সিরাজগঞ্জে ১০ টাকার চাল নিয়ে চালবাজি
প্রকাশ : ০৬ অক্টোবর ২০১৯, ০৯:২৬
সিরাজগঞ্জে ১০ টাকার চাল নিয়ে চালবাজি
নাসিম আহমেদ রিয়াদ
প্রিন্ট অ-অ+

সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় গ্রামীণ দরিদ্র ৫০ লাখ পরিবারের মধ্যে ১০ টাকা কেজির চাল বিতরণ কর্মসূচি চালু করেছে সরকার। হতদরিদ্রদের জন্য সরকার এ মহতী উদ্যোগ নিলেও চালের বড় একটি অংশই চলে যাচ্ছে বিত্তবানদের ঘরে।


স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় রাজনৈতিক প্রভাবশালী নেতাকর্মী, ইউপি চেয়ারম্যান, ইউপি সদস্য, বাড়িওয়ালা, চাকরিজীবীসহ আর্থিকভাবে সচ্ছলদের তালিকায় নাম তালিকায় তুলে চাল উত্তোলন করে বিক্রি করা হচ্ছে কালোবাজারে। ফেয়ার প্রাইজের চাল নিয়ে এমনই ভয়াবহ অনিয়মের চিত্র দেখা গেছে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নে।


উপজেলার কায়েমপুর ইউনিয়নে ২৪২০টি, গাড়াদহ ১৯৫৮, পোতাজিয়া ২১৬৮, রূপবাটি ১৯০০, গালা ১৯৫০, পোরজনা ২৭৭৯, হাবিবুল্লাহ ২০০০, বেলতৈল ২২০০, খুকনি ২৫০০, কৈজুরি ২৭১৯, সোনাতুনি ২৫০০, নরিনা ২২৪৪, জালালপুর ১৫৭১টি মিলে ১৩টি ইউনিয়নে মোট কার্ডধারীর সংখ্যা ২৩ হাজার ৬৯০ জন হলেও তালিকার প্রায় ৭০ শতাংশই ভুয়া বলে অভিযোগ উঠেছে।


তালিকায় থাকা অধিকাংশ মানুষই জানেন না ১০ টাকা কেজি চালের কার্ডের কথা। এমনকি তারা জানেন না কীভাবে তাদের নাম তালিকায় ঢুকেছে। একই সাথে তালিকা থেকে বাদ পড়েনি মৃতরাও। এমন ভয়াবহ অভিযোগের তীর ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেই।


শুরু থেকেই সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুরে ১০ টাকা কেজি দরের চাল বিতরণে এমন অনিয়ম করে আসছেন সংশ্লিষ্টরা। দুস্থদের মধ্যে বিতরণের নাম করে সরকারি গোডাউন থেকে চাল উত্তোলন করা হলেও প্রায় সব চাল কালোবাজারে বিক্রি করে দেয়া হচ্ছে। কালোবাজারে বিক্রি হওয়া অর্থ ভাগবাটোয়ারা হয়ে চলে যাচ্ছে প্রভাশালীদের পকেটে।


উপজেলার পোতাজিয়া ইউনিয়নের ২১৬৮ জন কার্ডধারীর তালিকা থাকলেও তা কেবল কাগজে-কলমেই বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে উত্তোলন করা চাল বিতরণ করা শেষ হয়েছে বলে কাগজে-কলমে দেখানো হয়েছে। মাস্টাররোল তৈরি হয়েছে চাল গ্রহীতাদের আঙ্গুলের টিপসই নিয়ে।


বিষয়টি যাচাই করতে সাংবাদিকদের একটি দল প্রথমেই খোঁজ নেন পোতাজিয়া ইউনিয়নের কাকিলামারি গ্রামে। কথা হয় তালিকায় থাকা ১১২৯ নং কার্ডধারী জুলু মোল্লার ছেলে হানেফের সাথে। ১০ টাকা কেজি দরের চাউলের কার্ড আছে কিনা জিজ্ঞাস করতেই তিনি যেন আকাশ থেকে পড়লেন। বললেন, আমি জীবনেও ইউনিয়ন থেকে কোনো কিছু পাইনি। শুনেছি ১০ টাকা কেজি দরে সরকার চাল দিচ্ছে। কিন্তু কখন কীভাবে কাদের এ চাল দেয়া হয় সেটা জানি না।


এবার আরেকটু তালিকা ধরে খুঁজে বের করা হয় একই গ্রামের জয়নুল আবেদিনের ছেলে আব্বাস মোল্লা, মাহমুদ আলীর ছেলে আশরাফ মোল্লা, আরশাদ আলীর স্ত্রী জাহানারা খাতুন,হাফিজ মোল্লার ছেলে নিজাম উদ্দিন, ছামাদের ছেলে ইয়াছিন এবং রহিম মোল্লার ছেলে মুকুল মোল্লাকে।


আব্দুর রশিদের স্ত্রী ময়না খাতুনের কাছে গিয়ে জানা যায, তালিকায় স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই নাম আছে। ময়না খাতুনের কার্ড নম্বর ১১৩৭ এবং স্বামী রশীদের কার্ড নম্বর ১১৩৮। অথচ আব্দুর রশীদ মারা গেছেন ৫ বছর আগে। এ বিষয়ে ময়না খাতুন জানান, তিনি জানেন না কীভাবে তাদের নাম এ তালিকায় উঠেছে। কখনো পরিষদ থেকে কোনো চালই তিনি পাননি।


এভাবে পোতাজিয়া ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রাম ঘুরে একই চিত্র দেখা যায়। দুর্নীতি এবং জালিয়াতির ব্যাপারে পোতাজিয়ার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ইউপি সদস্য জানান, পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী, ট্যাগ অফিসার এবং উপজেলা খাদ্যকর্মকর্তা জোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে এমন জালিয়াতি করে সব চাল আত্মসাৎ করছে। চাল দেয়ার কথা বলে জনগণের কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি নিয়ে কাউকে কিছু না দিয়ে জালিয়াতি করে আসছেন চেয়ারম্যান।


এ ব্যাপারে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. ইয়াছিন আলীকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি কোনো সদুত্তর না দিয়ে অনৈতিক প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, আপনারা (সাংবাদিকরা) ম্যানেজ করে নেন।


উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাজমুল হুসেইন খাঁন বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থা গ্রহণ করা হবে।


বিবার্তা/রিয়াদ/রবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com