স্ত্রী ও দুই সন্তানকে যেভাবে খুন করে রকিব
প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০২০, ২০:০৯
স্ত্রী ও দুই সন্তানকে যেভাবে খুন করে রকিব
খলিলুর রহমান
প্রিন্ট অ-অ+

১২ ফেব্রুয়ারি বেলা ১১টা। স্ত্রী ও সন্তাদের নিয়ে নাস্তা করেন প্রকৌশলী রকিব উদ্দিন আহমেদ লিটন। নাস্তা শেষে স্ত্রী মুন্নীর সাথে গল্প করেন তিনি। গল্প শেষে দুপুর সাড়ে ১২টায় মুন্নী হালকা ঘুমিয়ে পড়ে। ছেলে ফারহান পাশের রুমে ঘুমিয়ে ছিল এবং মেয়ে লাইবা তার পাশের রুমে টিভি দেখছিল। এ সময় হঠাৎ রকিবের মাথায় চিন্তা আসে এই দুনিয়ায় তিনি তার পরিবারসহ বেঁচে থেকে লাভ কি? বরং তাদের সবাইকে মেরে তিনি নিজে আত্মহত্যা করলে পাওনাদার ও অন্যান্য দুনিয়ার যন্ত্রনা থেকে মুক্তি পাবে। তখনই সে তার বাসায় থাকা হাতুড়ি দিয়ে প্রথমে তার স্ত্রীর মাথায় আঘাত করে এবং গলা চেপে মেরে ফেলে। এরপর তিনি তার মেয়ে ও ছেলেকে গলায় রশি প্যাচিয়ে ফাঁস দিয়ে হত্যা করেন। পরে বিকাল চারটার দিকে রকিব বাসায় তালা দিয়ে বের হয়ে রেল লাইনে যায়। ট্রেনের নীচে পড়ে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করে। কিন্তু তিনি আত্মহত্যা করতে না পেরে বিভিন্ন জায়গায় পাগলের মত ছদ্মবেশ ধারণ করে ঘুরতে থাকে। পুলিশের কাছে এভাবেই নির্মম ওই হত্যাকাণ্ডে বর্ণনা দিয়েছেন ঘাতক রকিব উদ্দিন আহেমদ।


পুলিশ জানায়, মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) রাজধানীর দক্ষিণখানের প্রেমবাগান এলাকার একই পরিবারের স্ত্রী ও দুই সন্তান হত্যা মামলা মূল আসামি রকিব উদ্দিন আহমেদকে (৪৬) গ্রেফতার করা হয়। ওই দিন বিকেলে ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার সদর থানা এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।


পুলিশে আরো জানান, গ্রেফতারের পর রকিবকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এ সময় ট্রিপল মার্ডার সম্পর্কে রকিব জানায়, সে নিজেই তার স্ত্রী, তার ছেলে ও মেয়েকে হত্যা করে পাগলের বেশ ধারণ করে বিভিন্ন জায়গায় আত্মগোপন করে ছিল।


হত্যার কারণ সম্পর্কে সে জানায়, তার স্ত্রী মুন্নী (৩৭), ছেলে ফারহান (১২) ও মেয়ে লাইবাকে (৩) নিয়ে দক্ষিণ প্রেমবাগান এলাকার মো. মনোয়ার হোসেনের বাড়ির ৪র্থ তলার দক্ষিণ পাশের ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে বসবাস করতো। সে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানী লি. (বিটিসিএল)-এ কনিষ্ঠ সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে উত্তরায় কর্মরত ছিল। মাঝে মাঝে টুকটাক পারিবারিক বিষয় নিয়ে ঝামেলা হলেও সবাইকে নিয়ে সুখে শান্তিতে একত্রে বসবাস করছিল। সে যে এলাকায় থাকত সেখানে এবং তার অফিসেও তার বেশ সুনাম ছিল। তার নারী বা মাদক সেবনের কোনো বদ অভ্যাস ছিল না।


অফিসের কলিগসহ অন্যান্য ব্যক্তির নিকট থেকে প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা সুদের উপর বিভিন্ন সময়ে ধার নিয়েছিল। অন লাইনে জুয়া খেলে সে সব টাকা নষ্ট করে। এদিকে পাওনাদাররা তাদের পাওনা টাকা আদায়ে চাপ দিতে থাকে। এ কারণে সে বাসায় স্ত্রী-সস্তানদের সাথে খারাপ আচরণ করতো এবং গত ডিসেম্বরে কিছু দিন আত্মগোপনে ছিলেন তিনি। তখন তার পরিবার দক্ষিণখান থানায় জিডি করে। কিন্তু কিছুদিন পরে তিনি বাসায় ফিরে আসেন। পাওনাদারদের টাকার চাপে তিনি তার পরিবারের সদস্যদের সাথে বিভিন্ন সময় আলোচনা করলেও তার পরিবার এবং আত্মীয়-স্বজন তাকে তার জুয়া খেলার কারণে বিশ্বাস করতো না। তখন পাওনাদারদের বিভিন্ন চাপের কারণে রকিব উদ্দিন আহম্মেদের স্ত্রী মুন্নী ও তার ছেলে ফারহান তাকে বলে, এভাবে বেঁচে থেকে লাভ কি? আমাদের কাউকে দিয়ে মেরে ফেলো, এভাবে বেঁচে থাকতে ভাল লাগে না। পাওনাদারদের চাপ, আত্মীয় স্বজনদের অবিশ্বাস এবং স্ত্রী-সন্তানদের বিভিন্ন কথা তার অসহ্য লাগে।


উল্লেখ্য, গত ১৪ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর দক্ষিণখান থানার প্রেমবাগান এলাকার মো. মনোয়ার হোসেনের বাড়ির ৪র্থ তলার দক্ষিণ পাশের ফ্ল্যাট থেকে পচা গন্ধ আসলে দক্ষিণখান থানা পুলিশে খবর দেয়া হয়। পুলিশ দরজা খুলে ভেতরে অর্ধগলিত অবস্থায় একই পরিবারের স্ত্রী, শিশুপুত্র ও শিশুকন্যার লাশ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় দক্ষিণখান থানা পুলিশসহ উত্তরা অপরাধ বিভাগের বিভিন্ন ঊধ্বর্তন পুলিশ কর্মকর্তা, পিবিআই, এসবি, র‌্যাব, সিআইডির ক্রাইমসিন বিভাগ ও ডিবি উত্তরের বিমানবন্দর জোনাল টিম চাঞ্চল্যকর তিন খুনের মামলাটির ছায়াতদন্ত শুরু করে।


ঘটনাস্থল থেকে হত্যা সম্পর্কে একটি নোট পায় পুলিশ, যা নিয়ে শুরু হয় তদন্ত। বিমানবন্দর জোনাল টিম উদ্ধার করা নোটের লেখা পর্যালোচনা করে প্রাথমিকভাবে ধারণা করে, পলাতক রকিব উদ্দিন তাদের হত্যা করেছেন। তখন থেকেই তাকে ধরার জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে।


অবশেষে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে তাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় ডিএমপির গোয়েন্দা পুলিশের বিমানবন্দর জোনাল টিম।


গ্রেফতার রকিব উদ্দিন ট্রিপল মার্ডার সম্পর্কে ডিবি পুলিশকে জানায়, তিনি নিজেই তার স্ত্রী, শিশুপুত্র এবং শিশুকন্যাকে হত্যার পর পাগলের বেশ ধরে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জায়গায় আত্মগোপন করে ছিলেন।


ডিএমপির গোয়েন্দা (উত্তর) বিভাগের বিমানবন্দর জোনাল টিমের ইনচার্জ অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মো. কায়সার রিজভী কোরায়েশী জানান, অনলাইনে জুয়া খেলে সর্বস্ব খুইয়েছেন রকিব। ঋণের টাকা পরিশোধে ব্যর্থ রকিব স্ত্রীসহ দুই সন্তানকে নিজে হত্যা করেন। বাসায় তালা দিয়ে বের হয়ে রেললাইনে যান। ট্রেনের নিচে পড়ে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেও পারেননি। পরে বিভিন্ন জায়গায় পাগলের বেশ ধরে ঘুরতে থাকেন। তাকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে ঘটনার ব্যাপারে বিস্তারিত জানা যাবে।


বিবার্তা/খলিল/জাহিদ

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com