নারী : “শ্রদ্ধা কিংবা স্নেহ” কোনো ‘সম্বোধন’ই সম্পর্কে নিরাপদ নয়
প্রকাশ : ৩১ মার্চ ২০১৮, ১৯:০৭
নারী : “শ্রদ্ধা কিংবা স্নেহ” কোনো ‘সম্বোধন’ই সম্পর্কে নিরাপদ নয়
হায়দার মোহাম্মাদ জিতু
প্রিন্ট অ-অ+

নদী ও নারী, সৃষ্টির এক প্রাচীন-প্রাকৃতিক জ্বালামুখ। যা সহস্র যাতনা-নিপীড়ন এবং আগ্রাসনেও অকল্পনীয় ছন্দে ছুটে চলেছে। কিন্তু এর ট্র্যাজেডি হলো সৃষ্টির নিউক্লিয়াস হওয়া সত্ত্বেও এরা দু’জনেই উপেক্ষিত এবং ক্ষেত্র বিশেষে বারংবার ধর্ষিত। এ প্রসঙ্গে স্বদেশ নিয়েই বলি।


এখানকার নদী তো বটেই ইদানিং নারীরাও আক্রান্তের তালিকায়। যদিও বিশ্ব ইতিহাসের প্রথম এবং একমাত্র দেশ হিসেবে এর ‘পার্লামেন্টের’ “স্পীকার, প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধীদলীয় নেত্রী প্রত্যেকেই নারী”। কিন্তু এরপরও এখানে নারী ধর্ষণ, খুন, হয়রানি ইত্যাদি এখন নিত্য খবরের শিরোনাম।


এ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক কলম অধিকারিণী ‘মহাশ্বেতা দেবীর’ আশ্রয় দ্বারস্থ হই। তাঁর ‘তিন কন্যা ও অধবা’ রচনায় স্পষ্ট নারী, “শ্রদ্ধা কিংবা স্নেহ” কোন ‘সম্বোধন’ সম্পর্কেই নিরাপদ নয়। অর্থাৎ, পুরুষ তার ভোগবাদী চিন্তার তরবারিতে সদা উদগ্রীব নারীর অস্তিত্ব লুটে।


মহাশ্বেতা দেবীর নন্দরানি, চন্ননী, বাসনাবালা এবং সরস্বতী, এই চার চরিত্রের নিরীক্ষণ আপনাকে পাশ্চাত্যের না বোঝালেও প্রাচ্যের নারী ‘মন মানচিত্র’ বুঝিয়ে দিবে। পাশাপাশি ফিসফিসিয়ে এও বলবে, নারীর এই অবস্থানের পেছনে স্বয়ং নারীই বহুলাংশে দায়ী। এক্ষেত্রে মহাশ্বেতা দেবীর চার চরিত্রের আদলে পৃথিবী দেখলে যা দাঁড়ায় সেটা হলো :


নন্দরানি : নিজের নির্যাতনের কথা সাংবাদিককে বলতে গিয়েও নন্দরানি বলেন, “এই যে বলছি, সে জন্যে শাস্তি হবে না তো আমার? অর্থাৎ, রাষ্ট্রযন্ত্রের হাতল যে পুরুষ আদলে নির্মিত এবং দীর্ঘদিনের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ যে নির্যাতনের পরও নারীর কণ্ঠকে দাবায়ে রাখে এটা তারই ইঙ্গিত।


তবে নির্লজ্জের মত পূর্বপুরুষ সাক্ষী রেখে বলছি, এ ধরণের ‘ক্রিমিনাল কেস’ বাংলায় ধামাচাপা পড়ে বেশি। কারণ, এখানে ক্ষতের শরীরের আরেকটু খুঁচে দেখার প্রবণতা বেশি।


তবে বেশভূষণকেও দায়ী করলে বোধ করি দোষের হবে না। কারণ ক্ষমতাধর পুরুষও চায় নারী শুধু শাড়িকেন্দ্রিক থাকুক। কারণ, ধূর্ত পুরুষও জানে শাড়ি পরে শুধু শোয়া যায়, দৌঁড়ানো যায় না।


চন্ননী : দখলদারিত্বের ইতিহাস বহু পুরনো ইতিহাস। যদিও এ ইতিহাসও নারীর বিপক্ষে। গোলক সামন্ত এবং নকুল বাবুর দখল খেলায় রাষ্ট্রীয় মদত-ছায়ায় নকুল বাবুর জিত মেলে। কিন্তু ইতিহাসও জানে, বিজিতরা গুদাম শুধু সম্পদে নয় চায় আরো কিছু। ফলস্বরূপ ‘পিসি সম্বোধনের পুরুষযন্ত্রই’ খাবলে ধরে চন্ননীকে।


আর বিচার প্রসঙ্গে বললে, রাষ্ট্রযন্ত্রের ছড়ি ভোগকারীর পক্ষে থাকায় ‘চন্ননীর’ “নির্যাতনের গল্প গলে যাওয়া মোমের মতই পরে রইল তাঁর নিজের শরীর-মনে”।


দখল চেষ্টায় পাশাপাশি নারী ভোগ! এই চিন্তা জগতে নতুন কিছু নয়। বাংলাদেশের ১৯৭১’এর মুক্তিযুদ্ধেও পৃথিবী দেখেছে বাঙ্গালী নারীর প্রতি অকল্পনীয় পাশবিকতা। এছাড়া ‘আমেরিকায় হওয়া কালোদের’ বিপ্লবেও বিশ্ব দেখেছে, কালোরা তাদের বিপ্লবের অংশ হিসেবে শ্বেতাঙ্গ নারীদের ধর্ষণ করেছে।


অর্থাৎ, ভালো কি খারাপ প্রত্যেক বিপ্লবেই নারী ছিল আক্রান্তের দলে! এবং গোষ্ঠী বা দলের অর্জন-বিসর্জনেও ন্যায্য থেকে নির্বিকার।


বাসনবালা : নিঃস্পৃহ আত্মসমর্পণের মুখে প্রতিবাদ-প্রতিশোধের ঝংকার বাসনবালার মুখ থেকে জানা যায়, সামাজিক রীতি বিয়ের মাধ্যমে নারীর অস্তিত্ব হারিয়ে যায়! কারণ, তিনি তখন বনে যান অমুকের বউ, অমুকের মা। অর্থাৎ, নারী যেন শুধুই এক চাষযোগ্য জমিন! যেখানে চাষ করা মজুরের হিস্যা আছে, ফল এবং ফলনও আছে। কিন্তু নারীর কিছুই নেই!


পঁয়ষট্টি বছরের বাসনবালা আরো বলেন, মেয়েদের লাঞ্ছনা শুধু মেয়েরা করে না। কারণ, তাঁর সোয়ামি যখন তাকে লাথি মারত তখন তাঁর ‘শাশুড়ি-জা-ননদ হাসত’। অর্থাৎ, নারীর মৌন সমর্থন কিংবা প্রতিবাদহীনতাই নারী লাঞ্ছনার আরেকটি উল্লেখযোগ্য কারণ!


যা সমাজে হরহামেশাই ঘটে। একজন নারী আক্রান্ত হলে আরেকজন নিরাপদ দূরত্বে চোখ বুজে থাকেন। তার সামনেই আরেক ‘ঈশ্বরী’ আক্রান্ত কিন্তু তিনি চুপ! উল্লেখ্য কিছুদিন পূর্বেও একজন ১৪ বছর বয়সী মানবী আক্রান্ত হয়ে বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু নারী মানবাধিকারী দোকানদারেরা সব চুপ! কে জানে তাদের অর্থায়নের চাবিকাঠিটাই পুরুষদের কাছে কিনা, কে জানে?


অধবা : পুঁজিপতি এবং সমাজপতিদের দ্বন্দ্ব-সংঘাতের ফল ‘অধবা’। যেখানে সরস্বতী তার মৃত স্বামীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া এক বছরেও করতে পারেননি। যার কারণে তার কপালে তকমা জুটেছে ‘অধবার’। সরস্বতী তার স্বামীর লাশ নিতে মর্গে মর্গে ধর্না দেয়। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্র এবং রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস যেখানে সঙ্গমে সেখানে স্বামীর লাশ ফেরত, সেতো আশাই বৃথা।


উপরন্তু সরস্বতীর স্বামীর লাশে আরেক নারীর হিস্যা নাটকে পুরো প্রক্রিয়াকে বানচাল করে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে মৃতের শ্মশানে জীবিতের ক্ষমতা চর্চা! অর্থাৎ, পুলিশি কায়দায় রাষ্ট্র নিশ্চিত করছে তার দলীয় প্রতিনিধির কুকীর্তি। ‘ন্যাংটো’ করে বললে, এক্ষেত্রে পৃথিবীর তাবৎ ক্ষমতাধরদের চরিত্র একই’।


জীবন দগ্ধতা মহাশ্বেতা দেবীকে বারবার কলম ধরিয়েছে নিরাশ্রয়ী মানুষের পক্ষে। তিনি বলেছেন, লিখেছেন এবং প্রত্যাশা করেছেন সাম্যের। যদিও এই সাম্যের শৃঙ্খলে প্রয়োজন কিছু সংঘাতের। যা চরম আঘাত হানবে রাষ্ট্রযন্ত্রে।


নারী, রাষ্ট্রযন্ত্র এবং সমাজযন্ত্রের দ্বৈত সন্ত্রাসে বধঃ ছদ্মবেশী চতুর নারীকে রেখেছে নানান সৎকার-সংস্করণে। যেখানে নারীকে বাক্সবন্দী করে বলা হয়, পৃথিবী দেখতে এমন! এই তরিকার প্রলোভন প্যাকেজ ছেড়ে নারীকে আসতে হবে স্পর্ধার গনগনে স্রোতে।


সামাজিক-রাষ্ট্রিক সুযোগ-সুবিধার (কোটা) গুদামে আগুন দিয়ে লড়তে হবে সমানে সমানে। কারণ, সামান্য সুবিধা মানেই পিছিয়ে পড়া জাত! অর্থাৎ, সমাজ এবং রাষ্ট্র তাঁর (নারী) মনস্তত্ত্বগত জগত শুরুই করছে এবং করাচ্ছে পিছিয়ে পরা একজন মানুষ হিসেবে!


এছাড়া জানি, “চাওয়ার হাত নিচের, আর অর্জনের হাতটা উপরের”। কাজেই ট্রেন-বাসসহ আশপাশের সামান্য বরাদ্দকৃত সংরক্ষণ ছেড়ে তাঁকে দাঁড়াতে হবে ঘামের পাটাতনে। যেখানে শরীর নয় সত্ত্বাই তাঁর পরম আত্মা।


পাশাপাশি রাষ্ট্র চায়, “নারী এগিয়ে আসুক”। এ ধরণের ‘উৎপীড়ন-নিপীড়নকে’ চ্যালেঞ্জ জানিয়ে প্রশ্ন রাখতে হবে এই রাষ্ট্র আসলে কে? আর এর চরিত্রই বা কি? এটা কি পুরুষতান্ত্রিক? নাকি এটা কিছু একটা কৌশল-ফাঁদ, যা নারীকে দাবায়া রাখতে চায়?


অর্থাৎ, প্রশ্ন আর স্পর্ধার তুবড়িতে নারী তার সমস্ত বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে-ডিঙ্গিয়ে নিজেই নিজেকে করবে নির্মাণ-বিনির্মাণ। যেখানে মাতৃত্বের ‘ঈশ্বরী’ চরিত্রের পাশাপাশি দাপটের সহিত রইবে পথচলার কৌশল।


শেষ তক্ক, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রযন্ত্র সব সময়ই সংখ্যাগরিষ্ঠ জনতার ক্ষমতা চর্চা স্থান। আর এই বঙ্গ তল্লাটের নারী-পুরুষের অনুপাত ১০৫ : ১০০। অর্থাৎ, এখানকার নারীরা চাইলেই পুরুষের ভাবা জন্মগত ক্ষমতা চিন্তাকে ফুঁৎকার দিতে পারেন। এবং নিজেদের অধিষ্ঠিত করতে পারেন চরম কাঙ্ক্ষিত স্থানে। যেখানে সে মুক্ত, স্বাধীন এবং স্বনির্ভর। তবে সেটা ফুলেল তরীকায় নয়। আঘাতের পর আঘাত সাজিয়ে, চরম আঘাত। এবং এও বলি, আঘাত।


লেখক : সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা


বিবার্তা/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com