অরক্ষিত সুন্দরবন, অসহায় বনরক্ষীরা
প্রকাশ : ২৮ জানুয়ারি ২০১৮, ১৮:০৭
অরক্ষিত সুন্দরবন, অসহায় বনরক্ষীরা
রাজীব আহসান রাজু
প্রিন্ট অ-অ+

ভোলা নদী ভরাট, সিমানা প্রাচীর না থাকা, আবাসস্থল ধ্বংস ও খাদ্য সংঙ্কটের কারণে পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগর ফরেষ্ট স্টেশন এলাকা থেকে রয়েল বেঙ্গল টাইগার (বাঘ), মায়বী চিত্রল হরিন, বানর ও শুকরেরপালসহ বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। এতে প্রণীকূলের ধ্বংসলীলা থেকে ফসল আর হিংস্র বাঘের থাবা থেকে বাঁচাতে দিন-রাত পালাক্রমে নিজেদের এলাকা পাহারা দিচ্ছে সুন্দরবনের সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোর বাসিন্দারা।


স্থানীয়রা জানান, এক সময়ের প্রায় ৭০০ ফুট চওড়া খরস্রোতা ভোলা নদী এখন মাত্র ৬০ ফুট চওড়া মরা নদীতে পরিণত হওয়ায় এবং সুন্দরবনের শক্ত কোনো সীমানা বেস্টনী না থাকায় অনায়াসেই গ্রামগুলোতে ঢুকে পড়ছে হিংস্র বাঘ, হরিণ ও শুকরের পালসহ বন্যপ্রাণী। অন্যদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের গৃহপালিত গবাদি পশু খাদ্যের সন্ধানে অবাধে প্রবেশ করছে বনের গহীনে। ফলে খাদ্য সন্ধ্যানে বনে গিয়ে প্রতিনিয়ত প্রাণ হারাচ্ছে গবাদি পশু আর লোকালয়ে হিংস্র বাঘের থাবায় ঘটে চলছে একের পর এক হতাহতের ঘটনা।


প্রসঙ্গত, গত ২৩ জানুয়ারি বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের গুলিশাখালী ফরেস্ট ক্যাম্প এলাকা থেকে খাদ্যের সন্ধ্যানে লোকালয়ে ঢুকে পড়া বাঘের আক্রমনে ধানের ক্ষেতে কর্মরত ৬ শ্রমিক গুরতর আহত হয়। এদের মধ্যে ৪জন আশঙ্কাজনক অবস্থায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। পরে বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসীর গণপিটুনিতে আক্রমনকারী বাঘটি প্রাণ হারায়। এখনো ওই গ্রামে আরও একটি ক্ষুধার্ত বাঘ ঘোরাফেরা করছে বলে আতঙ্ক রয়েছে। আতঙ্কিত গ্রামবাসী বাঘের হাত থেকে জীবন আর শুকর, বানরেরর হাত থেকে ফসল বাঁচাতে পাহারা দিচ্ছে নিজ নিজ এলাকা।


ভোলাপাড়ের কৃষক আউয়াল মিস্ত্রি, বারেক হাওলাদার ও ইব্রাহীম নেছার জানান, সন্ধ্যা নামতেই বন্য শুকরের পাল ঢুকে পড়ে গ্রামের মধ্যে। শুরু করে সীমাহীন অত্যাচার, দুমড়ে-মুচড়ে নষ্ট করে দেয় একরের পর একর ফসলি জমি। আর এই ধংসযজ্ঞের হাত থেকে বাদ পড়ে না বাড়ির আঙ্গিনায় থাকা মুলা, কচু, সবজীর ক্ষেতও।


তারা জানান, শীত মৌসুমে সুন্দরবন সীমান্তবর্তী এসব এলাকায় চোরা শিকারি ও কাঠ পাচারকারী চক্রের অপতৎপরতা বেড়ে যায়। এক শ্রেণীর অসাধু বন কর্মকতা-কর্মচারীদের সহায়তায় বনের গভীর পর্যন্ত কাঠ কেটে উজাড় করে ফেলায় বন্যপ্রাণী তাদের আবাসস্থল হারিয়েছে। অন্যদিকে গ্রাম থেকে গবাদি পশুপালের বনের ভিতরে অবাধ যাতায়াত থাকায় এসব গবাদি পশু অনুসরণ করে লোকালয়ে ক্ষুধার্ত বাঘের আনাগোনা বাড়ে যায়।


সরেজমিনে ধানসাগর ফরেস্ট স্টেশনের আওতাধীন গুলিশাখালী ফরেস্ট ক্যাম্পে গিয়ে দেখা যায়, ক্যাম্পটির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ দায়িত্বে রয়েছেন মাত্র ৩ জন বনরক্ষী। তাও আবার লাঠি নির্ভর। বন রক্ষায় নিজেরাই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন তারা।


ওই ক্যাম্পের ভারপ্রপ্ত কর্মকর্তা মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, নতুন করে সরকারিভাবে কোনো নিয়োগ না থাকায় জনবল সংঙ্কট রয়েছে বনবিভাগে। বাঘ রক্ষা আর দস্যূ মোকাবেলায় মাত্র দু-একজনের পক্ষে বনের গভীরে সশস্ত্র দায়িত্ব পালনকালে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হয়। ইতোমধ্যে জনবল সংঙ্কটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।


বনরক্ষী মো. কালু মিয়া জানান, খালি হাতে বনের গভীরে ডিউটি করতে গিয়ে কয়েক বার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। বন রক্ষায় বন বিভাগে জনবল বাড়ানো জরুরি।


লোকবল সংঙ্কটের বিষয়টি স্বীকার করে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. মাহামুদুল হাসান বলেন, গোলপাতা মৌসুম শুরু হওয়ার কারণে স্পটগুলোতে জনবল বৃদ্ধি করায় কোনো কোনো ক্যাম্প এলাকায় জনবল স্বল্পতা রয়েছে।


তিনি জানান, সুন্দরবনের বেস্টনী নির্ভর ভোলানদী, আরুয়াবেড় ও মরাভোলা নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। তবে সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় ভরাট হয়ে যাওয়া ৩ নদীর ৪১ কি.মি. পুনঃখননের একটি প্রকল্প ইতোমধ্যে ঢাকায় বন বিভাগের সদর দপ্তরে দাখিল করা হয়েছে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রকল্পটি প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পেলে আশা করছি খুব শীঘ্রই শুরু হবে নদী খননের কাজ।


বিবার্তা/রাজীব/শাহনেওয়াজ

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com