দল জননেত্রীর, নেতা হয় ‘ভাইয়ের’ লোক
প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০১৮, ১৭:০৪
দল জননেত্রীর, নেতা হয় ‘ভাইয়ের’ লোক
সরদার মামুন-অর-রশিদ
প্রিন্ট অ-অ+

জননেত্রী শেখ হাসিনা যে সংগঠনের সভাপতি সেখানে নেতা হবে অযোগ্য ও বিতর্কিত লোক - এমনটা ভাবলেও গা শিউরে ওঠে। কিন্তু আমরা শিউরে উঠি বা যা-ই হই, আজ এটাই বাস্তব যে, এমন কিছু লোক এখন নিজেদের কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সহ-সম্পাদক বলে পরিচয় দিয়ে বেড়াচ্ছে, যারা আওয়ামী লীগ তো দূরের কথা, আওয়ামী লীগের সহযোগী কোনো অঙ্গ সংগঠনের ইউনিটের নেতা হওয়ারও যোগ্য নয়। এরা না জানে পদবীর মূল্য দিতে, না জানে পদবীর মানমর্যাদা রক্ষা করতে। এদের জীবনের প্রথম পদবী হলো সহ-সম্পাদক, আর পূর্বের পরিচয় হলো কোনো ওয়ার্ড/থানা/জেলার ছোটখাট পদধারী ‘নেতা’।


জানতে ইচ্ছা হয়, এরাই যদি হয় সম্পাদকের সহযোগী, তবে দল যাবে কোথায়? আবার বিএনপি ও জামায়াতের সক্রিয় রাজনীতি করেও যদি কেউ একজন আওয়ামী লীগের সহ-সম্পাদক পদবী পায় আর রাজপথের ত্যাগী নেতাকর্মীদের সইতে হয় তাদের অন্যায় দাপট, এর চেয়ে কষ্ট আর কী হতে পারে !


বুঝতে পারি না, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সহ-সম্পাদক কিভাবে ওয়ার্ড/থানা/জেলার কোনো সহযোগী অঙ্গ সংগঠনের সাবেক নেতারা হয়? আওয়ামী লীগের জাতীয় নেতা হতে হলে তার আগে এর কোনো অঙ্গসংগঠনের জাতীয় নেতার দায়িত্ব পালন করা আবশ্যক বলে আমি মনে করি। কিন্তু তা কি হয়েছে বা হচ্ছে?


অযোগ্য ও বিতর্কিতরা যাদের সুপারিশে সহ-সম্পাদক হবেন, তাদের নামের পাশে সুপারিশকারীদের নামও লিখে জননেত্রীকে দিলে তিনি নিশ্চয়ই বুঝতেন যে এত ত্যাগী লোকের মাঝে বিতর্কিতদের নাম কেন? এত সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা ( ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবকলীগসহ আরো কয়েকটি সংগঠনের) থাকতে বিতর্কিতরা নেতা হয় আর দলের ত্যাগীরা মন খারাপ করে নীরবে কাঁদেন। এটা হয়?


বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সকল উপ-কমিটির সম্পাদককে তাদের সাংগঠনিক কাজ ত্বরান্বিত করার জন্য সহযোগী হিসাবে কাজ করবে এই সহ-সম্পাদক (আমার জানামতে)। মোট কথা, সম্পাদকদের বিশ্বস্ত হাতিয়ার হলো সহ-সম্পাদক।


মূল কমিটি ছোট হওয়ার কারণে সহ-সম্পাদক পদটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এখানে প্রতিটি সম্পাদকের সাথে পাঁচজন করে ৯৫ জন লোক এই পদবীর পরিচয়ে পরিচিত হবেন। এর অর্থ হলো মূল কমিটির সকল কাজে তাদের ভূমিকা থাকবে এবং তারা দলের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করবেন। মনে করতে চাই, গত কমিটিতে এমন কিছু বেমানান লোক এই পদবীতে ভূষিত হয়ে এমনভাবে প্রচার করেছে, যাতে এই পদবী তার মান হারিয়েছে। অনেকে নেতার সাথে একটি সেলফি তুলে সে এই পদবীর পরিচয় দিয়েছে বলেও শোনা গেছে। আর তাই এবার জননেত্রী নিজেই এর সংখ্যা ৯৫ নির্ধা্রিত করে তাদেরকে সম্পাদকদের সাথে সহ-সম্পাদক করে দায়িত্ব দেবেন।


দলের মাঠের কর্মীদের আশা ছিল, এই ৯৫ জন সহ-সম্পাদক হবেন মাঠের ত্যাগী, জননেত্রীর বিশ্বস্ত আর সাংগঠনিকভাবে দক্ষ। কোনো বিতর্কিত, অদক্ষ, দলছুট এই কমিটিতে ঠাই পাবে না। সবার প্রত্যাশা ছিল এই পদবীকে যারা আলোকিত করতে পারে, সম্পাদককে সহযোগিতা করতে পারে, দলের আদর্শের প্রতি অটল এমন রাজনৈতিক ব্যক্তিই এ পদে আসবেন। আসবেন তারাই, যাদের জীবন-যৌবনে মিশে আছে মুজিবাদর্শ, দলের প্রয়োজনে রেখেছিল জীবনবাজি, জননেত্রীর জন্য ছিল যাদের হৃদয়ভরা আবেগ, জননেত্রীর জন্য যারা হাসিমুখে জীবনবাজি রেখে রাজপথে আন্দোলন করতে পারে।


মোটকথা সহ-সম্পাদক হবেন শতভাগ যোগ্য ও নির্ভেজাল। কোনো বিতর্কিত লোকহলে বুঝতে হবে জননেত্রীর হাতকে দুর্বল করার মাস্টার প্লান বাস্তবায়নের জন্য সুকৌশলে একে নেতা বানানো হয়েছে। আমাদের দায়িত্বশীল নেতাদের চোখে ধুলো দিয়ে দীর্ঘ দিনের ইনভেস্টমেন্টের ফল তারা পেয়েছে।


বাংলাদেশ আওয়ামীলীগে এই পদবীর যোগ্য নেতা আছেন কয়েক শ'। এদের মধ্য ৯৫ জনকে বেছে নিতে গেলে অনেক ত্যাগী নেতাকেও রাখা মুশকিল হবে। কারণ, সবার ত্যাগ আর শ্রম প্রায় সমান সমান। তারা ছিলেন রাজপথে, জেলে,আবার কেউ হারিয়েছেন অতি আপনজন, কেউ হয়েছেনবাড়িছাড়া। আবার কেউ হারিয়েছেন শরীরের মূল্যবান অঙ্গ।


এদের মাঝে আরও আছেন এমন সাহসী, ত্যাগী ও মেধাবী নেতা-কর্মী, যারা ১/১১র কঠিন সময়ে জননেত্রীর মুক্তির জন্য সেনাশাসিত সরকারের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে জননেত্রীকে মুক্ত করে তারপর ঘরে ফিরেছেন। এদের এমন কোনো ঘাটতি নেই যে এরা সহ সম্পাদক হতে পারবে না। তাদের একটাই ঘাটতি আর তা হলো নেতাদের কাছে গিয়ে মিথ্যা বলে নেতাদের মন জয় করতে না পারা। তারা দলের জন্য কাজ করে যায় কিন্তু কিছু পাবার জন্য নয়। এরা চেয়ে থাকে জননেত্রীর মুখের হাসির জন্য, যা তাদের ত্যাগের ফসল মনে করে এরা তৃপ্তি পায়।


আমি বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের দায়িত্বশীল নেতাদের উদ্দেশে বলবো, (যারা জননেত্রীর সাথে দলীয় বিষয়ে কথা বলতে পারেন) আপনারা যদি মুজিবাদর্শ ধারণ করেন আর জননেত্রীর নেতৃত্বাধীন দলকে ভালোবাসেন তবে নেতা নির্বাচনের পূর্বে অবশ্যই তার অতীতের ত্যাগ ও দলের প্রতি কমিটমেন্ট জানবেন। কমিটির কোনো পর্যায়ে বিতর্কিতদের নাম থাকার অর্থ হলো জননেত্রীর খুব কাছে শত্রুপক্ষ ঢুকে গেছে। আর এর পরিণাম হবে ভয়াবহ।


আমি আমার ছাত্রলীগের সাবেক কিছু ছাত্রনেতার বিষয়ে জানি, যারা ১/১১তে সারা দেশে জননেত্রীর মুক্তির জন্য মিছিল করে কারাবরণ করেছেন। তারা দলের জন্য সব কিছু ত্যাগ করেও নেতা হতে পারেননি। আর তাদের কর্মীও হবার যোগ্যতা নাই, তারা হয় সহ-সম্পাদক।


আমি ইচ্ছা করে কারো বিপক্ষে লিখছি না। আমার সাবেক কিছু নেতার কীর্তিকলাপই আমাকে এ লেখা লিখতে বাধ্য করেছে। আমার এই লেখার মূল উদ্দেশ্য হলো আমাদের মাঠের ত্যাগীদের যেন মূল্যায়ন হয়। কোন অযোগ্য ও বিতর্কিত যেন জননেত্রীর কমিটি না আসে।


লেখক : সাবেক ছাত্রনেতা


বিবার্তা/মামুন/হুমায়ুন/কাফী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com