যেভাবে অনুষ্ঠিত হলো ঢাকার দুই সিটির নির্বাচন
প্রকাশ : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৬:৪৭
যেভাবে অনুষ্ঠিত হলো ঢাকার দুই সিটির নির্বাচন
খলিলুর রহমান
প্রিন্ট অ-অ+

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার (১ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে শুরু হয় ভোটগ্রহণ। বিকেল ৪টা পর্যন্ত একটানা ভোটগ্রহণ শেষে শুরু হয় গণনা।বিবার্তার পাঠকদের জন্য এক নজরে দুই সিটির নির্বাচনী চিত্র তুলে ধরা হলো:


যেভাবে শুরু ভোটগ্রহণ:


সকাল ৭টা থেকেই ভোট কেন্দ্রে ভোটাররা উপস্থিত হওয়া শুরু করেন। বেলা বাড়ার সাথে সাথে বেড়ে যায় ভোটারদের উপস্থিতি। তবে বিকেল পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া শান্তিপূর্ণভাবেই ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে।


প্রধানমন্ত্রীর ভোট প্রদান:


রাজধানীর সিটি কলেজ কেন্দ্রে সকাল আটটার দিকে ভোট দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ভোটার। তাই সাধারণ ভোটারদের মতো তিনিও সকালে ভোট দিতে আসেন।


মেয়র প্রার্থীদের ভোট:


সকাল সাড়ে আটটায় ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। রাজধানীর ধানমন্ডির ৭/এ তে ড. মালিকা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে কেন্দ্রে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন তিনি।


তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী ইশরাক হোসেন সকাল ৯টায় রাজধানীর গোপীবাগ এলাকায় আর কে মিশন রোডের শহীদ শাহজাহান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোট দেন।


অপরদিকে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মেয়র প্রার্থীরা পরিবারের সদস্য নিয়ে ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত হতে দেখা গেছে। প্রার্থীদের মধ্যে আওয়ামী লীগের মেয়রপ্রার্থী আতিকুল ইসলাম সকাল সোয়া ৮টার দিকে রাজধানীর উত্তরায় ১ নম্বর ওয়ার্ডে নওয়াব হাবীবুল্লাহ মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট দেন। এ সময় তার সঙ্গে সহধর্মিণী শায়লা সাগুফতা ইসলাম, মেয়ে বুশরা ইসলাম ও দলীয় নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।


তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়ালও বাবা-মা, স্ত্রী ও দুই ভাই সাথে নিয়ে ভোট কেন্দ্রে যান। তিনি সকাল ৮টা ৫ মিনিটের সময় গুলশান-২ নম্বরে মানারাত ইন্টারন্যাশনাল স্কুল কেন্দ্রের ৬ নম্বর বুথে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। পরে তার বাবা বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু, মা নাসরিন আউয়াল, স্ত্রী সওসানইস্কান্দার, ভাই তাফসির আউয়াল ও তাজওয়ার আউয়ালও তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন।


ভোট দিলেন সিইসি নুরুল হুদা:


প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নুরুল হুদাও ভোট দিয়েছেন। সকাল ১১টা ৫মিনিটে রাজধানীর উত্তরা ৫ নম্বর সেক্টরের আই ই এস স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রের কলেজ ভবনের ৮ নম্বর কক্ষে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট প্রয়োগ করেন তিনি। এটি উত্তর সিটির এক নম্বর ওয়ার্ডের কেন্দ্র। কেএম নুরুল হুদা এ ওয়ার্ডেরই বাসিন্দা। ভোটপ্রয়োগ শেষে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে কথা বলেন তিনি।


সর্বোচ্চ নিরাপত্তা:


দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচন উপলক্ষে শুক্রবার (৩১ জানুয়ারি) থেকে রাজধানীর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। তবে শনিবার (১ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকে পোশাকধারীর সাথে সাদা পোশাকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মাঠে কাজ করেছেন। এছাড়াও পুলিশ ও র‌্যাবের প্রধান ভোট কেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করেছেন। দুপুর দেড়টায় রাজধানীর বনানী বিদ্যানিকেতন স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্র পরিদর্শন শেষে র‌্যাব মহাপরিচালক (ডিজি) বেনজীর আহমেদ বলেন, যদি কোনো প্রার্থীর এজেন্টকে ভোটকেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়ে থাকে আমাদের জানান। ঢালাওভাবে অভিযোগ না করে সুনির্দিষ্ট করে বলেন কোন কেন্দ্রে কোন বুথে ঢুকতে দেয়া হয়নি। প্রয়োজনে আমাদের লোকজন গিয়ে তাদের সেখানে ঢুকিয়ে বসিয়ে দেবেন।


এর আগে দুপুর সোয়া ১২টার দিকে রাজধানীর বনানী বিদ্যানিকেতন স্কুল এন্ড কলেজ কেন্দ্র পরিদর্শনে যান পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. জাবেদ পাটোয়ারী, ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম, ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ও সিটিটিসি প্রধান মনিরুল ইসলাম।


ভোটগ্রহণ শেষে গণনা শুরু:


ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষ হয় বিকেল ৪টায়। পরে গণনা শুরু হয়। বিকেল সাড়ে চারটা থেকেই বিভিন্ন কেন্দ্রের ফলাফল ঘোষণা শুরু হয়।


বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা:


টানা আট ঘন্টার ভোটগ্রহণে দুই সিটির বিভিন্ন কেন্দ্র ও আশেপাশের এলাকায় প্রার্থী সমর্থকদের মাঝে কিছু বিচ্ছন্ন ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া ভোটগ্রহণ শেষে বিএনপির নেতাকর্মীরা নয়াপল্টনে তাদের দলীয় কার্যালয়ে জড়ো হতে শুরু করে। এক পর্যায়ে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদার কুশপুত্তলিকা দাহ করে বিএনপির নেতাকর্মীরা। পরে সেই এলাকায় তারা বিক্ষোভ মিছিল বের করে। বিক্ষোভের খবর পেয়ে বিএনপি, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসবক দল ও শ্রমিক দলের নেতাকর্মীরা কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জড়ো হতে শুরু করেন।


এক পর্যায়ে সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে কাকরাইল থেকে আওয়ামী লীগ সমর্থকরা আরেকটি মিছিল বের করে। মিছিলটি বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলো। এ সময় আওয়ামী লীগের মিছিল দেখে বিএনপিকর্মীরা ‘ভোট চোর’, ‘ভুয়া ভুয়া’ বলে চিৎকার শুরু করে। এ সময় তাদের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।


যান চলাচল শুরু:


শুক্রবার মধ্য রাত থেকে ঢাকা শহর ফাঁকা থাকলে নির্বাচনের ভোট গ্রহণ শেষ হতে না হতেই চলতে শুরু করেছে যানবাহন। তবে নির্বাচন উপলক্ষে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের জারিকৃত প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (৩০ জানুয়ারি) রাত ১২টা থেকে রবিবার (২ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৬টা পর্যন্ত মোটরসাইকেল চলাচলে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।


এছাড়া শুক্রবার (৩১ জানুয়ারি) মধ্যরাত ১২টা থেকে ১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বাস, বেবি ট্যাক্সি/অটো রিকশা, ট্যাক্সি ক্যাব, মাইক্রোবাস, জিপ, পিকআপ, কার, ট্রাক, টেম্পু, অন্যান্য যন্ত্রচালিত যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা ছিলো।


দুই সিটিতেই আওয়ামী লীগের বিশাল জয়


ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী মো. আতিকুল ইসলাম এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বিপুল ভোটের ব্যবধানে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন।


ইভিএমে ভোটগ্রহণ শেষে মধ্যরাতে দক্ষিণের রিটার্নিং কর্মকর্তা আবদুল বাতেন এবং উত্তরের রিটার্নিং কর্মকর্তা আবুল কাশেম নৌকা প্রতীকের এ দুই প্রার্থীকে বেসরকারিভাবে বিজয়ী ঘোষণা করেন।


ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে আতিকুল পেয়েছেন ৪ লাখ ১৫ হাজার ৮০২ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী তাবিথ আউয়াল পেয়েছেন ২ লাখ ৪২ হাজার ৮৪১ ভোট। আতিক ১ লাখ ৭২ হাজার ৯৬১ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন।


এদিকে ঢাকা দক্ষিণে নৌকা প্রতীকে তাপস পেয়েছেন ৪ লাখ ২৪ হাজার ৫৯৫ ভোট। প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন পেয়েছেন ২ লাখ ৩৬ হাজার ৫১২ ভোট। তাপস ১ লাখ ৮৮ হাজার ৮৩ ভোট বেশি পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন।


রিটার্নিং কর্মকর্তা ঘোষিত ফলাফলে ঢাকা উত্তর সিটিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ছাড়া অন্য মেয়র প্রার্থীদের মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টির ডা. আহাম্মদ সাজেদুল হক রুবেল (কাস্তে) পেয়েছেন ১৩ হাজার ৮১৭ ভোট, এনপিপির মো. আনিসুর রহমান দেওয়ান (আম) ৩ হাজার ৫২৯, প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দল পিডিপির শাহীন খান (বাঘ) ১ হাজার ৯১৯ এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শেখ মো. ফজলে বারী মাসউদ (হাতপাখা) ২৬ হাজার ২৫৮ ভোট।


আর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হাজী সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন (লাঙ্গল) ৫ হাজার ৫৯৩ ভোট, গণফ্রন্টের আবদুস সামাদ সুজন ১২ হাজার ৬২৭, বাংলাদেশ কংগ্রেসের মো. আকতার উজ্জামান ওরফে আয়াতুল্লাহ (ডাব) ২ হাজার ৪২১, ইসলামী আন্দোলনের মো. আবদুর রহমান (হাতপাখা) ২৬ হাজার ৫২৫ এবং ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) বাহারানে সুলতান বাহার (আম) পেয়েছেন ৩ হাজার ১৫৫ ভোট।


অন্যদিকে দুই সিটিতে কয়েকটি ছাড়া প্রায় সব ওয়ার্ডেই ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা জয়লাভ করেছেন। তবে বেশ কয়েকটি ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহীরাও জয়ের মুখ দেখেছেন। এছাড়া কয়েকটি ওয়ার্ডে জয়ী হয়েছেন বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলররা।


ঢাকার দুই সিটিতে মেয়র ও কাউন্সিলর পদে সব মিলিয়ে ৭৫০ জন প্রার্থী চূড়ান্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন। এর মধ্যে মেয়র পদে ঢাকা উত্তরে ৬ জন ও দক্ষিণ সিটিতে ৭ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। শনিবার রাতে ঢাকা উত্তরে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় অডিটোরিয়াম এবং দক্ষিণে শিল্পকলা একাডেমি থেকে দুই সিটির এ ফলাফল ঘোষণা করেন দায়িত্বপ্রাপ্ত রিটার্নিং কর্মকর্তারা।


বিএনপির হরতাল:


ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে রবিবার (২ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীতে হরতাল ডেকেছে বিএনপি। শনিবার রাতে নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।


বিবার্তা/খলিল/উজ্জ্বল/জাহিদ

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com