জাতীয় অধ্যাপক ডা. নুরুল ইসলাম স্মরণে
প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি ২০১৮, ১৭:১৫
জাতীয় অধ্যাপক ডা. নুরুল ইসলাম স্মরণে
ডা. এম এ কাশেম
প্রিন্ট অ-অ+

বাংলাদেশে পোস্টগ্র্যাজুয়েট চিকিৎসাব্যবস্থার স্থপতি জাতীয় অধ্যাপক ডা. নুরুল ইসলামের আজ (২৪ জানুয়ারি) পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী। চিকিৎসাগবেষণা, শিক্ষকতা, নিয়মানুবর্তিতা ও প্রশাসনিক বিচক্ষণতায় তাঁর সমান্তরাল কোনো ব্যক্তি আমাদের সমাজে এখনও বিরল। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. নুরুল ইসলামের কিছু অবদানের কথা এখানে উল্লেখ করছি।


১৯৮২ সালে জাতীয় ওষুধনীতি প্রণয়নের মাধ্যমে ক্ষতিকর ও অপ্রয়োজনীয় ওষুধের ব্যবহার বন্ধে কাজ করেছিলেন ডা. নুরুল ইসলাম। এর ফলে বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যালস কম্পানিগুলো সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ পায়। বহুজাতিক কম্পানিগুলোর লো টেকনোলজির ওষুধ দেশীয় ওষুধ কম্পানিগুলো উৎপাদন শুরু করে। পক্ষান্তরে বহুজাতিক কম্পানির সঙ্গে দেশীয় কম্পানিগুলোও হাই প্রোফাইল ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত শুরু করে।


আইপিজিএমআর প্রতিষ্ঠা


বাংলাদেশে উচ্চতর বিশেষজ্ঞ ডাক্তার তৈরিতে আইপিজিএমআরই ছিল একমাত্র প্রতিষ্ঠান। ডা. নুরুল ইসলাম সুদীর্ঘকাল এই প্রতিষ্ঠানের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর সঙ্গে যুগ্ম পরিচালক হিসেবে ছিলেন আরেক প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক ডা. এম আর খান।


ডা. নুরুল ইসলামের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ডা. এম আর খান লিখেছেন, একবার শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা পেছানোর জন্য জোর আন্দোলন শুরু করল। ডা. নুরুল ইসলাম ছাত্রছাত্রীদের ডাকলেন এবং স্পষ্ট ভাষায় জানালেন ‘You can shift the director but not the date of Examination’ তাঁর দৃঢ়তায় পরীক্ষার্থীরা যথাসময়ে পরীক্ষায় অংশ নেয়।


আধূনিক


তামাক ও ধূমপানবিরোধী আন্দোলন ‘আমরা ধূমপান নিবারণ করি বা আধূনিক’-এর সূচনাকারী ছিলেন ডা. নুরুল ইসলাম। আধূনিকের লোগো সে সময়ে তামাকবিরোধী সচেতনতায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এর ধারাবাহিকতায় আজ তামাকবিরোধী অনেক প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি হয়েছে, যা তামাকমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় অবদান রেখে চলেছে।


ইউএসটিসি প্রতিষ্ঠা


ডা. নুরুল ইসলাম ছিলেন সর্ববৃহৎ বেসরকারি ইউনিভার্সিটি ইউএসটিসি’র প্রতিষ্ঠাতা ভিসি। ১৯৯২ সালে তিনি বিজ্ঞান ও সর্বাধুনিক প্রযুক্তিসমৃদ্ধ অবকাঠামো, অভিজ্ঞ শিক্ষকমণ্ডলী, নৈসর্গিক পরিবেশ ও বিশ্বের প্রায় ১৪টি দেশের ছাত্রছাত্রীদের কোলাহলে মুখরিত এ বিশ্ববিদ্যালয় (ইউএসটিসি) প্রতিষ্ঠা করেন। এ বিশ্ববিদ্যালয়েয় ছাত্রছাত্রীরা আজ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত।


তাঁর প্র্যাকটিস জীবনের কিছু খণ্ডচিত্র উপস্থাপন করছি - ধন্বন্তরী চিকিৎসক বলতে যা বোঝায় তিনি তা-ই ছিলেন। তাঁর অনেক প্রেসক্রিপশনে লেখা থাকত, ‘কোনো ওষুধের প্রয়োজন নেই’। এর সঙ্গে দু-একটি উপদেশ ও জীবনাচারের পরামর্শ থাকত। রোগীদের তিনি প্রায়ই বলতেন, Medicine is a useful Poison. তাঁর এক নিকটাত্মীয়ের বড় ছেলের পায়ের সমস্যা দেখা দিলে পায়ের একাংশ কেটে ফেলার পরামর্শ দেন কলকাতার ডাক্তার। রোগীকে দেখে ডা. নুরুল ইসলাম বললেন, পায়ের কিছুই করতে হবে না। তিনি ওষুধ দিলেন। সেই ওষুধ খেয়ে পঙ্গুত্ব থেকে রক্ষা পেয়েছিল ছেলেটি।


সময়ানুবর্তিতা ছিল ডা. নুরুল ইসলামের চরিত্রের অন্যতম উল্লেখযোগ্য একটি দিক। আইপিজিএম-আর (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) পরিচালক থাকাকালীন তিনি সকাল ৭-৩০টায় হাসপাতালে উপস্থিত হতেন এবং বিকাল আড়াইটায় অফিস ত্যাগ করতেন। আবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় হাসপাতালে এসে রাত ৯টার দিকে ফিরে যেতেন। কিডনি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা-সভাপতি এবং সে সময়ে জাতীয় অধ্যাপকের ক্লিনিক্যাল অ্যাসিসটেন্ট অধ্যাপক ডা. হারুন আর রশিদ জানান, স্যার সকালে হাসপাতালে ঢোকার মুখে দাঁড়াতেন এবং হাসপাতালের শিক্ষক, ডাক্তার, ছাত্র, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কোন সময়ে হাসপাতালে উপস্থিত হচ্ছেন তা অবলোকন করতেন।


বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্য


জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ডা. নুরুল ইসলামের নৈকট্য ও সখ্য স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের চিকিৎসাবিজ্ঞানকে বিকশিত ও প্রস্ফুটিত করতে সাহায্য করেছে। বঙ্গবন্ধুর বাবা-মা, মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং সে সময়ের অনেক মন্ত্রী, এমপিসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিদের আইপিজিএমআরে পরম যত্ন ও মমতায় চিকিৎসা দিয়ে গেছেন ডা. নুরুল ইসলাম।


পোস্টগ্র্যাজুয়েট মেডিকেল শিক্ষা


১৯৬০ সালের দিকে ডা. নুরুল ইসলামের ব্যক্তিগত উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্যাকল্টি অব পোস্টগ্র্যাজুয়েট মেডিসিন খোলা হয়। এর অধীনে এমফিল ও এমডি ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ হয়। বর্তমানে সিনিয়র অধ্যাপকদের FCPS, MD ডিগ্রি অর্জন তাঁর কীর্তির নীরব স্বাক্ষর।


চিকিৎসাশাস্ত্রের বিভিন্ন শাখায় বিচরণ


অধ্যাপক নুরুল ইসলাম সমসাময়িক মেডিকেল সায়েন্সের সব ডেভেলপমেন্ট সম্পর্কে অবহিত থাকতেন। তাঁর আগ্রহ ছিল ভারতীয়, চৈনিক ও মধ্যপ্রাচ্যের হেকিমি পদ্ধতির ক্রমবিকাশের ইতিহাস সম্পর্কে জানা। তিনি হোমিওপ্যাথি ও হেকিমিকে স্বীকৃতি ও মর্যাদা দিতে কুণ্ঠা বোধ করতেন না। তাঁর সংগ্রহে ছিল এ হিস্ট্রি আব মেডিসিন ইন চায়না, শিবকালী ভট্টাচার্য লিখিত ১০ খণ্ডের ভারতীর বনৌষধি শাস্ত্রের ইতিহাস।


মাতৃভক্তি


কোনো কাজে যাওয়ার আগে তিনি তাঁর মায়ের কাছ থেকে দোয়া নিয়ে যেতেন। ঘরে ফেরার সময়ও মায়ের জন্য কিছু না কিছু নিয়ে আসতেন। মায়ের প্রতি এই গভীর শ্রদ্ধা আজকের প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয় হয়ে থাকবে।


অর্জন


দেশি-বিদেশি প্রায় ৩২টি পুরস্কারে তিনি ভূষিত হয়েছেন, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- রাষ্ট্রপতি স্বর্ণপদক(১৯৬৩), স্বাধীনতা পুরস্কার(১৯৯৭), বাংলা একাডেমি পুরস্কার (২০০৩)। ১৯৮৭ সালে তিনি জাতীয় অধ্যাপকের পদ অলঙ্কৃত করেন।


শেষ করছি ডা. নুরুল ইসলামের উল্লেখযোগ্য কিছু উক্তি স্মরণ করে-


-শত্রুতা/সমালোচনা সতর্কতা আনে, সতর্কতা সফলতা আনে।


-Reading makes a man


writing makes a perfect man


seminar makes a ready man


-যখন কেউ আপনার কাজের সমালোচনা করে তখন বুঝতে হবে আপনি ঠিক কাজটিই করছেন।


-জীবনের গতিপথে যত বেশি সফলতা লাভ করবেন, সুনাম অর্জন করবেন, শত্রুসংখ্যাও ততই বাড়বে।


-যাদের কথা অর্ধেক বুঝা যায় আর অর্ধেক বুঝা যায় না তাদের চেয়ে যাদের কথা পরিষ্কার বোঝা যায় তারা অধিকতর উত্তম।


লেখক : পরিচালক, সেন্ট্রাল হসপিটাল লিমিটেড, ঢাকা


বিবার্তা/মৌসুমী/হুমায়ুন

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com