পাঁচবিবি পৌরসভা: শিশুর মনোজগত বিকাশে ব্যতিক্রম স্কুল
প্রকাশ : ২২ জুন ২০২২, ২০:৩৩
পাঁচবিবি পৌরসভা: শিশুর মনোজগত বিকাশে ব্যতিক্রম স্কুল
বিবার্তা প্রতিবেদক
প্রিন্ট অ-অ+

শিশুর মনোজাগতিক বিকাশের জন্য সাংস্কৃতিক চর্চা অপরিহার্য। বিকাশের এই প্রক্রিয়া বাদে তাদের শুধুই পাঠ্যপুস্তকে সীমাবদ্ধ রাখলে পৃথিবীর সকল রূপ-সৌন্দর্য্য অধরাই থেকে যাবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, আজকাল আমাদের অধিকাংশ শিশুর অবস্থা একই। তারা বোল শেখানো তোতা পাখির মতো মুখস্থ বিদ্যায় পাস করছেন, ভালো ফলাফলও করছেন। কিন্তু কোথায় কী যেন নেই! আর এই নেই এর উত্তরে বলা যায়, মনোজগত বিকাশের চর্চা নেই। ফলে শিক্ষা তাদের ব্যক্তিগত জীবনকে বিকশিত করছে না। তবে এক্ষেত্রে তারা দোষী নয়। দোষী আমরা, দোষী আমাদের নীতিনির্ধারকরা। আমরাই শিশুদের সিলেবাসকে মুখস্থ নির্ভর করে রেখেছি, ফলে উপেক্ষিত হচ্ছে সাংস্কৃতিক চর্চা। তবে পাঠ্যক্রমের বাইরেও কিছু স্কুল নিজ উদ্যোগে করছে সাংস্কৃতিক চর্চা। সেই রকম এক ব্যতিক্রমী স্কুলের সন্ধান পেয়েছে বিবার্তা২৪ডটনেট। যেই স্কুলে শিক্ষার সাথে সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটিয়ে শিশুদের শেখানো হচ্ছে। ফলে মনের আনন্দে হেসে-খেলে শিখছেন এই স্কুলের শিক্ষার্থীরা।



বলছি, জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি উপজেলার পৌরসভা পরিচালিত ‘শহিদ আলাউদ্দিন মিউনিসিপ্যাল স্কুলের’ কথা। ২০১২ সালে স্থানীয়দের দাবির প্রেক্ষিতে সাবেক পৌর মেয়র মো. হাবিবুর রহমানের প্রচেষ্টায় ব্যতিক্রম এই স্কুলটি নির্মিত হয়।


বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এই বিদ্যালয়ে প্রি-প্রাইমারি থেকে শুরু করে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা হয়। শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২২০ জন। এর মধ্যে ১১৫ ছাত্র এবং ১০৫ ছাত্রী। শুধু সিলেবাসেই সীমাবদ্ধ নয় এ বিদ্যালয়ের পাঠদান। এখানে পাঠ্যপুস্তকের বাইরে শিশুদের মনোজগত বিকাশের জন্য চিত্রাংকন, লিডারশিপ, ক্যাটারিং ও সাধারণ জ্ঞানসহ জীবনের নানা পাঠের আয়োজন করা হয়। এই স্কুলে প্রায় প্রতি মাসেই ভুলকাভাতি বা চড়ুইভাতির আয়োজন করা হয়। যেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা একসাথে রান্না করেন। সকল শিক্ষার্থীর মাঝে নেতৃত্বগুণ তৈরির জন্য চক্রাকারে দেয়া হয় শ্রেণি অধিনায়কের দায়িত্ব। ৬ দিন পরপর হয় ক্লাস টেস্ট। আছে ড্রেস কোডও।


শহিদ আলাউদ্দিন মিউনিসিপ্যাল স্কুলের উপাধ্যক্ষ নাসরিন সুলতানা বিবার্তাকে বলেন, আমাদের স্কুলের একটি বিশেষত্ব হলো শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়া সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। আমরা এটা করেছি যাতে করে তারা ক্লাসেই সব শিখতে পারে। সবার মধ্যে সমানভাবে নেতৃত্বগুণ তৈরি করার জন্য চক্রাকারে শ্রেণি অধিনায়ক করা হয়। এছাড়া শিক্ষার্থীদের মেধার বিকাশে নিয়মিতভাবে চিত্রাংকন, সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতার আয়োজন করি। উপজেলা পর্যায়ে কুচকাওয়াজসহ অন্যান্য প্রতিযোগিতায় আমাদের শিক্ষার্থীরা প্রতিবছর ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করে।



স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী জাফরিন সুলতানা বিবার্তাকে বলেন, আমাদের স্কুল আশপাশের অন্যান্য স্কুলের মতো নয়। এখানে আমরা পড়ার পাশাপাশি অনেক কিছু শিখি। স্যারেরাও খুব ভালো। মাঝেমাঝে স্কুলে আমরা ও স্যার-ম্যামরা মিলে রান্নাও করি। সেখানেও আমাদের শেখানো হয়।


এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাথে শিক্ষকদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক জানিয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র মো. আরাফাত বিবার্তাকে বলেন, আমাদের স্কুলে শাসন করে নয়, আদর করে পড়ানো হয়। ফলে আশপাশের অন্যান্য স্কুলের অনেকে এসে এখানে ভর্তি হয়।


এদিকে, বিদ্যালয়ের পাশাপাশি শিশুদের মনোবিকাশের জন্য সাবেক পৌর মেয়র গড়ে তুলেছেন ‘ভোর হলো সাংস্কৃতিক বিদ্যালয়’। পৌরসভা পরিচালিত এ বিদ্যালয়ে অভিজ্ঞ শিক্ষক দ্বারা সঙ্গীত, নৃত্য, চিত্রাঙ্কন ও আবৃত্তি শেখানো হয়।


স্থানীয়রা জানান, পাঁচবিবি উপজেলা বিএনপি-জামায়াত অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় এ উপজেলায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সাথে যায়, এ ধরণের আয়োজন প্রায় বন্ধ ছিল। উপজেলা পর্যায়ে ছিল না কোনো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। ২০১৪ সালে সংস্কৃতি চর্চার জন্য সংগঠন রূপে পথচলা শুরু করে ‘ভোর হলো’। পরে ২০১৬ সালে বিদ্যালয় হিসেবে যাত্রা হয়।


বর্তমানে এ সাংস্কৃতিক বিদ্যালয়ে ৪টি কোর্সে ১২১ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এর মধ্যে চিত্রাংকনে ৫৬ জন, সঙ্গীতে ২২ জন, নৃত্যে ১৮ জন এবং আবৃত্তিতে ২৫ জন। চার বছরের এসব কোর্সের জন্য আছে নিজস্ব সিলেবাস। বর্তমানে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছয় ঋতু, রবীন্দ্র, নজরুল জন্মজয়ন্তী উদযাপন করে থাকে। ৭ মার্চ বিশেষভাবে উদযাপন করা হয়। এছাড়া বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উদযাপনসহ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বেশ কয়েকটি নাটক করেছে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।



পাঁচবিবি থিয়েটারের সাধারণ সম্পাদক রাকিন আহমেদ বিবার্তাকে বলেন, আমরা প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শে গড়ে তোলার জন্য মূল ভিত্তি মজবুত করছি। সাবেক মেয়র হাবিব বাংলা সাহিত্যে পড়াশোনা করেছেন, যার কারণে সংস্কৃতির প্রতি তার আলাদা টান রয়েছে। তিনি শুরু থেকেই আমাদের পৃষ্টপোষকতা করে আসছেন। সংস্কৃতির কোনো বিষয়ে তিনি কখনো না করেননি।


সরেজমিনে দেখা যায়,পাঁচবিবি বিপ্লবী ডা. আব্দুল কাদের শিশু পার্কে পাঠাগার গড়ে তুলেছেন সাবেক মেয়র হাবিব। পাঠাগারটির নাম ভাষাসৈনিক মীর শহিদ মণ্ডল পৌর পাঠাগার। জানা গেছে, এই পাঠাগারে ২ হাজারের উপরে বই রয়েছে। এর মধ্যে শিশুসাহিত্য বেশি। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের কারিকুলামে পরিচালিত পাঠাগারের গ্রাহক ১৭টি বিদ্যালয়ের ৪৭০ শিক্ষার্থী।


ভাষাসৈনিক মীর শহিদ মণ্ডল পৌর পাঠাগারের গ্রন্থাগারিক নাঈম হোসেন বিবার্তাকে বলেন, এলাকার তরুণদের বইমুখী করতে এই পাঠাগার স্থাপন করেছেন হাবিব ভাই। এখানে শিশুতোষ বইয়ের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কিত অনেক বই আছে। পাঠাগারে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের ৬ষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সকল বই পাওয়া যায়।



তিনি বলেন, এই পাঠাগার ঘিরে পাঠচক্রও হচ্ছে। পৌরসভার ভেতরে অবস্থিত বিভিন্ন স্কুলের ১৭৫/১৮০ টি বই নিয়ে আমাদের পাঠচক্র হয়। এর মধ্যে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জনকারীকে পুরস্কারও দেয়া হয়। এর সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতা করেন মেয়র হাবিব।


পাঁচবিবির শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার সার্বিক বিষয়ে জয়পুরহাট জেলা শিল্পকলা একাডেমির চারুকলার প্রশিক্ষক মো. মিজানুর রহমান বিবার্তাকে বলেন, পাঁচবিবিতে যেভাবে শিল্প-সংস্কৃতি চর্চা হয়, অন্যান্য জায়গায় এভাবে হয় বলে আমার জানা নেই। আর এই চর্চার পেছনে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন আমাদের মেয়র হাবিব ভাই। তিনি শিল্প-সংস্কৃতিকে ধারণ করেন, লালন করেন। একইসাথে এর পৃষ্ঠপোষকতায়ও নানা উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছেন।


বিবার্তা/সোহেল-রাসেল/রোমেল/জেএইচ


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com