দুই সন্তানকে খুঁজে ফিরছেন এক দুঃখিনী মা
প্রকাশ : ০৩ জুন ২০১৮, ১৯:০৭
দুই সন্তানকে খুঁজে ফিরছেন এক দুঃখিনী মা
খলিলুর রহমান
প্রিন্ট অ-অ+

চোখের সামনে থেকে তার দুই সন্তানকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে ওরা। তারপর দীর্ঘ ছয় মাস কেটে গেছে, এখনো তাদের ফিরে পাননি তিনি। দুই সন্তানকে ফিরে পেতে তিনি গ্রামের মুরব্বি থেকে শুরু করে আদালত পর্যন্ত গিয়েছেন। কিন্তু না, কোনো ফল হয়নি।


এমনই এক দুঃখিনী মায়ের সন্ধান পেয়েছে বিবার্তা২৪ডটনেট। তিনি রাজধানীর ওয়ারী থানার গোপীবাগ এলাকার বাসিন্দা ফারহানা জামান (৩০)।


তিনি জানান, ২০০৭ সালের ২৮ নভেম্বর বগুড়া সদর উপজেলার শিববাটি মজুমদার ব্রীজ লেন এলাকার বাসিন্দা আনোয়ার হোসেনের ছেলে আমিনুর রহমানের সঙ্গে বিয়ে হয় তার। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, বিয়ের ছয় দিন পর স্বামী আরেক বিয়ে করে বসেন। কিছুদিন পর সেই বিয়ের কথা জানাজানি হয়ে গেলে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। অবশ্য অল্প দিনের মধ্যে তার মীমাংসাও হয়ে যায়। প্রথম স্ত্রীকে নিয়ে আবার শুরু হয় পথ চলা। তাদের কোলে আসে এক মেয়ে সন্তান। পর্যায়ক্রমে দ্বিতীয় সন্তানের পিতা-মাতাও হন তারা।


কিন্তু সেই সুখ বেশি দিন থাকেনি। আমিনুর রহমান দ্বিতীয় সন্তানের জনক হলেও গোপনে অফিসের এক নারী কর্মচারির সঙ্গে চালিয়ে যেতে থাকেন প্রেম। কথাটি চলে যায় প্রথম স্ত্রী ফারহানা জামানের কানে। প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন ফারহানা। কিন্তু কে কার কথা শোনে। এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে ২০১৩ সালের ৫ মার্চ ফারহানা জামানই স্বামীকে তালাক দেন। পরে দুই সন্তানকে নিয়ে রাজধানীর ওয়ারী থানার গোপীবাগ এলাকার আর কে মিশন রোডের ৭৯/২/বি নম্বর বাসায় বসবাস শুরু করেন।


তার প্রথম সন্তানের নাম জান্নাতুল আফরোজ ফাইজা (৬) ও দ্বিতীয় সন্তানের নাম ফারিয়া আফরোজ ফারাহ (৪)। তাদের নিয়ে বাকি জীবন কাটানোর প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেখানেও বাধা হয়ে দাঁড়ান সাবেক স্বামী আমিনুর। তিনি সুকৌশলে ২০১৭ সালের ১১ নভেম্বর তার পিতা আনোয়ার হোসেনসহ কয়েকজনকে গোপীবাগে ফারহানার বাসায় পাঠান। সহজ-সরলভাবে তাদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করেন ফারহানা। তার বাসায় দুপুরের খাবারের পর বিশ্রামও নেন তারা। এক পর্যায়ে ফারহানা জামানের সঙ্গে ফাইজা ও ফারাহকে (দুই সন্তান) কথাবর্তা শুরু হয়। আমিনের বাবা দুই সন্তানকে নিয়ে যেতে চান। এ সময় তাদের দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে আনোয়ার হোসেন, তার সঙ্গে আসা জামাল, রত্না ও নয়ন ফারহানা জামানকে লাঞ্ছিত করে। এক পর্যায়ে তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। এই সুযোগে দুই সন্তানকে অপহরণ করে নিয়ে যান আমিনের স্বজনরা।


ফারহানা জামানের দাবি, জ্ঞান ফেরার পর দুই সন্তানকে না দেখতে পেয়ে চিৎকার শুরু করেন। পরে আশপাশের লোকজন তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন এবং সুস্থ হয়ে তিনি সাবেক স্বামী আমিনুর রহমান আমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এ সময় আমিন সন্তানদের ফেরত দেয়ার আশ্বাসও দেন। সেই আশ্বাসের ভিত্তিতেই ২০১৭ সালের ১৩ ডিসেম্বর রাজধানীর ফার্মগেটস্থ কনকর্ড টাওয়ারে (আমিনের অফিস) আসেন ফারহানা জামান। এ সময় ইব্রাহিম খলিল নামের একজন নিকাহ আইনজীবী দাবি করে তার সঙ্গে কথা বলেন। এক পর্যায়ে ওই আইনজীবী জোর করে দুটি একশত টাকার স্ট্যাম্পে ফারহানার স্বাক্ষর নেয়ার চেষ্টা করেন। এতে ব্যর্থ হয়ে লোকটি তার শ্লীলতাহানী করে।


এ ঘটনার পর ওয়ারী থানায় একটি অপহরণের মামলা দায়ের করতে যান ফারহানা জামান। কিন্তু মামলা নেয়া দূরের কথা, সাধারণ ডায়রিও নেয়নি পুলিশ। পরে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে হাজির হয়ে চার জনের নাম উল্লেখ করে একটি মামলা দায়ের করেন তিনি। মামলার আসামিরা হল আমিনের পিতা বগুড়া সদর উপজেলার শিববাটি মজুমদার ব্রীজ গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন (৫৮), তাদের আত্মীয় নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার কুমরডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা মো. জামাল (৩৫), আমিনের বোন ফারহানা আফরোজ রত্না (২৮) ও তার স্বামী নয়ন (৩৫)।


অভিযোগের ব্যাপারে ওয়ারী থানার ওসি রফিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিবার্তাকে বলেন, ‘এমন অভিযোগ অসত্য। আমরা ডেকে এনে অভিযোগ গ্রহণ করি। কিন্তু উনি আসছে, আর আমরা অভিযোগ নেই নাই...। এই পুলিশ এখন আর নেই।'



ফারহানা জামান জানান, রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় কনকর্ড টাওয়ারে তার সাবেক স্বামী আমিনের ‘অবজার্ভড’ নামে একটি কোচিং সেন্টার রয়েছে। ফারহানার অভিযোগ, কোচিং সেন্টারেও আমিন মেয়েদের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে। এছাড়া সে আদম ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। সেই ব্যবসার নামে লাখ লাখ টাকা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন ফারহানা।


এসব অভিযোগের ব্যাপারে জানার জন্যে আমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে একাধিক দিন কনকর্ড টাওয়ারে ‘অবজার্ভড‘ কোচিং সেন্টারে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ গত শনিবার দুপুরে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কামাল নামের এক কর্মচারির সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘স্যার অফিসে আসেন না। উনার সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করতে হবে।' উনার (আমিন) মোবাইল বন্ধ রয়েছে কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'মোবাইল সব সময় বন্ধ থাকে না। ট্রাই করেন, উনাকে পাবেন।‘


তবে এর পরও আমিনের মোবাইলে ফোন দিয়ে মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। পরে একটি ক্ষুদে বার্তাও পাঠানো হয়। অবশেষে শনিবার সন্ধ্যায় আমিন এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন।


ফারহানার অভিযোগ অস্বীকার করে আমিন বিবার্তাকে বলেন, ‘এটা ভুল ইনফরমেশন আপনাকে দিছে। তার সঙ্গে পাঁচ বছর আগে ডিভোর্স হয়েছে।’


সন্তানদের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা কি না কি সেটা সেও (ফারহানা) ভাল জানে। আর আপনে সামনা-সামনি (সরাসরি) এসে কথা বলেন।’


তবে একাধিক দিন অফিসে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি এমন প্রশ্নের জবাবে আমিন বলেন, ‘আপনে দুই-চার দিন পর বা ঈদের পর যোগাযোগ করে চলে আসেন।’


বিবার্তা/খলিল/হুমায়ুন/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com