করোনায় হারিয়ে গেছে ‘হালখাতা’
প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০২০, ১৯:২৩
করোনায় হারিয়ে গেছে ‘হালখাতা’
খলিলুর রহমান
প্রিন্ট অ-অ+

বাঙালি প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। অতীতে বৈশাখের প্রথম দিনে দেশের ব্যবসায়ীরা বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে হালখাতার আয়োজন করত। অর্থনৈতিক কর্মকন্ডেও হালখাতার গুরুত্ব ছিলে অনেক বেশি। বছরের প্রথম দিন ব্যবসায়ীরা তাদের পুরনো বছরের দেনা-পাওনার হিসাব সমন্বয় করে নতুন খাতা খোলতেন।


ভোক্তারা হালখাতার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন। দেনা শোধ করে দোকানি বা ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান থেকে মিষ্টিমুখে সম্মানিত হওয়ার বিষয়টি ছিল ভোক্তাদের কাছে মর্যাদার। বিষয়টি এতই প্রাণবন্ত ছিল যে, ভোক্তারা বকেয়া শোধ করে হালখাতায় অংশগ্রহণ করতে পারলে নিজেদের সৌভাগ্যবান মনে করতেন। কিন্তু এবার এমন দৃশ্য দেখা যায়নি। করোনাভাইরাসের কারণে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের কোথাও‘হালখাতা’র অনুষ্ঠানের আয়োজন করেননি ব্যবসায়ীরা।


ব্যবসায়ীদের সাথে আলাপকালে জানা গেছে, পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানের মূল আয়োজন থাকতো হালখাতা। দুই দশক আগেও বৈশাখের প্রথম দিনে গ্রামাঞ্চলের হাটবাজারে অবস্থিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকরা মূলত এর আয়োজন করতো। অনুষ্ঠানের এক সপ্তাহ আগে থেকেই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকরা কার্ডের মাধ্যমে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি হালখাতার আমন্ত্রন দিতেন।


সেই আমন্ত্রণপত্রে বকেয়া অর্থের কথা উল্লেখ থাকতো। আর পহেলা বৈশাখের দিন রঙ-বেরঙের কাগজের নকশা দিয়ে সাজানো হতো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে। সকাল থেকে প্রতিটি মানুষ তাদের পাওনা পরিশোধ করতে দোকানে আসতেন। তা চলতো রাত পর্যন্ত। আর প্রতিষ্ঠানের মালিকরা মতিচুরের লাড়ু ও মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন করতেন আগত ক্রেতাদের। কিন্তু করোনার কারণে এবার এই পরিবেশ আর নেই।


ব্যবসায়ীরা জানান, করোনার কারণে দীর্ঘ দিন থেকে দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। তাই এবার হালখাতার জন্য কোনো ক্রেতাকে দাওয়াত দেয়া হয়নি। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে হালখাতার আয়োজন করা হবে বলেও অনেক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন।


কাওরান বাজারের ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বিবার্তাকে বলেন, প্রতি বছর তিনি ঐতিহ্যবাহী হালখাতার আয়োজন করেন। কিন্তু করোনার জন্য এবার হালখাতার আয়োজন করতে পারিনি। তবে হালখাতা পুরো বৈশাখ মাসজুড়ে আয়োজন করা হয়। করোনা ভাইরাস শেষ হলে আয়োজন করা হবে বলে আশাপ্রকাশ করেন তিনি।


তিনি অতীতের কথা স্মৃতীচারণ করে বলেন, পহেলা বৈশাখ আসার আগ থেকে আলাদা একটি আমেজ থাকতো। দোকানে দোকানে মিষ্টি বিতরণ করা হতো। ভালো ভালো খাবারের আয়োজন করা হদো। কিন্তু এবার সেই আমেজ বা আয়োজন ব্যবসায়ীরে মাঝে নেই।


এদিকে, হালখাতা উৎসবটি এবার গ্রাম অঞ্চলেও আয়োজন করা হয়নি। মঙ্গলবার দিনে কয়েকজন ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে এমনটাই জানা গেছে।


মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার কটারকোনা গ্রামের ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান রহমত। তিনি বিবার্তার এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, গত কয়েক দিন থেকে গ্রামের বাজারগুলো বন্ধ রয়েছে। দোকান না খোলতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিদের্শনা দেয়া হয়েছে। তাই ব্যবসায়ীরা দোকান বন্ধ রেখেছে। এ জন্য এবার হালখাতার আয়োজন করা হয়নি।


উল্লেখ্য, গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সন্ধান পাওয়া যায়। এরপর প্রথম দিকে কয়েকজন করে নতুন আক্রান্ত রোগীর খবর মিললেও গত ক’দিনে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে এ সংখ্যা। সবশেষ হিসাবে দেশে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ১ হাজার ১২। মারা গেছেন ৪৬ জন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৪২ জন।


প্রাণঘাতী এই ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে সাধারণ ছুটি ঘোষণার পাশাপাশি নানা পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে; যার মূলে রয়েছে মানুষে মানুষে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা। মানুষকে ঘরে রাখতে রাজপথের পাশাপাশি পাড়া-মহল্লায় টহল দিচ্ছে সশস্ত্র বাহিনী, র‌্যাব ও পুলিশ।


বিবার্তা/খলিল/আবদাল

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com