সন্তান জন্মের পর পুরুষরাও মানসিক সমস্যায় ভোগেন
প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১০:৩৬
সন্তান জন্মের পর পুরুষরাও মানসিক সমস্যায় ভোগেন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

সন্তান জন্মের পর মায়ের পাশপাশি মানসিক সমস্যায় ভোগেন অনেক বাবাও। এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি।


ডেভ এডওয়ার্ড বলেছেন, তার সন্তান জন্মের সময় থেকেই যে চিৎকার করতে শুরু করে এবং পরের ১২ মাসে তা আর থামে নি।


৩৩ বছর বয়সী এই বাবার পিতৃত্ব নিয়ে এভাবে পরিচয় করিয়ে দেয়া যেতে পারে যে, প্রথমদিকে তিনি পিতৃত্ব কালীন ছুটি নিয়ে বাড়িতে সময় দিয়েছেন। খুব কম ঘুমিয়ে শিশুটির জন্মের পাঁচ সপ্তাহ পরে তিনি তার মানব সম্পদ বিভাগের চাকরিতে আবার যোগ দেয়ার সুযোগ পান।


অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনের বাসিন্দা ডেভ এডওয়ার্ড বলেন, আমি সব সময়ে একটি চিন্তার মধ্যে থাকতাম যে, আমার সঙ্গী বাড়িতে একটি কাঁদুনে বাচ্চার সঙ্গে রয়েছে। আমি যে চাকরি করতাম, সেখানেও অনেক চাপ ছিল।


কয়েক মাস পরে তিনি অনুভব করতে শুরু করেন তার ভেতরে অসহিঞ্চুতা এবং বিষণ্ণতা জেঁকে বসেছে।


এডওয়ার্ড পরবর্তীতে আবিষ্কার করেন যে, তিনি সেই হাতে গোনা কয়েকজন মানুষের অন্যতম, যাদের সন্তান জন্মের পরে মানসিক সমস্যার শিকার হতে হয়েছে।


অ্যাডভোকেসি গ্রুপ পোস্টপার্টুম সাপোর্ট ইন্টারন্যাশনাল বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি সাতজন মায়ের মধ্যে একজন আর প্রতি দশজন পিতার মধ্যে একজন শিশু জন্মের পর বিষণ্ণতার মতো সমস্যার শিকার হয়। গ্রুপটি বলছে, অন্য উন্নত দেশগুলোতে এই প্রবণতা দেখা গেছে।


যুক্তরাজ্যে অভিভাবক গ্রুপ এনসিটির গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন বাবা হওয়া ব্যক্তিদের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ তাদের মানসিক সমস্যা নিয়ে চিন্তা করেন, যার মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক দায়-দায়িত্ব আর ঘুমের স্বল্পতার মতো বিষয়। যেমন এডওয়ার্ডের কর্মক্ষেত্রের দায়-দায়িত্বের জন্য তার কাজটি আরো কঠিন হয়েছে।


তিনি মনে করেন, কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন, কিন্তু নিজেকে উদ্বিগ্ন লাগছে আর কাজে মন বসাতেও পারছেন না।


আমি শুধু আশা করছিলাম যে, আবার কাজে ফিরে যাবো এবং বাবা হওয়ার আগের মতো করে কাজ করতে পারবো, বলছেন এই দুই সন্তানের বাবা।


অনেক নারীর ক্ষেত্রে একই ধরণের ঘটনা শোনা যাবে। বাচ্চাদের যত্ন-আত্তির ক্ষেত্রে মারাই প্রধান ভূমিকা নিয়ে থাকেন এবং পেশা-পরিবারের মধ্যে সমন্বয় আনতে গিয়ে দীর্ঘ লড়াই করতে হয়।


কিন্তু অনেক বাবাকেও এরকম সংগ্রাম করতে দেখা যায়, যেহেতু তার নিজের নিয়মিত চাকরির বাইরে অন্য কাজ অনেক বেড়ে গেছে।


চিন্তা বা উদ্বেগ বাড়ছে


সেন্টার ফর প্যাটারনাল লিভ লিডারশীপের প্রতিষ্ঠাতা অ্যামি বিকম মাইক্রোসফট ও ফিলিপস ৬৬-র মতো প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন, যেখানে তিনি পিতৃত্ব কালীন ছুটির ব্যাপারে প্রশিক্ষণ আর পরামর্শ দেন।


তিনি বলেন, সদ্য মা হওয়া নারীরা যেসব চাপ বোধ করতেন, তার অনেক কিছুই এখন বাবাকেও নিতে হচ্ছে। তাদের কাজটি এখন আর শুধুমাত্র সংসারে অর্থ আয় করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।


বিকম বলেন, এখন আশা করা হচ্ছে, বাবারাও বাড়িতে সময় দেবে। এর ফলে তাদের চাপের পরিমাণ বাড়ছে, বিষণ্ণতার মাত্রা বাড়ছে এবং তাদের উদ্বেগের পরিমাণও বেড়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব তাদের কর্মক্ষেত্রেও পড়ে।


তার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কোম্পানিগুলোকে পরামর্শ দেয় যেন তারা নতুন বাবা হওয়ার সময়টাতে কর্মীদের মানসিক অবস্থার যাচাই করে দেখে, যা শিশু গর্ভে আসার পর থেকে বাবা-মার মধ্যে অন্তত এক বছর পর্যন্ত থাকতে পারে।


তিনি বলেন, আমরা মায়েদের জন্য এটা এখন করছি, কিন্তু আমরা বাবাদের ক্ষেত্রে করার কথাও বলছি।


পরিবর্তনের চিত্র


অনেক কোম্পানি এখন নতুন পিতাদের এসব সমস্যা মোকাবেলায় সহায়তা করতে পদক্ষেপ নিচ্ছে।


প্যারেন্টস এট ওয়ার্কের প্রধান সেবা কর্মকর্তা কিরি স্তেজকো বলেন, শিশুদের জীবনের সঙ্গে আগের তুলনায় এখন পুরুষরা অনেক বেশি জড়িত হচ্ছে। কিন্তু তাদের চাকরির কর্ম ঘণ্টায় কোনো পরিবর্তন আসেনি।


অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য এবং হংকংয়ে নানা প্রতিষ্ঠানে বাবা-মাদের চাকরি ও পরিবারের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার ব্যাপারে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে।


ডেলোইট এবং এইচএসবিসির মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তিনি কাজ করার পরে তিনি বলছেন, চাকরি দাতারা এই ব্যাপারটিকে নারী ও শিশুদের ব্যাপার বলে নয়, বরং পরিবার ও অভিভাবকের বিষয় বলে দেখতে চাইছেন।


বাস্তবতার দিক থেকে বলতে গেলে, এর আগে শুধুমাত্র নারীদের কথা চিন্তা করেই নানা ধরণের ব্যবস্থা ছিল। যেমন সদ্য জন্ম নেয়া শিশুর যত্নের জন্য ছুটি বা অফিসে সুবিধাজনকভাবে কাজ করার ব্যবস্থা করে দেয়া।


স্তেজকো বলেন, অনেক পুরুষও এভাবে শিশুর যত্ন নিতে কাজের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে চাইলেও, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এখনো তা গ্রহণ করা হয় না।


অনেক পুরুষ মনে করেন, কাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়া বা এজন্য সহায়তার জন্য অনুরোধ করা হলে তা তাদের পেশাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তুলতে পারে।


পাঁচ সন্তানের বাবা অ্যালেক্স লাগুনা ঠিক একই উদ্বেগে ভুগেছেন, যিনি এখন একটি ওয়েবসাইট চালু করেছেন, যার নাম 'বেটারড্যাডস'। এই ওয়েবসাইটে শুরুর দিকে পুরুষদের বিচ্ছেদের ব্যাপারে নানা পরামর্শ দেয়া হতো। কিন্তু এখন এখানে কর্মক্ষেত্র ও পরিবারের মতো বিষয়গুলো নিয়েও আলোচনা করা হয়।


লাগুনা বলছেন, কাজ থেকে বিরতি নেয়ার ক্ষেত্রে পুরুষরা অনেক সময় সমস্যায় ভোগেন। তারা তখন চিন্তা করেন, যাদের সঙ্গে তিনি কাজ করেন, তারা বিষয়টিকে কীভাবে নেবে?


সিডনি ড্যাড বলেন, চাকরিকে না বলার ব্যাপারটি আসলেই বেশ শক্ত স্নায়ুর ব্যাপার।


আলোকসজ্জা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন ৪৪ বছর বয়সী এই ব্যক্তি বলেন, এখন যেভাবে আশা করা হচ্ছে, সেভাবে তার প্রজন্মের লোকজন পরিবার আর কাজের মধ্যে সমন্বয়ের কোনো আদর্শ বা রোল মডেল দেখতে পাননি।


তিনি বলেন, আমাদেরই প্রথম এর মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। আমাদের অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে।


আলোচনা শুরু করা


চাকরিরত বাবাদের সহায়তায় কোম্পানিগুলোর এগিয়ে আসাকে স্বাগত জানিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনো অনেক কিছু করার বাকি রয়েছে।


প্যারেন্টাল অ্যাংজাইটি অ্যান্ড ডিপ্রেশন অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা টেরি স্মিথ বলেছেন, শিশুর জন্ম হওয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানসিক সমস্যায় যে পুরুষরাও আক্রান্ত হতে পারে, এটা অনেক মানুষই জানে না। ফলে তাদের জন্য কোনো সহায়তাও দেয়া হয় না।


তিনি বলেন, প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত এটাকে সত্যিকারের একটি অসুস্থতা বলে স্বীকৃতি দেয়া এবং এ নিয়ে অফিসে আলোচনা শুরু করা।


সন্তানের জন্মের পর ওয়েলসের মার্ক উইলিয়ামসন মানসিক সমস্যায় পড়েন এবং উপলব্ধি করেন যে, বিক্রয় ও বাজারজাতকরণ প্রশিক্ষকের চাকরি করাটা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে তিনি চাকরি থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।


এরপরে তিনি দাতব্য প্রতিষ্ঠান 'ফাদারর্স রিচিং আউটের' প্রতিষ্ঠা করেন যেটি যুক্তরাজ্য জুড়ে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করছে।


তিনি বলেন, এটা আসলে শুধুমাত্র বিষণ্ণতা নয়, পুরুষরা পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডারেও ভুগতে পারে।
আপনি হয়তো এর মধ্যেই বাড়িতে মানসিকভাবে অসুস্থতার শিকার হয়েছেন, যার সবকিছু হয়েছে অনেকটা আকস্মিকভাবে। আর শিশুর জন্মের দুই সপ্তাহ পরেই তাকে আবার কাজে যোগ দিতে হচ্ছে।


তিনি আরো বলেন, ব্যবস্থাপক এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উচিত নতুন বাবা হওয়াদের জিজ্ঞেস করা যে, তাদের কেমন লাগছে এবং প্রয়োজনে সহায়তার ব্যবস্থা করা। এই মতের সঙ্গে একমত এডওয়ার্ড।


তিনি মনে করেন, কাজে ফেরার পর যদি তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তার একটু খোঁজখবর নিতেন, তাহলে তিনি অনেক উপকৃত হতেন।


তিনি বলেন, বাড়িতে কি অবস্থা, তোমার সঙ্গী এখন কেমন আছে, এরকম অনেক কিছু আমি শুনেছি, কিন্তু আমার ব্যাপারে কেউ কখনো জানতে চায়নি।


জনসেবা খাতের এই কর্মী বলছেন, তিনি এখন খুব ভালো অবস্থায় রয়েছেন এবং অন্যদের সহায়তা করার চেষ্টা করছেন।


তিনি আরো বলেন, কীভাবে নিজেদের দেখভাল করতে হবে, নতুন বাবাদের সেটা দেখিয়ে দেয়া খুব জরুরি, কারণ সেরকম কষ্টের কিছু মাস আমি পেরিয়ে এসেছি....এটা ভালো লাগার মতো কিছু নয় এবং আমি জানি, সেটা আমার কাজের ওপরেও অনেক প্রভাব ফেলে। সুত্র: বিবিসি


বিবার্তা/তাওহীদ

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com