সেই পাপুলের সহচররাই আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী!
প্রকাশ : ১৩ জানুয়ারি ২০২১, ১৬:৪৩
সেই পাপুলের সহচররাই আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী!
খলিলুর রহমান
প্রিন্ট অ-অ+

কুয়েতে মানব পাচারে অভিযুক্ত লক্ষ্মীপুর-২ আসনের (রায়পুর-লক্ষ্মীপুর সদরের আংশিক) সাংসদ কাজী শহিদ ইসলাম ওরফে পাপুলকে ২০১৬ সালের ঈদুল আজহার আগে গ্রামের মানুষ চিনতেন না। গ্রামের বাড়ির সামনে মায়ের নামে একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান করতে গিয়ে এলাকাবাসীর নজরে আসেন তিনি। দুই হাতে দেদার বিলিয়েছেন টাকা। এরপর স্থানীয় আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সাংসদ নির্বাচিত হন।


এরপর দুর্নীতির পথঘাট খোলা রাখতে তিনি রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন প্রতিষ্ঠা করেছেন। এর জন্য লক্ষীপুরের রায়পুর এলাকায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কিছু নেতার পেছনে খরচ করেছেন অঢেল টাকা। টাকার বিনিময়েই স্থানীয় নেতাদের কবজা করাসহ সবকিছু নিজের হাতের মুঠোয় নিয়েছেন পাপুল। দুর্নীতির অভিযোগে ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তলবও করা হয়েছেওইসব নেতাদের। বর্তমানে ওই নেতারাই রায়পুর পৌরসভায় মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশি। ইতোমধ্যে তাদের তালিকা জেলা থেকে কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। এতে তৃণমূল নেতাকর্মী ও সাধরাণ ভোটারদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, আওয়ামী লীগ থেকে তাদের মনোনয়ন দেয়া হলে আরেকজন পাপুলের জন্ম হবে। তাই তাদের মনোনয়ন না দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন সাধারণ ভোটাররা।


দলীয় সূত্রে জানা গেছে, লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলার মেয়র পদে প্রার্থীর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে আওয়ামী লীগ। এ উপলক্ষ্যে গত ৪ জানুয়ারি বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মিয়া মোহাম্মদ গোলাম ফারুক পিংকু। প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নুর উদ্দিন চৌধুরী নয়ন। এছাড়া পৌর আওয়ামী লীগ কমিটি ও নয়টি ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক উপস্থিত ছিলেন। ওই সভায় মেয়র পদে মনোনয়ন প্রত্যাশী ছয় প্রার্থীর মধ্যে একজন প্রার্থীতা প্রত্যাহার করে নেন। পরে বাকি পাঁচ জনের মধ্যে সমঝোতা না হওয়াতে সভায় উপস্থিত সকলের সম্মতিক্রমে জেলা আওয়ামী লীগ নেতারা গোপন ব্যালেটের মাধ্যমে ভোট গ্রহণ করেন।


তবে অভিযোগ উঠেছে, জেলা আওয়ামী লীগ নেতাদের তাৎক্ষণিক ভোট গ্রহণের বিষয়টি ছিলো লোক দেখানো। বর্ধিত সভায় যে গোপন ব্যালেটের মাধ্যমে ভোট গ্রহণের আয়োজন করা হবে তা জানতো পাপুল গংরা। এজন্য তারা বড় অংকের টাকা দিয়ে দলীয় ভোটারদের কিনে নিয়েছে। টাকার ছড়াছড়িতে ত্যাগী এবং জনপ্রিয় নেতারা কোন ভোট পাননি।


জেলা আওয়ামী লীগের নেয়া গোপন ব্যালেটের ভোটে সাবেক মেয়র রফিকুল হায়দার বাবুল পাঠান পেয়েছেন ২৮ ভোট, কাজী নাজমুল কাদেও গুলজার ১৭ ভোট, হাজী ইসমাইল খোকন ১২ ভোট। তবে হারুনুর রশীদ ও গিয়াস উদ্দিন রুবেল ভাট কোনো ভোট পাননি।


যারা ভোট পেয়েছেন, তাদের নিয়ে এলাকায় এবং সাধারণ ভোটারদের মধ্যে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। শুধু তাই নয়, তাদের কর্মকান্ডে অতিষ্ঠ পুরো পৌরবাসী। এমনকি তৃণমূলের দলীয় নেতাকর্মীরাও তাদের উপর ক্ষুব্ধ। এছাড়া দীর্ঘ দিন থেকে ওই ভোটে সাবেক মেয়র রফিকুল হায়দার বাবুল পাঠান, কাজী নাজমুল কাদের গুলজার ও হাজী ইসমাইল খোকন মিলে গড়ে তুলেছেন শক্তিশালী সিন্ডিকেট। তাই টাকার বিনিময়ে বর্ধিত সভায় ভোট কিনেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ওই সিন্ডিকেটের কারণে দীর্ঘ ১৮ বছর থেকে রায়পুর পৌরসভায় আওয়ামী লীগের কোনো পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা সম্ভব হয়নি। এমনকি সর্বশেষ পৌর আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটির মেয়াদ ৮ বছর অতিবাহিত হলেও ওই সিন্ডিকেটের কারণে পূণাঙ্গ কমিটির আলো দেখা যায়নি।


অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওই সিন্ডিকেটের প্রধান লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও সাবেক মেয়র রফিকুল হায়দার বাবুল পাঠান মাত্র এইচএসসি পাস। তিনি ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মোহাম্মদ আলী খোকনের আনারস প্রতীকের পক্ষে কাজ করেন। এ জন্য দলীয় প্রার্থী আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক হারুনুর রশিদ পরাজিত হন। ১৯৯৮ সালে তিনি প্রথম মেয়র হয়েই পারিবারিক কলহের জের ধরে পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সেকান্তর মিয়া নামের এক আওয়ামী লীগ কর্মীকে হত্যা করেন। এছাড়া নিজ বাস ভবনের জায়গাসহ কয়েকটি দোকান দখল করে পাঁচতলা ভবন নির্মাণ করেন। যা জনমনে আতঙ্ক দেখা দেয়। পরবর্তী সময়ে তিনি এমপি মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম পাপুলের কাছের সহচর হয়ে যান। সেই কারণে পাপুলের বিপুল পরিমান অর্থ তার কাছে রয়েছে। আর ওইসব অর্থ নির্বাচনে অন্য প্রার্থীর জন্য হুমকি বলে মনে করছেন দলীয় নেতাকর্মীরা। তবে এসব অর্থের হিসাব চেয়ে ইতোমধ্যে দুদক তাকে চিঠি দিয়েছে। এছাড়াও পাঠানের রয়েছে নিজস্ব সস্ত্রাসী বাহিনী। ওই বাহিনীর সদস্যরা জমি দখলসহ বিভিন্ন অপর্কমে জড়িত। ওই বাহিনীর প্রধান তার আপন ভাগিনা মো. কামাল ওরফে বোম কামাল। তার মাধ্যমে নির্বাচনে টাকা দিয়ে ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।


এসব অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও সাবেক মেয়র রফিকুল হায়দার বাবুল বিবার্তাকে বলেন, আমি একটি স্কুলের মিটিংয়ে আছি। পরে ফোন দিব।


পাঠান ছাড়াও পৌর নির্বাচনের মেয়র প্রার্থীর তালিকার রয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী নাজমুল কাদের গুলজার। তিনিও মাত্র অষ্টম শ্রেণি পাস। তারপরও মেয়র হওয়ার স্বপ্ন দেখে যাচ্ছেন। তিনি পৌর আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কাজী জামশেদ কবির বাকি বিল্লাহর আপন ভাই। কাজী জামশেদ কবির বাকি বিল্লাহও পাপুলের অন্যতম সহযোগি। এ জন্য ইতোমধ্যে দুদক থেকে তাকেও চিঠি দেয়া হয়েছে।


অষ্টম শ্রেণি পাস কাজী নাজমুল কাদের গুলজার পেশায় একজন দলিল লেখক। সেই সুবাধে বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে তিনি দলিল লেখক সমিতির সভাপতি হয়েছেন। তার ভাই কাজী জামশেদ কবির বাকি বিল্লাহ পৌর আওয়ামী লীগের আহ্বায়কের পাশাপাশি জাকের পার্টির আহ্বায়কের দায়িত্বেও রয়েছেন। তাদের আরেক ছোট ভাই কাজী আরজুও পৌর কমিটির সদস্য। আর তার ভাই কাজী জামশেদ কবির বাকি বিল্লাহর হাত ধরেই আলোচিত এমপি কাজী পাপুল রায়পুর পৌরসভায় আগমন করেন। যা আজ বিশ্বের কাছে কলঙ্কিত হয়ে আছে। বাকি বিল্লাহর পাপুলের কাণ্ডে জড়িত হয়ে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। এছাড়া দলের নামে চাঁদাবাজি, জমি দখল, লুটপাট, মসজিদের টাকা, সিএনজি চাঁদাবাজি করে শতকোটি টাকার মালিক হয়েছেন। যার কারণে দুদক থেকে সম্পদের বিবরণী জমার জন্য চিঠি দেয়া হয়েছে। এছাড়া কাজী নাজমুল কাদের গুলজার নিজে দলিল লেখক সমিতির নামে মাসে কোটি কোটি টাকা আত্মসাত করেন। তাই গুলজার পৌর মেয়র হলে তাদের অত্যাচার ও চাঁদাবাজিতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ জনসমর্থনহীন হয়ে পড়বে বলে মনে করেন অনেকেই।


কাজী নাজমুল কাদের গুলজারের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তার স্ত্রী ফোন রিসিভ করে বলেন, উনি বাসায় নেই। পরে যোগাযোগ করার জন্য বলব।


আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশি আরেক ব্যক্তির নাম ইসমাইল হোসেন খোকন। তিনি বর্তমান মেয়র। এছাড়া ১৮ বছর থেকে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ প্রার্থী হারুনুর রশিদের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েচিলেন তিনি। সেই সময় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মোহাম্মদ আলী খোকনের পক্ষে কাজ করেন। তার কাছে আলোচিত সেই পাপুলের বিপুল পরিমান অর্থ রয়েছে। এ কারণে দুদক থেকে তাকেও চিঠি দেয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, তিনি ডাকাতিয়া নদী ইজারা দেওয়া এবং নদী দখল করে বিপুল পরিমান অর্থ আত্মসাত করেছেন।


দলীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ তিনি দীর্ঘ ১৮ বছর থেকে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদে থেকে দলকে গতিহীন করে রেখেছেন। পৌর সভায় উন্নয়ন তো দূরের কথা, উল্টো পৌরকর ৭০গুন বৃদ্ধি করে আদালতে মামলায় হাজিরা দিচ্ছেন তিনি। এতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়েছে। ১৮ বছর থেকে সাধারণ সম্পাদকের পদে থাকলে দলীয় কোনো কর্মকাণ্ডে তাকে পাওয়া যায় না। তাই তাকে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয় দিলে তরুণ প্রজন্মের ভোটাররা তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেবেন বলে মনে করেন স্থানীয়রা।


এসব অভিযোগের ব্যাপারে জানতে বর্তমান মেয়র ও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশি ইসমাইল হোসেন খোকনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।


তাদের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগের ব্যাপারে লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নুরউদ্দিন চৌধুরী নয়নের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিবার্তাকে বলেন, আমি আদালতে আছি। পরে কথা বলব।


তবে লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মিয়া মোহাম্মদ গোলাম ফারুক পিংকুর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিবার্তাকে বলেন, বর্ধিত সভায় ভোটের মাধ্যমে প্রার্থীদের তালিকা ঢাকায় প্রেরণ করা হয়েছে। এখন কেন্দ্র বিষয়টি দেখবে। কেন্দ্র যাকে দিবে তিনিই আওয়ামী লীগের প্রার্থী হবেন।


দীর্ঘ ১৮ বছর থেকে দলীয় পূর্নাঙ্গ কমিটি না হওয়া ও টাকার বিনিময়ে বর্ধিত সভায় ভোট পাওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অনেক দিন থেকে কমিটি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বর্তমানে করোনার জন্য পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি বলে বিষয়টি এড়িয়ে যান। এছাড়া টাকার বিনিময়ে ভোটের ব্যাপারে তিনি বলেন, কেউ যদি টাকা দিয়ে ভোট কিনে তা হলে তো কিছুর করার থাকে না।


বিবার্তা/খলিল

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com