভাপতি ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শফিক রিদোয়ান আরমান শাকিল বলেন, জেলা কমিটির সিদ্ধান্তে সদর উপজেলার বরাদ্দ থেকে ৩০০ মে. টন অন্য উপজেলায় সমর্পন করা হয়েছে। কৃষক প্রতি এক টন থেকে তিন টনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপাতত কৃষক প্রতি তিন টন করে নেয়ার সুযোগ নেই। যেহেতু সদর উপজেলায় তালিকাভূক্ত তিন হাজার কৃষক রয়েছে, সেক্ষেত্রে লটারির মাধ্যমে অন্তভূক্ত কৃষকরা ধান বিক্রি করতে অনীহা প্রকাশ করলে তালিকাভূক্ত অন্য কৃষকদের কাছ থেকে ধান ক্রয় করা হবে।


কয়েকজন কৃষকের আবেদনের বিষয়ে লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসক অঞ্জন চন্দ্র পালের বক্তবের জন্য বৃহস্পতিবার বিকেলে মোবাইলে কল করা হলে তিনি রিসিভ না করায় বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।


বিবার্তা/সুমন দাস/জাই


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com