
বিখ্যাত ময়ূর সিংহাসন। যার খ্যাতি ছিল দুনিয়াজোড়া। আর কিংবদন্তী আজো লোকের মুখে মুখে। ১৭শ শতাব্দীতে মুঘল সম্রাট শাহজাহান সোনার তৈরি এই সিংহাসন নির্মাণ করেন। ১৭৩৯ সালে পারস্য বা ইরানের নাদির শাহ ভারত আক্রমণ করে বহু মূল্যবান ধনরত্নের সাথে এই সিংহাসনও নিজের দেশে নিয়ে যান। ফারসিতে একে বলা হতো ‘তখত-ই-তাবুস’। ময়ূর সিংহাসন নামটি পরে দেয়া হয়। পরবর্তী পারস্য অধিপতিরা তাদের সিংহাসনকে এই নামেই ডাকতেন।
কিন্তু সিংহাসনের নাম ‘ময়ূর সিংহাসন’কেন? কারণ সিংহাসনের পেছনে দুটি ময়ূরের ছবি ছিল, যারা তাদের অনিন্দ্যসুন্দর পেখম ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। আর এই পেখমগুলো খচিত ছিল নানা রকম দুষ্প্রাপ্য আর অতিমূল্যবান রত্নপাথর দিয়ে। এর মাঝে ছিল নীলকান্ত মণি, পান্না, চুনি কিংবা পদ্মরাগ মণি, মুক্তা ও অন্যান্য মূল্যবান পাথর। ১৬৬৫ সালে ফরাসি জহুরি টারভেইনার ভারতে আসেন। তার কাছ থেকে আমরা মুঘল সম্রাট শাহজাহানের ময়ূর সিংহাসনের বর্ণনা জানতে যায়। এটি ছিল অনেকটা বিছানার মতো। যার দৈর্ঘ্য ছিল ৬ ফুট আর প্রস্থ ৪ ফুট। এর ছিল চারটি পায়া যেগুলোর দৈর্ঘ্য ছিল ২০-২৫ ইঞ্চি।
সিংহাসনের উপর ছিল বেশ বড় ধরনের চাঁদোয়া কিংবা শামিয়ানা। নিচের একটি ভিত্তি থেকে ১২টি স্তম্ভ এই শামিয়ানাটিকে ধরে রাখতো। আর স্তম্ভগুলো যে ভিত্তির উপর দাঁড়িয়েছিল সেই ভিত্তিটি ছিল হীরা, পান্না, চুনিসহ বিভিন্ন মূল্যবান রত্নপাথরে খচিত। সিংহাসনটি ছিল ১০৮ টি বড় আকৃতির চুনি পাথর আর ১১৬টি পান্না দিয়ে। আর সিংহাসনের উপর থাকা শামিয়ানা যে ১২টি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে ছিল, সেগুলো ছিল মুক্তোখচিত। সম্রাট শাহজাহান এরপর এতে জগৎ বিখ্যাত হীরে কোহিনূর স্থাপন করেন।
সিংহাসন তৈরি হয়ে গেলে এটি দিল্লীতে ‘দিওয়ান-ই-আম’, যেখানে দেশের জনসাধারণকে সম্রাট তাঁর সাক্ষাৎ দিতেন, সেখানে রাখা হয়। সিংহাসনটি তৈরি করা হয় মুঘল সাম্রাজ্যের সোনার অলঙ্কার তৈরির সাথে সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রধান বেবাদল খানের সরাসরি তত্ত্বাবধানে। সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুঘল সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে। ১৭৩৯ সালে পারস্যের শাহ নাদির শাহ ভারত আক্রমণ করেন ও ময়ূর সিংহাসন, কোহিনূর হীরেসহ আরো অনেক মূল্যবান জিনিস নিয়ে ভারত ত্যাগ করেন। পতনের মুখে থাকা মুঘল সাম্রাজ্যের সম্রাট ছিলেন মোহাম্মদ শাহ।
১৭৪৭ সালে নাদির শাহ আততায়ীর হাতে নিহত হন। এরপরই আসল ময়ূর সিংহাসনটি হারিয়ে যায়। নাদিরের মৃত্যুর ফলে সৃষ্ট গোলযোগের মধ্যে হয় এটি চুরি হয়ে গিয়েছিল, নয়তো এটির বিভিন্ন অংশ খুলে আলাদা করে ফেলা হয়েছিল। এটাও ধারণা করা হয়, সিংহাসনটি হয়তো ওসমানীয় সাম্রাজ্যের সুলতানদেরকে দেয়া হয়েছিল। যাই হোক, পরবর্তী ইতিহাসে পারস্য সাম্রাজ্যের সিংহাসনগুলোকে ভুলক্রমে ‘ময়ূর সিংহাসন’নামে ডাকা হতো, যেগুলোর আথে আসল সিংহাসনের মিল ছিল না। আবার ১৮১২ সালে আলী শাহ কাজার কিংবা ১৮৩৬ সালে মোহাম্মদ শাহ কাজারের তৈরি সিংহাসনের সাথে মুঘল চিত্রকলাতে প্রাপ্ত আসল ময়ূর সিংহাসনের কিছুটা মিল দেখা যায়। ইতিহাসবিদদের ধারণা, হয়তো মূল ময়ূর সিংহাসনের অংশ বিশেষ এগুলো তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছিল।
কিন্তু কোথায় হারালো এই অমূল্য সৃষ্টি? আজও কি লোকচক্ষুর অন্তরালে টিকে আছে কোথাও? নাকি বাস্তবেই টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়েছে তাকে। এত অমূল্য একটা বস্তুকে টুকরো করে ফেলা হয়েছে, সেটাও অনেক ইতিহাসবিদ মানতে নারাজ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে শেষ পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তেই আসা যায়নি!
বিবার্তা/জিয়া
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]