থ্যাংকস, প্লিজ ও সরি !!
প্রকাশ : ২৮ এপ্রিল ২০১৮, ২০:৪২
থ্যাংকস, প্লিজ ও সরি !!
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

সবে বাংলাদেশ থেকে অভিবাসন নিয়ে বিলেতে এসেছি। সৌভাগ্যক্রমে আসার সপ্তাহ তিনেকের মধ্যেই মূলধারার বিলেতি এক কম্পানিতে চাকরি পেয়ে যাই।


সেন্ট্রাল লন্ডনে কম্পানির হেড অফিসে জয়েন করতে যাবো, ঠিকানা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কিছুক্ষণ নিজেই চেষ্টা করলাম, অবশেষে নিরুপায় হয়ে এক হোটেলের ফ্রন্টডোর সিকিউরিটির কাছে ঠিকানাটা কোথায় জানতে চাইলাম। দশাসই চেহারার সিকিউরিটি বলল, “তুমি উল্টো পথে চলে এসেছো। পেছন ঘুরে সোজা হাঁটতে থাকবে। বাঁ দিকে দুটো গলির পরের গলিতে ঠিকানা পেয়ে যাবে।''


আমি সিকিউরিটির হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে উলটো ঘুরে হন হন করে হাঁটতে লাগলাম। কয়েক কদম এগোতেই পেছন থেকে চিৎকার, “এই যে শুনছো? দয়া করে দাঁড়াও!'' পেছন ফিরে দেখতে পেলাম, ওই সিকিউরিটি আমার পেছন পেছন আসছে। দাঁড়িয়ে গেলাম। সিকিউরিটি বিস্মিত চেহারায় আমার সামনে এসে বলল, ''তোমাকে সাহায্য করার জন্যে তুমি তো আমাকে ‘ধন্যবাদ'ও জানালে না! দয়া করে ‘ধন্যবাদ‘ জানাও আর ‘ধন্যবাদ‘ জানানোটা অভ্যাসে আনো।''


আমার মনে হচ্ছিলো, আমি যেন ভুলে উলঙ্গ অবস্থায় বাথরুমের বাইরে বেরিয়ে গেছি আর হঠাৎ করেই একঝাঁক মহিলা আমার সামনে এসে পড়েছেন। আমি এতোটা লজ্জা বোধহয় আর কখনো পাইনি। আমি জানি, “ধন্যবাদ“ জানানোটা সাধারণ শিষ্টাচারের মধ্যে পড়ে, কিন্তু বাংলাদেশে থাকাকালীন এই জানাটাকে আমি অভ্যাসে পরিণত করিনি।


এবার আরেক ঘটনা। বছর দশেক আগের কথা। লন্ডনে সবে ব্যবসা শুরু করেছি। আমার অফিস কাম ওয়্যারহাউসে এক নাইজিরিয়ান লোডার হিসেবে যোগ দেয়। নাম স্যাম। ডেলিভারি বা কাস্টমার সার্ভিসের সময়টা ছাড়া বাকি সময়টাতে সে টয়লেট পরিষ্কার করে, কার্পেট হুবার করে, মাঝেসাঝে চা চাইলেও দেয়।


একদিন সকালে বৃষ্টি হচ্ছিলো। আমি গাড়ি থেকে বেরিয়ে দৌড়ে অফিসে ঢুকেই টের পেলাম তাড়াহুড়োতে আমি গাড়িতে মোবাইল ফেলে এসেছি। স্যাম ওয়্যারহাউসে একটি ডেলিভারি রেডি করছিলো। আমি ওকে বললাম, ''স্যাম, গাড়ি থেকে আমার মোবাইলটা নিয়ে এসো তো !'' স্যাম কিছুটা বিরক্তিভরা চাহনিতে বলল, “দেব, তুমি তো দেখতেই পাচ্ছো আমি ব্যস্ত! তুমি নিজেই গাড়ি থেকে মোবাইলটা নিয়ে এসো না কেন? আর অনুগ্রহ করে ‘প্লিজ' বলাটা শেখো। এটা সাধারণ শিষ্টাচার। এমনকি তোমার সন্তানদের সাথেও তাই বলবে।''


আমি বাঙ্গালী মালিক। বাঙ্গালীদের অহমের মাত্রা একটু বেশিই। স্যামের কথাটা আমার অহমে ভীষণ লাগলো, আবার লজ্জাও পেলাম। আমরা ‘প্লিজ‘ বা ‘দয়া করে‘ বলাটা কেন যে অভ্যাস করলাম না !


সমসাময়িক আরেক ঘটনা। বরফশীতল বৃষ্টির জলে ভিজে ঠাণ্ডা লেগে একদিন আমার প্রচণ্ড কাশি হচ্ছিলো। সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথে ভাবলাম, এক বোতল কফ সিরাপ কিনি। আমাদের হাইস্ট্রিটে পারকিং পাচ্ছিলাম না। এক ফার্মেসীর সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে দৌড়ে ভেতরে ঢুকে সোজা কাউন্টারে গিয়ে টিলের মেয়েটিকে বললাম, ''আমায় এক বোতল কফ সিরাপ দাও তো!'' মেয়েটি মহাবিরক্তি নিয়ে আমার দিকে তাকালো। সাথে সাথেই আমার পাশ থেকে এক বৃদ্ধা বললেন, ''মাফ করবে। মেয়েটি আমাকে সার্ভ করছে। আমাকে সার্ভ করা শেষ না হওয়া অবধি তুমি আমার পেছনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে পারো।''


আমি ভীষণ বিব্রত হয়ে সুরসুর করে বৃদ্ধার পেছনে দাঁড়িয়ে ওনাকে সার্ভ করা শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে থাকলাম। দেখলাম টিলের মেয়েটি তখনো আমার দিকে বিরক্তিভরে তাকিয়ে। বলল, ''দেখো, একে তো তুমি খুব রুক্ষভাবে আমার কাছে কফ সিরাপ চেয়েছো, সামান্য ‘প্লিজ ‘ বলার সৌজন্যটুকু তুমি দেখাওনি। সেটা না হয় আমি ভুলে গেলাম। কিন্তু তুমি অভদ্রোচিতভাবে বৃদ্ধাকে ঠেলে সামনে এসে তোমাকে সার্ভ করতে বলেছো, আর এ জন্যে তুমি এখনো ওনাকে 'সরি' বলোনি। এ ভারী অন্যায়।''


কেন যে ‘দুঃখিত‘ বলাটা রপ্ত করতে পারিনি - এটা ভেবে নিজের ওপর খুব রাগ হচ্ছিলো।


আরেকটি ঘটনা বলে এ পর্ব শেষ করি। একদিন সন্ধ্যায় এক বন্ধুর বাড়িতে গল্প করছিলাম। এক ইংরেজ পরিবারও আমন্ত্রিত ছিলো। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন, অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিয়ে কথা হচ্ছিলো। কথায় কথায় ইংরেজ ভদ্রলোক বললেন, ''দেখো, অর্থনৈতিক উন্নতি আর সভ্য হওয়া এ দুয়ের মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। অর্থনৈতিক উন্নতিই শুধু সভ্যতার মাপকাঠি না। একটা জাতি কতোটা সৎ, কতোটা বিনম্র, অন্যের প্রতি কতোটা শ্রদ্ধাশীল, কতোটা সহিষ্ণু, কতোটা ভদ্র - এগুলোই একটি জাতির সভ্যতার মাপকাঠি।''


মনে মনে বললাম, আমরা বাঙ্গালীরা এখনো ''দয়া করে'', ''ধন্যবাদ'' আর ''দুঃখিতই'“ বলতে শিখলাম না, কবে আর সভ্য হবো!


দেবাশিস দাসের ফেসবুক থেকে সংগৃহীত


বিবার্তা/হুমায়ুন/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com