রোহিঙ্গাদের শরণার্থী শিবির : কাছে থেকে দেখা
প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১৯:৪৯
রোহিঙ্গাদের শরণার্থী শিবির : কাছে থেকে দেখা
সৈয়দ মনির অাহমদ
প্রিন্ট অ-অ+

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে অাগস্টের শেষ সপ্তাহে নিরাপত্তা বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা ও নিরাপত্তাকর্মীদের হত্যার একটি ঘটনা ঘটে। তারপর থেকে খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে নিজ দেশ থেকে রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করছে ওই দেশের নিরাপত্তাকর্মীরা। বর্বর নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে বাড়ী ঘর পরিবার পরিজন ও সম্পদের মায়া ত্যাগ করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগর নদী পাহাড় পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে চলে অাসছে ওরা।


সম্প্রতি সেখানে গিয়ে জেনেছি, গত চার সপ্তাহের অব্যাহত জনস্রোতে যুবকসংখ্যা খুবই কম, অধিকাংশই নারী ও শিশু। সেখানে কিছু কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নিজেদের খরচে নৌকায় করে ওদের টেকনাফ উপকুলে নিয়ে অাসছে, কিছু দালাল আবার যুবতীদের প্রলোভন দেখিয়ে অন্ধকার জগতে ঠেলে দিচ্ছে।


রোহিঙ্গাদের অনেকে পায়ে হেঁটে টেকনাফ সীমান্তে এসে ওই সব স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সহযোগিতা কিংবা ব্যক্তিগত খরচে উখিয়ার কুতুবপালং ও থ্যাংকখালী শরণার্থী তাবুতে অাসছে। অনেকে তাবুতে স্থান না পেয়ে রাস্তায় ও পাহাড়ের ঢালে দিনাতিপাত করছে।


সরকারি ও সামাজিক সংগঠনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনেক ত্রাণ বিতরণ হচ্ছে। তবে ত্রাণ বিতরণে সঠিক কোনো পন্থা চোখে পড়েনি। তাই তো দেখা গেছে, ''অাগে এলে অাগে পাবে'' নীতিতে বিতরণের কারণে কেউ কেউ বার বার পাচ্ছে, অাবার অনেকে বঞ্চিত হচ্ছে।


থ্যাংকখালী টিলার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রোহিঙ্গা নারী জোহরা জানান তিনি রাখাইনের তুলাতুলি গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর স্বামী অাবদুল কাদের মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে বন্দী। তিনি তিন ছেলেকে নিয়ে ছয় দিন অাগে এসেছেন, এখনো কোনো ত্রাণ কিংবা তাবু পাননি ।


আরো একটা ব্যাপার দেখা গেছে, স্থানীয় গরীব লোকজনও রোহিঙ্গাদের সাথে লাইনে দাঁড়িয়ে দিব্যি ত্রাণসামগ্রী নিচ্ছে। কে রোহিঙ্গা, কে স্থানীয় - কে দেখে?


যারা তাবু পায়নি, রাস্তার দু-পাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কোনোমতে আছে, তাদের পানির সংকট বেশি। নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও অাহতদের মধ্যে খাবার ও পোশাকের সংকটও রয়েছে।


ত্রাণ হিসেবে অনেককে নগদ অর্থও দিতে দেখা গেছে। অথচ বাংলাদেশের টাকা চিনেন না অধিকাংশ রোহিঙ্গা নারী। স্থানীয় দোকানে পণ্য কিনতে গেলে দোকানীরা এর সুযোগ নিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে বিপন্ন রোহিঙ্গাদের নগদ অর্থ।


থ্যাংকখালী ও কুতুবপালং এলাকায় প্রায় ৪০ হাজার পলিথিনের তাবু রয়েছে। এসব তাবুতে রোহিঙ্গা, দালালচক্র ও স্থানীয় বখাটেদের মাদকের অাড্ডা দেখা গেছে। তারা কৌশলে অনাহারী রোহিঙ্গা যুবতীদের অাকৃষ্ট করছে, অনেককে তাদের ডাকে সাড়া দিতেও দেখা গেছে।


ফাতেমা নামের ষাটোর্ধ এক রোহিঙ্গা নারী জানান, তার স্বামী নেই, দুই ছেলে ও তাদের স্ত্রী-সন্তানেরা ১৬ দিন অাগে পৃথক পৃথকভাবে এপারে এসেছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত কারো সাথে দেখা হয়নি।


থ্যাংকখালী টিলায় অবস্থানরত মাদ্রাসা পড়ুয়া রোহিঙ্গা তরুণী মিরা জানান, তার মা-বাবাকে হত্যা করে বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। তার ২ ভাইসহ ৯ দিন অাগে এসেছে।


স্থানীয় এলাকাবাসী জানান, অাইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর না হলে অসহায় রোহিঙ্গাদের মাধ্যমে মাদক বিক্রি করবে এলাকার মাদক কারবারীরা।


দিলারা নামের এক রোহিঙ্গা নারী জানান, বাংলাদেশ সরকারের সকল পদক্ষেপে তারা সন্তুষ্ট। তিনি অারো জানান, প্রতিটি তাবুতে সৌর বিদ্যুত দেয়া হয়েছে, প্রাথমিক চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ বিনামূল্যে পাওয়া যাচ্ছে। ১০টি তাবুর জন্য একটি করে টিউবওয়েল দেয়া হয়েছে। তবে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ অারো বাড়াতে হবে।


বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্টের এক চিকিৎসক জানান, তাবুতে থাকা প্রায় ৫০ হাজার নারী গর্ভবতী।


উখিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাঈন উদ্দিন জানান, নবাগতদের স্রোত বন্ধ হলে সব কিছুতে শৃঙ্খলা অাসবে।


রবিবার থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সরাসরি ত্রাণ কার্যক্রম তাবু তদারকি করছে। স্থানীয়রা জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মঙ্গলবার শরনার্থী তাবু পরিদর্শন ও ত্রাণ বিতরণের পর থেকে দৃশ্যপট অনেকটা পরিবর্তন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী অান্তর্জাতিক ও দেশীয় মিডিয়ায় সাক্ষাতকারে বলেছেন, ১৭ কোটি বাংলাদেশী খাবার পেলে ৭ লক্ষ রোহিঙ্গাও খাবার পাবে।


লেখক : সভাপতি, সোনাগাজী প্রেসক্লাব


বিবার্তা/হুমায়ৃন/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com