প্রয়াত শিল্পী মুর্তজা বশীরকে নি‌য়ে ঢা‌বির নিষ্ঠুর প‌রিহাস!
প্রকাশ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২২, ২২:৩২
প্রয়াত শিল্পী মুর্তজা বশীরকে নি‌য়ে ঢা‌বির নিষ্ঠুর প‌রিহাস!
মহিউদ্দিন রাসেল
প্রিন্ট অ-অ+

খ্যাতিমান শিল্পী মুর্তজা বশীর মারা যাওয়ার দুই বছর পর তাকে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার কথা জানিয়ে চিঠি দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি)। বিষয়টি নিয়ে প্রয়াত শিল্পীর পরিবার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বজ্ঞানহীন এই ভূমিকায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বইছে প্রতিবাদের ঝড়।


জানা যায়, মঙ্গলবার (২০ সেপ্টেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অফিস থেকে চারুকলা অনুষদের ভাস্কর্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক পদে নিয়োগের সিলেকশন বোর্ডে থাকার জন্য চিঠি যায় রাজধানীর মনিপুরী পাড়ায় মুর্তজা বশীরের ঠিকানায়। অথচ ২০২০ সালের ১৫ আগস্ট করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হয়েছে বরেণ্য এই শিল্পী।


এরআগে গত ১৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) প্রবীর ‍কুমার সরকার স্বাক্ষরিত এই চিঠিতে বলা হয়,ভাস্কর্য বিভাগে একজন সহযোগী অধ্যাপক নিয়োগের জন্য সিলেকশন বোর্ডের একটি সভা আগামী ০৩.১০.২০২২ তারিখ সোমবার বিকাল ৪ ঘটিকায় উপাচার্য মহোদয়ের অফিস কক্ষে স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব নীতিমালা অনুসরণ করে অনুষ্ঠিত হবে। সিলেকশন বোর্ডের সম্মানিত সদস্য হিসাবে অনুগ্রহপূর্বক এই সভায় উপস্থিত থাকার জন্য আপনাকে অনুরোধ করা যাচ্ছে।


এতে আরো বলা হয়, যদি অনিবার্য কারণবশতঃ আপনি সভায় উপস্থিত হতে অপারগ হন, তাহলে প্রার্থীর পদোন্নতি সম্পর্কে আপনার লিখিত মতামত সরাসরি অথবা গোপন খামে উপাচার্য মহোদয়ের নিকট পাঠানোর জন্য আপনাকে অনুরোধ করছি।


পরে এই চিঠি ডাকযোগে পেয়ে ক্ষোভ জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দেন শিল্পী মুর্তজা বশীরের মেয়ে মুনীরা বশীর। এসময় তিনি লেখেন,কি করা উচিত? বাবা কি কবর থেকে সভায় উপস্থিত হয়ে লিখিত মতামত দিবে ? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অব্যবস্থাপনায় কি করণীয়? কি গালি দেয়া উচিত? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) হয়েছেন প্রবীর কুমার সরকার, তিনি কি জবাবদিহিতা করবেন?


তিনি আরো লেখেন,ড. নাসিমা হক মিতু, সহকারী অধ্যাপক ও চেয়ারপারসন, ভাস্কর্য বিভাগ, চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। উনি কি মূর্তজা বশীরকে চিনেন না ? চারুকলা অনুষদের হয়েও একজন স্বনামধন্য ব্যক্তিত্বকে নিয়ে এই অসভ্যতা করার দুঃসাহস তিনি কোথায় পান ?


শিল্পীর আরেক মেয়ে মুনীজা বশীর লিখেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের কাছে মুর্তজা বশীরের মৃত্যুর খবর জানা না থাকা দুর্ভাগ্যজনক!!!!


পরে তাদের এই পোস্টগুলো মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়। এরপরে শুরু হয় ঢাবির দায়িত্বজ্ঞানহীনতার বিষয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া।



মুর্তজা বশীরকে চিঠি পাঠানোর বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাবির ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার প্রবীর কুমার সরকার বিবার্তাকে বলেন, আপনি কালকে অফিসে আসেন। ফাইল দেখে এ বিষয়ে বলতে পারবো।


এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল বিবার্তাকে বলেন, এই বিষয়গুলোতে সংশ্লিষ্ট সেকশন থেকে চিঠি দেয়া হয়। এক্ষেত্রে আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ে যারা কর্মরত আছেন, বিভিন্ন স্তরে তাদের মধ্যে দক্ষতার যথেষ্ট ঘাটতি আছে এবং তারা অনেক ক্ষেত্রে আপডেটেট না। আমরা কাজ করতে গিয়ে এটা এখন বহুভাবে দেখছি ।


তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আত্মীয় স্বজনসহ বিভিন্ন লোকজনকে নিয়োগ দেয়া, হয়তো কোন কর্মকর্তা মারা গেছেন, তখন তার সন্তানদের অর্থাৎ পোষ্যদের নিয়োগ দেয়া হয়। কাজেই এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনেক সময় খুব দুর্বল শ্রেণি নিয়োগপ্রাপ্ত হয় বিধায়, আমরা বারবারই লক্ষ্য করেছি -আমাদের প্রশাসনিক কাজ যারা করেন, তাদের অনেকের দক্ষতার অভাব রয়েছে। এই ঘটনাও তারই ধারাবাহিকতা।


বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ উপাচার্য ( প্রশাসন ) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ বিবার্তাকে বলেন,দে‌শের একজন অগ্রগণ‌্য চিত্রশিল্পী ও ক‌বি-‌লেখক মুর্তজা বশীরকে নি‌য়ে এমন ভুল অমার্জনীয়। তাঁর মৃত‌্যুর খবর অন‌্যতম শীর্ষ সংবাদ হি‌সে‌বে সকল প্রচার মাধ‌্যমে প্রকা‌শিত হ‌য়ে‌ছে। প্রসঙ্গত ডেই‌লি স্টার বাংলা অনলাই‌নে প্রকা‌শিত রে‌জিস্ট্রা‌রের মন্তব‌্য ‌খুবই অসঙ্গত ও দা‌য়িত্বজ্ঞানহীন। এই নি‌য়োগ বো‌র্ডের চেয়ারম‌্যান মাননীয় উপাচার্য; বিশ্ব‌বিদ‌্যাল‌য়ের প্রধান নির্বাহী হি‌সে‌বে তি‌নি রে‌জিস্ট্রা‌রের কা‌ছে ব‌্যাখ‌্যা চে‌য়ে ব‌্যবস্থা নি‌তে পা‌রেন। আর শিল্পী মুর্তজা বশী‌রের একজন স্নেহভাজন হি‌সে‌বে তাঁর পরিবা‌রের কা‌ছে আ‌মি ক্ষমাপ্রার্থী।


সার্বিক বিষয়ে অবগত করা হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বিবার্তাকে বলেন, রেজিস্ট্রার অফিস থেকে হয়তো বিষয়টি ভুলবশত হয়েছে। এটা ভালো দৃষ্টান্ত নয়।


উল্লেখ্য, বাংলার জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর কনিষ্ঠ সন্তান মুর্তজা বশীর ছিলেন একাধারে চিত্রশিল্পী, কবি, লেখক, গবেষক ও সংগঠক। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন মুর্তজা বশীর ছিলেন অগ্রভাগে। চিত্রকলায় অবদানের জন্য ২০১৯ সালে স্বাধীনতা পদক, ১৯৮০ সালে একুশে পদক এবং ১৯৭৫ সালে শিল্পকলা একাডেমি পদক পান মুর্তজা বশীর।


বিবার্তা/রাসেল/জেএইচ


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com