নকল মাস্কের দায় নিলো না কেউ!
প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০২০, ২০:৪০
নকল মাস্কের দায় নিলো না কেউ!
বিবার্তা প্রতিবেদক
প্রিন্ট অ-অ+

করোনাভাইরাস বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুত গতিতে। গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়েছে ৩০৬ জন এবং মারা গেছেন নয় জন। করোনায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবায় যারা নিয়োজিত তাদের সুরক্ষায় ব্যবহার করা হয় এন-৯৫ নামের একটি মাস্ক। জেএমআই গ্রুপ নামের একটি প্রতিষ্ঠান সেই মাস্ক স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে সরবরাহ করে। সরবরাহ করা সেই মাস্কের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জামায়াত নেতার প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত জেএমআই গ্রুপ নকল মাস্কসহ অন্যান্য সামগ্রী সরবরাহ করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।


মাস্কের মান নিয়ে প্রশ্ন ব্যবহারকারীদের। কিন্তু যারা সরবরাহ করেছে এবং সরকারের যে দফতর গ্রহণ করেছে উভয়ই এর দায় নিতে অপারগ।


বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, যেটা সরবরাহ করা হয়েছে সেটা আসল ‘এন-৯৫’ মাস্ক নয়। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী দুলাল সাংবাদিকদের বলেন, চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের জন্য নিম্নমানের মাস্ক ও পিপিই সরবরাহ করা হয়েছে। এগুলো ব্যবহার করে করোনায় আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসায় আইসোলেশন ওয়ার্ড, আইসিইউ ও ল্যাবরেটরিতে যাওয়া সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে মারাত্মক ঝুঁকি থাকে। মাস্কের ওপর শুধু ‘এন-৯৫’ সিল মারা, এটা পুরোটাই নকল।


জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে ওই মাস্কের মান নিয়ে অভিযোগ আসে। মুগদা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ লিখিতভাবে সিএমএসডিকে (কেন্দ্রীয় ঔষধাগার) বিষয়টি জানিয়েছিল। খুলনার একটি হাসপাতালও একই অভিযোগ তুলেছিল। কিন্তু কারোর কথায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতর কর্ণপাত করেনি। অবশেষে গোয়েন্দা রিপোর্টে বিষয়টির সত্যতা মিলেছে। প্রথম দিকে ২০০ থেকে ২৫০ পিস প্রকৃত ‘এন-৯৫’ মাস্ক সরবরাহ করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। পরে দেশে তৈরি নিম্নমানের মাস্ক ‘এন-৯৫’ প্যাকেটে সরবরাহ করা হয়।


সূত্র জানায়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদফতর ও কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) একশ্রেণির কর্মকর্তার যোগসাজশে নকল ‘এন-৯৫’ মাস্ক মুন্সীগঞ্জের একটি কারখানায় তৈরি করে ভুয়া আমদানি দেখিয়ে সরবরাহ করেছে জেএমআই। কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের করোনা মোকাবিলা সামগ্রী কেনাকাটার প্রায় ৭০ শতাংশই সরবরাহ করে জেএমআই। তাদের সরবরাহ করা ‘এন-৯৫’ মাস্কের মান নিয়ে শুরু থেকেই চিকিৎসকদের প্রশ্ন ছিল। ডাক্তাররা বারবার বলে আসছিলেন, এটি দুই নম্বর মাস্ক। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বিষয়টি কর্ণপাত করেননি।


সম্প্রতি একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা বিষয়টি তদন্ত করতে গিয়ে ভয়াবহ তথ্য পান। জেএমআই প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে জামায়াতের অন্যতম ডোনার। সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য পরিকল্পিতভাবে এই প্রতিষ্ঠান নিম্নমানের মাস্ক চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের মধ্যে সরবরাহ করেছে। আর তাকে কাজ পাইয়ে দিতে সহায়তা করেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা। একজন শীর্ষ কর্মকর্তা ও তার সন্তানও এই চক্রে জড়িত বলে গোয়েন্দা রিপোর্টে উঠে এসেছে। করোনা মোকাবিলায় শুরুতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়কে কাজে না লাগানো তাদের ষড়যন্ত্রের অংশ। জানা গেছে, সম্প্রতি গোয়েন্দা রিপোর্টটি সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়েছে।


গোয়েন্দা রিপোর্টে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক শ্রেণির কর্মকর্তা করোনা ইস্যুকে পুঁজি করে নগ্ন বাণিজ্যে মেতে উঠেছে।স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা যিনি ছাত্র জীবনে শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।সারাজীবন বিএনপি-জামায়াতের স্বার্থে কাজ করা ওই কর্মকর্তার সহায়তায় জেএমআই প্রতিষ্ঠানটি মন্ত্রণালয়ের সিংহভাগ কাজ পেয়েছে। বর্তমান সরকারকে বিপদে ফেলতেই নকল ‘এন-৯৫’ মাস্ক সরবরাহ করেছে। এর মাধ্যমে দেশের সকল চিকিৎসকে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। ঝুঁকির মুখে আজ দেশের স্বাস্থ্যসেবা, বিপন্ন হয়ে পড়েছে সরাসরি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী চিকিৎসক ও নার্সদের জীবন।


রিপোর্টে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, অতিদ্রুত উল্লেখিত ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া না হলে সামনে আরো বড়ো ধরনের বিপদে পড়তে হবে আমাদের, জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আপোস করার কোনো সুযোগ নেই; স্বাস্থ্য খাতকে বাঁচাতে হলে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতেই হবে।


সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মুগদা হাসপাতালে ৩০০ মাস্ক দেয়া হয়। যেগুলোর মোড়কে ‘এন-৯৫ ফেস মাস্ক’ লেখা ছিল। এগুলো দেখে চিকিৎসকদের সংশয় তৈরি হয়। স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্র জানায়, মুগদার ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালককে এ বিষয়ে একটি চিঠি দিয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, হাসপাতালের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩০ মার্চ কেন্দ্রীয় ঔষধাগার অন্যান্য মালামালের সঙ্গে ৩০০টি ‘এন-৯৫’ মাস্ক সরবরাহ করেছে। জেএমআই গ্রুপ এই মাস্কের প্রস্তুতকারী। এই মাস্কগুলো প্রকৃতপক্ষে ‘এন-৯৫’ কি না, সে বিষয়ে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও স্থানীয় সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী টেলিফোনে হাসপাতালের পরিচালকের কাছে জানতে চেয়েছেন। চিঠিতে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় মতামত দেয়ার অনুরোধ করা হয়।


নকল মাস্ক সরবরাহের ব্যাপারে জেএমআই গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুর রাজ্জাকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


পরে জেএমআই গ্রুপের জনসংযোগ কর্মকর্তা আ.ফ.ম রিয়াজ উদ্দিন মানিকের সাথে যোগাযোগ করা হয়। এ সময় তিনি বিবার্তাকে বলেন, এটা একটা অনিচ্ছাকৃত ভুল ছিল। যার দায়ভার কোনোভাবেই জেএমআই এর উপর বর্তায় না। যা ইতোমধ্যেই এনএসআইকে লিখিত ও মৌখিকভাবে আমাদের ব্যখ্যা দিয়েছি। সিএমএসডি আমাদের এন৯৫ মাস্কের কোনো অর্ডার দেয়নি। আমরাও এন৯৫ মাস্ক দেইনি সিএমএসডিকে। তবে আমাদের আরএনডির কিছু প্রোডাক্ট ছিল যেটার বক্স করা হয়েছিল। সেই বক্সেই আমাদের মাস্কগুলো ভুলে সরবরাহ করায় এই বিপত্তি বাধে।


তিনি বলেন, আমরা পরবর্তীতে বিভিন্ন সংস্থার কাছে আমাদের কথা অফিসিয়ালি তুলে ধরেছি। এটা উল্লেখ করতে চাই যে, অভিযোগ আসার কিছুক্ষণ পরেই আমাদের মাস্কগুলো আমরা ফেরত নিয়েছি। যা মুগদা হাসপাতালে গিয়েছিল এবং সাথে সাথে অফিসিয়ালি চিঠি দিয়ে আমার অর্ডার বাতিল করিয়েছি।


তিনি আরো বলেন, জেএমআই গ্রুপ বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে ২১ বছর সুনামের সাথে কাজ করে চলেছে। কোনো প্রকার উদ্দেশ্য নিয়ে নয় বরং অনিচ্ছাকৃত এই ভুলের জন্য তাৎক্ষণিকভাবেই ক্ষমা চেয়ে মালামাল সেদিনই প্রত্যাহার করে নিয়েছে জেএমআই।


সংশ্লিষ্টরা জানান, স্বাস্থ্য অধিদফতরে বসে থাকা আওয়ামী লীগ বিরোধীদের চিহিৃত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া না হলে বড় ধরনের বিপদ আসতে পারে। স্বাস্থ্য খাতকে বাঁচাতে হলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করছেন তারা।


তবে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ সাংবাদিকদের বলেন, জেএমআই গ্রুপ নামের প্রতিষ্ঠানটি ‘এন-৯৫’-এর প্যাকেটে সাধারণ মাস্ক দিয়েছে ভুলবশত। এজন্য কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের পক্ষ থেকে জেএমআইকে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হয়েছে।


বিবার্তা/খলিল/জাহিদ

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com