তেজপাতা চাষে লাভবান কুড়িগ্রামের চাষিরা
প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০১৭, ১৭:১৬
তেজপাতা চাষে লাভবান কুড়িগ্রামের চাষিরা
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
প্রিন্ট অ-অ+

কুড়িগ্রামে মাঠে-ময়দানে এবং জমির আইল ছেয়ে গেছে ইউক্যালিপ্টাস গাছে। চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো এই গাছটি। এমনিতেই কুড়িগ্রামের চাষিদের মধ্যে ইউক্যালিপ্টাস চাষের প্রবণতা বেশি। দ্রুত বর্ধনশীল এই গাছ মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে প্রকৃতিতে।


এরই বিকল্প হিসেবে জমিতে বিভিন্ন ফসল চাষের পাশাপাশি জমির আইলে পরিবেশ বান্ধব সুগন্ধী তেজপাতা চাষ এখন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।


জেলার ছিনাই ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও চাষি সাদেকুল হক নুরু। বছর চারেক আগে সাড়ে ১২ একর জমির আইলে ৭ শতাধিক তেজপাতা লাগিয়েছিলেন তিনি। এই উদ্যোগে ইতোমধ্যেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি। বছরে আয় করছেন ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা। তার দেখাদেখি লোকজন বাসাবাড়িতেও রোপণ করছেন তেজপাতার চারা।


সাদেকুল হক নুরু বলেন, ২০১৩ সালে বড় ভাইয়ের অনুপ্রেরণায় ছিনাই ইউনিয়ন পরিষদের পেছনে ১০ একর জমির আইলে ৫ শতাধিক তেজপাতার চারা লাগাই। প্রতিটি চারা রোপণ পর্যন্ত দেড়শ টাকা খরচ হয়। লাগানোর সময় পটাশ, ডিআইবি ও ব্রিফার কীটনাশক স্প্রে করার পর আর কোনো খরচ নেই। একবছর পর প্রথম ১০ হাজার টাকায় পাতা বিক্রি করি। এরপর গাছগুলো বড় হয়ে যায় এবং লতাপাতা বেড়ে যায়। ফলে আয়ও বাড়তে থাকে।


তেজপাতা চাষ করে বিক্রি করেন কীভাবে, কিংবা ক্রেতা কারা? এমন প্রশ্নের জবাবে সাদেকুল বলেন, বছরে দু’বার তেজপাতা বিক্রি করা যায়। গাছের কচি পাতা বের হওয়া শেষ হলেই বিক্রি শুরু হয়ে যায়। দূর-দূরান্ত থেকে পাইকাররা এসে পাতা কিনে নিয়ে যায়।


তিনি আরো জানান, জমির আইলে তেজপাতা চাষের পাশাপাশি জমিতে তিনি ধান, আলু, ভুট্টা ও সবজি চাষ করেছেন। এতে ফলনের কোনো ক্ষতি হয় না। গত বছর তিনি আরো আড়াই একর জমির আইলে নতুন করে তেজপাতার চারা লাগিয়েছেন। গাছ বড় হলে একরে প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব। একবার গাছ কিনলেই হয়। এরপর আপনা থেকেই তেজপাতা বাড়তে থাকে। শুধু বছরে দু’বার কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে।


ওই এলাকার রেহেনা ও জোলেখা জানান, ওমারগুলার দেখাদেখি হামরাগুলাও বাড়ির মধ্যে তেজপাতা নাগাছি। বছরে বছরে তেজপাতা বিক্রি করি। অনেক টেকা পাই। তেজপাতা গাছ কোনো ক্ষতি করে না।


তেজপাতা চাষের বিষয়ে কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক মীর্জা নাসির উদ্দিন জানান, তেজপাতা পাহাড়ি এলাকার গাছ। এটি জলাবদ্ধতা মোটেই সহ্য করতে পারে না। লম্বায় ১৫ থেকে ১৬ মিটার উঁচু হয়। রান্নায় স্বাদ ও সুগন্ধি আনতে তেজপাতার জুড়ি মেলা ভার।


গুণাগুণ সম্পর্কে বলতে গিয়ে নাসির উদ্দিন জানান, তেজপাতার রয়েছে ওষুধি গুণাগুণ। ত্বকের সতেজতা ফিরিয়ে আনতে, কোলেস্টরেলের মাত্রা কমাতে এবং হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। এছাড়া নানা রোগ সারিয়ে তুলতেও এর গুণাগুণ অসাধারণ। ঠাণ্ডাজনিত গলাভাঙা রোগ সারাতে তেজপাতার রসের রয়েছে অসাধারণ গুণ। এটি চিরশ্যামল এবং গাছটি বসতবাড়ির শোভাও বৃদ্ধি করে।



নাসির উদ্দিন তেজপাতার বাণিজ্যিক সুবিধা জানাতে গিয়ে বলেন, দেশে মসলার চাহিদা ৩১ লাখ টন। উৎপাদন হয় ১৭ লাখ টন। ঘাটতি প্রায় অর্ধেক। ফলে প্রতিবছর আড়াই হাজার কোটি টাকার মসলা আমদানি করতে হয়। যা জমির আইলে চাষ করে ঘাটতি মেটানো সম্ভব।


এ ব্যাপারে রাজারহাট উপজেলা কৃষি অফিসার ষষ্টি চন্দ্র রায় জানান, এই উপজেলায় মানুষের দ্রুত বর্ধনশীল ইউক্যালিপ্টাস গাছ লাগানোর প্রবণতা বেশি। তার পরিবর্তে আমরা তেজপাতা গাছ লাগাতে মানুষকে উৎসাহিত করছি। তারই অংশ হিসেবে এখন পর্যন্ত ২০ জন চাষি বাণিজ্যিক ভিত্তিতে তেজপাতা চাষে এগিয়ে এসেছেন। এ উদ্যোগ ছড়িয়ে দিতে পারলে কৃষকরা লাভবান হবেন।


বিবার্তা/সৌরভ/ইমদাদ/কাফী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com