বিদায়ী ডিজি জামালের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়
প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০২০, ১৭:৩২
বিদায়ী ডিজি জামালের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়
খলিলুর রহমান
প্রিন্ট অ-অ+

মো. জামাল উদ্দীন আহমেদ। তিনি ২০১৭ সালের ২৯ জুন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মহাপরিচালকের (ডিজি) দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০২০ সালে ২০ জুলাই দায়িত্ব থেকে বিদায় নেন। কিন্তু বিদায় নেয়ার আগেই তিনি ওই অধিদফতরে নানা দুর্নীতি ও অনিয়মের জন্ম দিয়ে গেছেন।


শুধু তাই নয়, বিএনপি-জামায়াতের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পরিচিত ওই ডিজি আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সাবেক নেতাদের অহেতুক বদলি ও নানা কৌশলে হয়রানিও করেছেন। এমনকি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদের নাতিসহ চিহিৃত বিএনপি-জামায়াত নেতাদের পদোন্নতি দিয়েছেন তিনি।


অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপতরে যোগদানের পর থেকেই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে পদোন্নতি, নামে-বেনামে বারের অনুমোধন দিয়েছে জামাল উদ্দীন। এছাড়াও টাকার বিনিময়ে ছাত্রদল ও শিবির নেতাদের শীর্ষ দায়িত্বে দিয়েছেন তিনি। এদের মধ্যে উপ-পরিচালক (প্রশাসন) পদে বিএনপি নেতা মওদুদ আহম্মদের আপন নাতিকে নিয়োগ দিয়েছেন। এছাড়াও সহ-পরিচালক (প্রশাসন) পদে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিবির নেতা জিল্লু নিয়োগ পান তার আমলে।


ঢাকা অঞ্চলের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক পদে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিবির নেতা ফজলুর রহমানকে ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিবির নেতাকে উপ-পরিচালক (অপস) পদে নিয়োগ দিয়েছেন তিনি। তবে এক্ষেত্রে ছাত্রলীগের সাবেক নেতাদের তালিকাভিত্তিক বদলি ও হয়রানি করেছেন তিনি। শুধু তাই নয়, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পাইপ খাওয়া ছবি দিয়ে মাদক বিরোধী দিবসের ফেস্টুন তৈরি করেও সমালোচিত হয়েছেন ওই ডিজি।


অভিযোগ রয়েছে, পদ স্থায়ী ছাড়া কাউকে পদোন্নতি দেয়ার কোনো নিয়ম না থাকলেও ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তিনি অনেকেই পদোন্নতি দিয়েছেন। এছাড়া অধিদপতরের অনেকেই সৃষ্ট পদে পদোন্নতি দিয়েছেন তিনি। কিন্তু সৃষ্ট পদে পদোন্নতির কোনো বিধান নেই। এভাবে সিপাহী দারোগা পদে পদোন্নতি পেয়েছে ১০০ থেকে ১৫০ জনের মত। এছাড়া স্নাতক ছাড়া কাউকে কেরানি থেকে প্রশাসনিক কর্মকর্তা (এও) পদে পদোন্নতি না দেয়া গেলেও এসএইচসি পাসেও পদোন্নতি দেয়া হয়েছে ১৯ জনকে। তাদের মধ্যে ১৪ জনকে চার্জে দেয়া হয়েছে। প্রতিজনের কাছ থেকে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকেই সুদে টাকা এনে জামাল উদ্দীনকে দিয়েছেন।


এছাড়াও রেশন দেয়ার কথা বলে জামাল উদ্দীন প্রত্যেকের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা করে দিয়েছেন তিনি। আর সোর্স মানির টাকা আর চাঁদার টাকা নিয়ে এসআই হতে সবাইকে সরকারি বরাদ্দ ছাড়াই মোবাইল সেট সরবরাহ করেছে। যা দিয়ে তিনি সবাইকে ট্র্যাকিং করতেন। এর কারণ যাতে কেউ যেন বড় কোনো মামলা করতে না পারে। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এসআই, একাউন্টেন্ট ও ড্রাইভার পদে ৫০ জন করে ১৫০ জন নিয়োগ দিয়েছে তিনি। ৬০০ সিপাই আর ৫০ জন সহকারী প্রসিকিউটর নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এতে বাধার মুখে পড়ে একাজে সফল হতে পারেনি।


নামে-বেনামে বার


প্রায় তিন বছর দায়িত্ব পালন করেই ৩৭টি বারের অনুমতি দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন তিনি। দেশ স্বাধীনের পর কোনো ডিজিই একসাথে এত বারের অনুমতি দেননি। অনুমতিপ্রাপ্ত ওই বারগুলোর মধ্যে কয়েকটি বারের কোনো অস্থিতও খুঁজে পাওয়া যায়নি। ৩ থেকে ৫ কোটি টাকার বিনিময়েই বারগুলোর অনুমতি দিয়েছেন তিনি। এমনকি দায়িত্ব শেষ হওয়ার চারদিন আগেই আরো সাতটি বারের অনুমোদন দিয়েছেন।


অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, দেশ স্বাধীনের পর থেকে সারা দেশে বার ছিল ৭৬ টা। কিন্তু ডিজি জামাল উদ্দীন একাই ৩৭টি বারের অনুমতি দিয়েছেন। তবে বারের অনুমতি দেয়ার সরকারের আইন ও নীতিমালা থাকলেও তা তোয়াক্কা করতেন না তিনি।


সংশ্লিষ্টরা জানান, বার দেয়ার আগে কয়েক দফায় তদন্ত করা হয়। পরে তদন্ত প্রতিবেদন প্রধান কার্যালয়ে যায়। সেখানে একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি ফের তদন্ত করে। তখন যদি তারা সন্তোষজনক মত পোষণ করে তাহলে সেটা বোর্ডে উপস্থাপন করা হয়। সেখানে পাস হওয়ার পর ফাইলটি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। সেখান থেকে অনুমতি দেয়া হয়। কিন্তু জামাল উদ্দীন মাত্র তিন দিনের মধ্যে বারের অনুমতি দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। অথাৎ টাকা দিলেই পাওয়া যেতে বারের অনুমতি। এছাড়াও অবৈধভাবে তিনি টাকার বিনিময়ে মদের লাইসেন্স নবায়নও করে দিতেন।


প্রতিদিন ৭০০ ডলার ভাড়ায় হোটেলে থাকতেন তিনি


দায়িত্ব চলাকালে ব্যক্তিগত কাজে চট্টগ্রামের হোটেল আগ্রাবাদে লিমিটেডে ১৯ দিন অতিবাহিত করেছেন তিনি। এ সময় ওই হোটেলে প্রতিদিন ভাড়া বাবদ ৭০০ ডলার দেয়া হয়। যা বর্তমানে ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা। ওই টাকাও অধিদপতর থেকে নিয়েছেন তিনি। এসব অবৈধ টাকা আয় করে তিনি চট্টগ্রাম শহরের তিন বিঘা জমির উপর একটি সেমি পাকা বস্তি নির্মাণ করেছেন।


গত বছর তার মেয়ের এবং মেয়ের জামাইর নামে আশুলিয়াতে তিন একর জায়গা কিনেছেন। এছাড়াও বাসার কাজের ছেলেকে ড্রাইভার হিসেবে নিয়োগ দিয়ে সরকারি ড্রাইভারকে বিদায় করে দেন তিনি। সেই সুবাদে কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র হতে আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে বেতন দেয়া হত ওই ড্রাইবারকে।


এসব অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে বিদায়ী ডিজি মো. জামাল উদ্দীন আহমেদের সাথে যোগাযোগ করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


বিবার্তা/খলিল/উজ্জ্বল/জাই

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com