থামছে না পাহাড় খেকোদের দৌরাত্ম্য
প্রকাশ : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:২৫
থামছে না পাহাড় খেকোদের দৌরাত্ম্য
তানভীর আরজুম আরিফ
প্রিন্ট অ-অ+

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, জুড়ী, বড়লেখা, কমলগঞ্জ, রাজনগর ও শ্রীমঙ্গল উপজেলায় পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করে অবাধে চলছে পাহাড় ও টিলা কাটা।


অবাধে পাহাড় কাটা চললেও উল্লেখ করার মতো কোনো ভূমিকা রাখছে না প্রশাসন। ফলে পাহাড় ও টিলাখেকোদের আগ্রাসন বেড়েই চলেছে। কখনো কখনো প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের চোখের সামনেই ধ্বংস করা হচ্ছে পাহাড় ও টিলা।


এদিকে পাহাড়-টিলা কাটায় ধ্বংস হচ্ছে সবুজ বনাঞ্চল। বন্যপ্রাণীরা হারাচ্ছে আবাসস্থল। এ কারণে বাঘ, বানরসহ নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী লোকালয়ে চলে আসছে। অতিবর্ষণে ভূমিধসে ঘটছে হতাহতের ঘটনাও।



পরিবেশবিদদের অভিযোগ, প্রতি বছর বিশ্ব পরিবেশ দিবস এলেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা শোভাযাত্রা ও আলোচনা সভা করেই দায় এড়িয়ে যান। আর কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয় না। যার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনো পরিবেশ বিষয়ে সচেতনতার সৃষ্টি হয়নি। বর্তমানে পুরো জেলায় বিভিন্ন পাহাড়ের পাদদেশে ও টিলার চূড়ায় প্রায় লক্ষাধিক মানুষ বসবাস করছে। এদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে না নিলে বড় দূর্ঘটনা ঘটতে পারে।


সরেজমিনে দেখা যায়, বড়লেখা উপজেলার পাহাড় ঘেঁষা কাঁঠালতলী, বিওসি কেছরিগুল, ডিমাই, উত্তর ডিমাই, দক্ষিণ ডিমাই, হাতি ডিমাই, উত্তর শাহবাজপুর, সায়পুর, কলাজুরা, হাকাইতি, কাশেম নগর, জামকান্দি, মোহাম্মদ নগর, পূর্ব মোহাম্মদ নগর, সাতরা কান্দি, গঙ্গারজল, জফরপুর, কাশেমনগর, গজভাগ, পূর্ব হাতলিয়া, বোবারথল, মোহাম্মদনগর, ছোট লেখা, ঘোলসা, চন্ডিনগর, মুড়াউল, আতুয়া, বড়াইল, কুমারশাইল, পূর্ব বানীকোনা, শ্রীধরপুর, মাধবকুন্ড, খলাগাঁও, মুড়াউলসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে কাটা হচ্ছে পাহাড়ি টিলা। এসকল এলাকার কোনো কোনো স্থানে এখন কিছুটা কমলেও বেশির ভাগ স্থানেই চলছে পাহাড় কাটা।


এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৪-১০১৮ সাল পর্যন্ত ৩ বছরে মৌলভীবাজারে পাহাড় ধ্বসে ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও অনেকে। এর মধ্যে শুধুমাত্র বড়লেখা উপজেলায় মারা গেছেন ৫ জন। এদের মধ্যে ২০১৪ সালের ১০ মে ভোররাতে বড়লেখা উপজেলার শাহবাজপুর চা বাগানে পাহাড় ধ্বসে আট মাসের শিশুসহ মারা যান একই পরিবারের তিনজন।


তারা হলেন রাজেস (৩৫) তার স্ত্রী মঞ্জু (২৫) ও তাদের আট মাসের সন্তান সীমা। ২০১৫ সালের ১২ জুন রাজনগরে করিমপুর চা বাগানের উত্তর টিলায় পাহাড় ধ্বসে চাপা পড়ে ঘুমন্ত অবস্থায় মারা যায় রিয়া রায় নামের ৭ বছরে এক শিশু। এ সময় রিয়ার বাবা মন্টু রায় (৪৫) ও বোন মাধবী রায় (১২) আহত হয়েছে। সর্বশেষ ২০১৭ সালের ১৮ জুন বড়লেখা উপজেলার বিওসি ডিমাই এলাকায় পাহাড় ধ্বসে মারা যান আছিয়া বেগম (৪০) ও তার মেয়ে ফাহমিদা (১৩)।



জুড়ী উপজেলার উত্তর ভবানীপুর (মোকাম টিলা), ভজি টিলা, চম্বকলতা, বড় ধামাই, কচুরগুল, জামকান্দি, গোবিন্দপুর এলাকায় কাটা হচ্ছে পাহাড়ি টিলা।


স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ ওই উপজেলার জায়ফরনগর, গোয়াল বাড়ি, পশ্চিম জুড়ী ও পূর্ব জুড়ী ইনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় কাটা হচ্ছে পাহাড়। অভিযোগ উঠেছে সদ্য নির্মিত জুড়ী থানা, পশুসম্পদ, পল্লীবিদ্যুৎ ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভবনের ভিটা ভরাট করা হয়েছে স্থানীয় পাহাড়ি টিলার মাটি দিয়ে। প্রশাসনিক ভবনগুলোতে পাহাড়ের মাটি দিয়ে ভরাটের ঘটনায় স্থানীয়রা পাহাড় কাটায় আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে।


রাজনগরের উত্তরভাগ ইউনিয়নের যুদুরগুল এলাকার খাসের টিলা কেটে ভরাট হচ্ছে শাহজালাল সারকারখানার আবাসিক এলাকার জমি। বিশাল বিশাল টিলা কেটে মাটি নেয়া হচ্ছে কারখানার কলাবাগান আবাসিক এলাকায়। নির্বিচারে পাহাড় কাটার বিষয়ে গণমাধ্যম সোচ্চার হলে প্রশাসনের তৎপরতায় তিন মাস বন্ধ থাকে। সম্প্রতি আবারো শুরু হয়েছে পাহাড় কাটা।


স্থানীয় বাসিন্দারা জানান এখন নতুন করে কাটা হচ্ছে ‘রহমান মাস্টারের টিলা’ ও ওই উপজেলার বিভিন্ন ছোট বড় পাহাড়ের মাটি।



শ্রীমঙ্গল উপজেলার বিষামনি এলাকার উচু পাহাড়টি এরইমধ্যে কেটে মাটির সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে। পাহাড়টির নিচেই কয়েকশ পরিবারের বসবাস। যেকোনো সময়ই পাহাড় ধ্বসে ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা।


জেলা প্রশাসক মো. তোফায়েল ইসলাম জানান, পাহাড় কাটা আইনবিরোধী কাজ। এ বিষয়ে আমাদের অবস্থান স্পষ্ট। পাহাড় কাটা বন্ধে আমরা ‘জিরো ট্রলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করবো।


তিনি বলেন, টিলা কাটা বন্ধে ইতোমধ্যে অভিযান শুরু হয়েছে। আমি নিজেও কয়েকটি এলাকা পরিদর্শন করেছি।


বিবার্তা/তানভীর/নুর

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com