বিলুপ্তির পথে মাটির ঘর
প্রকাশ : ১৪ অক্টোবর ২০১৭, ১৫:১০
বিলুপ্তির পথে মাটির ঘর
মেহেদী হাসান উজ্জল, দিনাজপুর
প্রিন্ট অ-অ+

দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলায় অধিকাংশ এলাকায় এক সময়কার ঐতিহ্যবাহী মাটির ঘর ছিল একমাত্র অবলম্বন। কালের বির্বতনে সেই মাটির ঘরগুলো আজ বিলুপ্তির পথে। শীত-গ্রীষ্ম সকল ঋতুতেই মাটির ঘর ছিল আরামদায়ক বাসস্থান।


ফুলবাড়ী পৌর এলাকার কাঁটাবাড়ী, গৌরীপাড়া, সুজাপুর, চাদপাড়া, চকচকা, বারকোনাসহ উপজেলার প্রায় প্রত্যেকটি ইউনিয়নে চোখে পড়ার মতো ছিল মাটির ঘর। ধনী-গরিব সকলেরই থাকতো এই ঘর। শীতকালে যেমন গরম অনুভব হতো তেমনি গ্রীষ্মকালেও মাটির ঘর থাকতো শীতলতার অনভুতি। খুব সহজেই তৈরী করা যেতো এই ঘর। তার জন্য প্রয়োজন হতো এঁটেল দো-আঁশ মাটি।


ঘর তৈরিতে খরচের চিন্তা ছিলোনা বললেই চলে। কৃষাণ-কৃষাণী ও তাদের ছেলে-মেয়েরা মিলেই অল্প কয়েক দিনেই তৈরি করতো ঘর। যে মাটি দিয়ে তৈরি করা হতো সেই মাটিতে কোদাল দিয়ে ভালো করে কুপিয়ে ঝুর-ঝুর করে নেওয়া হতো। সাথে পরিমাণ মতো পানি মিশিয়ে থকথকে কাদা করে নেয়া হতো। সেই মাটি দিয়ে তৈরি করা হতো ঘর। অল্প-অল্প করে মাটি বসিয়ে ৬ ফুট থেকে ৭ ফুট উচ্চতার পূর্ণাঙ্গ ঘর তৈরী করতে সময় লাগতো মাত্র মাস খানেক।


ঘর তৈরী সম্পন্ন হলে তার উপর ছাউনি হিসেবে ব্যবহার হতো ধানের খড়। খড় দিয়ে এমনভাবে ছাউনি দেয়া যেন ঝড়-বৃষ্টি কোন আঘাতেই তেমন একটা ক্ষতি করতে পারে না। দৌলতপুর ও রাজারামপুর ইউনিয়ন এলাকায় মাটির ঘরে আলাদা বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়।


যারা একটু প্রভাবশালী তাদের ছিল মাটির তৈরি দো’তালা বাড়ি। এখনো এই সকল এলাকায় কারো কারো শত বছরের মাটির তৈরি দোতলা বাড়ি লক্ষ্য করা যায়।


খয়েরবাড়ী ইউনিয়নের বারাইপাড়া গ্রামে জোবালুর রহামনের বাড়ী এখনো শত বছরের পুরনো দোতালা মাটির ঘর দেখা যায়। কথা হয় তার সাথে।


ঐ বাড়ির গৃহকর্তী জানান, এই বাড়ী তাদের পূর্ব-পুরুষদের আমলে তৈরি। যে আমলে এই বাড়িটি তৈরি করা হয়েছে তখনকার সময়ে এই রকম দোতালা মাটির বাড়ি জমিদারির একটি নমুনা ছিল। যার প্রচুর ধন-সম্পদের মালিক থাকতো তরাই মাটির দো’তালা বাড়ি বানাতো ।


ফুলবাড়ী উপজেলার সীমান্তবর্তী গ্রামে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী আদিবাসি সাওতাল জনগোষ্ঠীদের মাঝে এখন ছোট ছোট মাটির ঘর দেখা যায়। অবশ্য এখন যাদের মাটির ঘর রয়েছে সেটা দরিদ্র্যতার ছাপ। সাওতালদের মাটির ঘরে বসবাস করাটা তাদের নিজস্ব একটি সংস্কৃতি হিসেবে মনে করা হয়। অনেক টাকা পয়সা থাকা সত্ত্বেও কোন কোন সাঁওতাল আদিবাসী তাদের মাটির ঘর পরির্বতন করেনি।


দেখা যায় ফুলবাড়ী উপজেলার মালিপাড়া গ্রামের বিমল মন্ডলে বাড়ীতে এখনো রয়েছে মাটির ঘর। একাধিক পাকা দালান থাকা সত্ত্বেও তার পাশেই রয়েছে মাটির ঘর। মাটির ঘরকে তারা কখনো খাটো চোখে দেখেনা। শুধু বিমল মন্ডলই নন, এখনো অনেক হিন্দু পরিবারেও রয়েছে মাটির ঘর। তবে পরিমাণ সেটা খুবই কম। মুসলমানদের মাটির বাড়ী খুব একটা চোখে পড়ার মতো নয়।


তবে পরিবারিক আয় কম থাকলেও বাশের বেড়া, টিন অথবা ইট দিয়ে তৈরি ঘরে এখানকার মানুষ বসবাস করে থাকে। যাদের সাধ্য কম তারাও অন্তত চেষ্টা করে বাড়িটি সুন্দর করে তৈরি করার। এক সময় প্রায় বাড়িতেই মাটির ঘর ছিল। তখনকার সময়ে ধনী-গরিব কোন ভেদাভেদ ছিল না। তাছাড়া মাটির ঘরে আলাদা স্বস্তি ছিল। বর্তমানে মানুষের আধুনিক জীবন যাপনের ইচ্ছা ও আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় মাটির বাড়ি ভেঙে ইটের বাড়ি তৈরীতে ঝুকে পড়েছেন।


বিবার্তা/মেহেদী/ইমদাদ

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com