সূর্য অভিযানে রওনা হলো ‘পার্কার সোলার প্রোব’
প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০১৮, ০৯:৪১
সূর্য অভিযানে রওনা হলো ‘পার্কার সোলার প্রোব’
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

সূর্যের রহস্য ভেদ করতে এক মিশন নিয়ে পার্কার সোলার প্রোব নামে একটি উপগ্রহ সফলভাবে উৎক্ষেপণ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সংস্থা নাসা।


নির্ধারিত সময়ের একদিন পর ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল নাসার নভোযানটি উৎক্ষেপণ করা হলো। এটি সূর্যের ৬০ লাখ কিলোমিটারের মধ্যে পৌঁছবে এবং সূর্যের এত কাছাকাছি এর আগে কোনো যানই যেতে পারেনি।


সূর্যের যে উজ্জ্বল আলোকছটার ‘করোনা’ নামের যে অংশটি সূর্যগ্রহণের সময় দেখা যায় তার ভেতর দিয়ে উড়ে যাবে যানটি। বলা হচ্ছে, ১০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি তাপ সহ্য করার ক্ষমতা রয়েছে প্রোবের।


চারটি ডেল্টা-ফোর রকেট দিয়ে উপগ্রহটি মহাকাশে পাঠানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের কেপ ক্যানাভেরাল থেকে প্রোবকে উৎক্ষেপণের কথা ছিল শনিবার সকালে। তবে শেষ মূহুর্তে বাড়তি কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য তা ১৪ ঘণ্টা পিছিয়ে দেয়া হয়।


পৃথিবীর বিভিন্ন কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করতে করতে পার্কার সোলার প্রোব শুক্র গ্রহে (ভেনাস) পৌঁছবে আজ থেকে দেড় মাস পর, অক্টোবরে। তারপর আরো অনেক অনেক পথ পেরোতে হবে ওই মহাকাশযানকে সূর্যের মুলুকে পৌঁছতে। আর সেই পথ পেরোতে সময় লাগবে কম করে ২ থেকে ৪ বছর।


যার মানে, ২০২০ সালের আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে প্রথম সৌর মুলুকে ‘পা’ ছোঁয়াবে পার্কার মহাকাশযান। তারপর তা আরো এগিয়ে সূর্যের বায়ুমণ্ডলের একেবারে বাইরের স্তর বা করোনায় ঢুকে পড়বে ২০২২ সালের মাঝামাঝি।



সাত বছর ধরে সূর্যের চারদিকে ২৪ বার প্রদক্ষিণ করবে এই স্যাটেলাইট। সে সময় এটির গতি হবে ঘণ্টায় কমপক্ষে ছয় লাখ ৭০ হাজার কিলোমিটার। ৬০ লাখ কিলোমিটার দূর থেকে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে তথ্য সংগ্রহ করতে থাকবে। নাসার মহাকাশযানটি যখন সবচেয়ে কাছে চলে যাবে সূর্যের, তখন সূর্যের পিঠ (সারফেস) থেকে তার দূরত্ব হবে মাত্র ৩৮ লাখ ৩০ হাজার মাইল।


এই প্রকল্পের অন্যতম বিজ্ঞানী ড. নিকি ফক্স বলেছেন, আমি বুঝতে পারছি ৬০ লাখ কিমি দূরত্বকে কখনই নিকট দূরত্ব বলে মনে হবে না। কিন্তু যদি ধরে নেয়া হয় ভূপৃষ্ঠ এবং সূর্যের দূরত্ব এক মিটার, তাহলে সূর্য থেকে মাত্র ৪ সেমি দূরে থাকবে প্রোব।


প্রোব যে গতিতে চলবে তা নজিরবিহীন। ড. ফক্স বলেন, এত দ্রুতগতির কোনো কিছু আগে তৈরি হয়নি। সূর্যের চারদিকে এটি প্রতি ঘণ্টায় ৬,৯০,০০০ কিমি পর্যন্ত গতিতে ঘুরবে। অর্থাৎ এই গতিতে নিউইয়র্ক থেকে টোকিও যেতে লাগবে এক মিনিটেরও কম সময়।


বলা হচ্ছে, মনুষ্যবিহীন এই নভোযান স্যাটেলাইটের মতো কাজ করবে। এটি সূর্যের যতটা কাছে যাবে এর আগে মানুষের তৈরি কোনো যান এত কাছে যায়নি। এটি সূর্যের বায়ুমণ্ডলের একেবারে বাইরের স্তর করোনায় প্রবেশ করে সূর্যের চারদিকে প্রদক্ষিণ করতে করতে বোঝার চেষ্টা করবে এই নক্ষত্রের আচরণ।


বিশিষ্ট সৌরপদার্থবিজ্ঞানী ইউজিন নিউম্যান পার্কারের নামেই এই মহাকাশযানের নামকরণ করেছে নাসা। পার্কারই প্রথম কোনো বিজ্ঞানী, জীবিত বস্থায় যার নামে কোনো মহাকাশযানের নামকরণ করল নাসা।


সূর্য কীভাবে কাজ করে, তা বুঝতে সাহায্য করবে পার্কার নামের এই স্যাটেলাইট।


সূর্য তার বৈদ্যুতিক বিভিন্ন কণা এবং চৌম্বক শক্তি দিয়ে পৃথিবীকে সবসময় প্রভাবিত করছে। এই ‘সোলার উইন্ড’ বা সূর্য থেকে নিঃসরিত বাতাসের প্রভাবে উত্তর মেরুর আকাশে তৈরি হয় অদ্ভুত সুন্দর রংচঙে আলোর খেলা।


কিন্তু সূর্যের কিছু প্রবাহ পৃথিবীর চৌম্বক শক্তির ভারসাম্য বিঘ্নিত করে ফেলতে পারে। সেক্ষেত্রে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হতে পারে, মহাকাশে স্যাটেলাইটগুলো কক্ষচ্যুত হতে পারে, এমনকি বৈদ্যুতিক গ্রিড বিকল হয়ে যেতে পারে। বিজ্ঞানীরা সেই সব বিপদ আগে থেকে বোঝার চেষ্টা করছেন। পার্কার আগাম তথ্য দিয়ে এ কাজে দারুণভাবে সাহায্য করতে পারে।


‘করোনা’ বা সূর্যের চারদিকের উজ্জ্বল আভাযুক্ত যে এলাকা সেটির অদ্ভুত আচরণ বিজ্ঞানীদের কাছে বড় রহস্য।
সূর্যপৃষ্ঠের চেয়ে করোনার তাপমাত্রা বেশি। সূর্যপৃষ্ঠের তাপমাত্রা যেখানে ৬,০০০ ডিগ্রি সেলসিয়সের মতো, করোনা অঞ্চলের তাপমাত্রা কয়েক মিলিয়ন ডিগ্রি হতে পারে। কেন এই ফারাক, তার সুনির্দিষ্ট উত্তর এখনো বিজ্ঞানীদের কাছে নেই।


এছাড়া সূর্য থেকে নিঃসরিত বাতাস যখন করোনায় প্রবেশ করে, তখন তার গতি হঠাৎ তীব্রভাবে বেড়ে যায়। এই গরম বাতাস তখন প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ কিমি বেগে সোলার সিস্টেমের ভেতর দিয়ে ধেয়ে চলে।


পার্কার করেনার বৈদ্যুতিক এবং চৌম্বক ক্ষেত্রের বিভিন্ন তথ্য পাঠাতে সক্ষম হবে বলে আশা করছেন বিজ্ঞানীরা।


৬০ বছর আগে প্রথম সূর্যের কাছাকাছি নভোযান পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু সূর্যের কাছে পাঠানোর জন্য যে ধরণের নভোযান তৈরির প্রয়োজন সেই প্রযুক্তি এতদিন পরে বিজ্ঞানীরা পেয়েছেন।


সোলারচালিত এই নভোযানের যন্ত্রপাতি থাকবে ৪.৫ ইঞ্চি পুরু কম্পোজিট কার্বনের আবরণে দিয়ে মোড়া। ফলে ভেতরের তাপমাত্রা সবসময় ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ভেতরে থাকবে। রক্ষা পাবে ভেতরের যন্ত্রপাতি এবং কম্পিউটার। সূত্র: বিবিসি


বিবার্তা/জাকিয়া

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com