স্প্লিন্টারের ক্ষত আর যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে আছি
প্রকাশ : ২১ আগস্ট ২০১৭, ১৭:৪০
স্প্লিন্টারের  ক্ষত আর  যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে আছি
জোবায়দুল হক রাসেল
প্রিন্ট অ-অ+

২১ শে আগস্ট ২০০৪, ঘড়ির কাঁটা তখন ৫ টা ২০ পেরিয়ে ২২ এর কাঁটায়। সারাদেশ থেকে হাজারো জনতা জড়ো হয়েছেন বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে। বিএনপি-জামাত জোটের প্রত্যক্ষ মদদে সারাদেশে সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদের উত্থানের প্রতিবাদে প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগের ডাকা শান্তিপূর্ণ সমাবেশে। অধীর আগ্রহে শুনছেন দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার প্রতিবাদী কণ্ঠ। পাশে ছিলেন কেন্দ্রীয় ও জাতীয় নেতৃবৃন্দ। বক্তব্যের একদম শেষ পর্যায়ে সমাবেশ পরবর্তী গণমিছিলের জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম আমরা সবাই।


অকস্মাৎ অপরাহ্নের মৃদু আলোতে বিকট শব্দে গ্রেনেডের বিস্ফোরণ। মুহুর্তেই প্রাণচঞ্চল সমাবেশে নেমে এলো মৃত্যুর কালো ছায়া! কিছু বুঝে ওঠার আগেই সমাবেশের মঞ্চকে লক্ষ্য করে নিক্ষিপ্ত হলো একে একে ১৩ টি গ্রেনেড। প্রধান টার্গেট জননেত্রী শেখ হাসিনা। প্রচণ্ড বিস্ফারণ, কালচে ধোয়া, হিতাহিত জ্ঞানশূন্য মানুষের আহাজারি, আর্তচিৎকার, ছোপ ছোপ রক্তরঞ্জিত পিচঢালা রাজপথ, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ যেন শ্মশানঘাট। জীবন বাজী রেখে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ প্রিয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে বাঁচানোর আপ্রাণ প্রচেষ্টা করছেন।তৈরী করলেন নজিরবিহীন মানব ঢাল! সে হামলা ব্যর্থ হলে জঙ্গীরা তাঁর গাড়ী লক্ষ্য করে শুরু করে লাগাতার গুলিবর্ষণ। সে হামলা থেকে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে রক্ষা করতে তাঁর ব্যক্তিগত দেহরক্ষী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ল্যান্সকর্পোরাল মাহবুব নিজের জীবন দিয়ে অর্পিত দায়িত্ব পালন করেন।


মরার উপর খাড়ার ঘা হয়ে সেদিন রক্ষক যেন অবতীর্ণ হয় ভক্ষকের ভূমিকায়। আহতের সাহায্য করতে এগিয়ে না এসে রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট পুলিশবাহিনী উল্টো কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়ে, নির্বিচারে লাঠিচার্জ করে পরিবেশকে করে তোলে অধিক বিভীষিকাময়। উদ্দেশ্য খুনীদের নির্বিঘ্নে পালিয়ে যেতে সহায়তা করা।


পুলিশী আক্রমণে সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে না পেরে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকে। ঢাকা মেডিকেলসহ রাজধানীর হাসপাতালগুলোর দৃশ্য ছিলো অবর্ণনীয়। রিক্সা, ভ্যানগাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স, এমনকি রক্তাক্ত শরীরে প্রাণ হাতে নিয়ে পায়ে হেঁটেও ভীড় জমাতে থাকে ঢাকা মেডিকেলের জরুরী বিভাগে। আহতদের জরুরী সেবা দেয়ার জন্য সেদিন হাসপাতালে ছিলো না কোনো প্রস্তুতি, ছিলো না কোনো ডাক্তার। এমন পরিস্থিতিতে তৎকালীন জোট সরকারের ভূমিকা ছিল কার্যত নির্বিকার ও চরম প্রশ্নবিদ্ধ।


হামলার সময় আমি ছিলাম সমাবেশের মূল মঞ্চ হিসেবে প্রস্তুত করা ট্রাকটিতে উঠতে ব্যবহৃত সিঁড়িপথের ঠিক ডানপাশে। আমি তখন মতিঝিল থানা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। একজন নিবেদিতপ্রাণ ছাত্রলীগ কর্মী হিসেবে বিরোধীদলের সেই কঠিন সময়ে সদা প্রচেষ্টা থাকতো প্রিয় নেত্রীর স্নেহভাজন হিসেবে তাঁর পাশে থাকার, মিটিং-মিছিল-সমাবেশে তাঁকে ছায়ার মতো অনুসরণ করার।


ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার আকস্মিকতায় হতবিহ্ববল আমি সম্বিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। চোখ মেলে তাকাতেই দেখি আমার পাঁচ-ছয় গজ দূরে আইভি আপা নিথর দেহে নির্বাক তাকিয়ে, গ্রেনেডে উড়ে গেছে তাঁর দুটি পা। আইভি আপার পাশে আহতাবস্থায় কাতরাচ্ছিলেন মহিলা আওয়ামী লীগের বেশ কিছু নেতৃবৃন্দ। আমার সামনেই রাস্তায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আমাদের প্রিয় মোস্তাক আহম্মেদ সেন্টু ভাই।


হুড়োহুড়ি ছোটাছুটির ভিড়ে আমি উঠে ছুটতে চেষ্টা করি। পা দুটি কিছুতেই শরীরের ডাকে সাড়া দিচ্ছিলো না। তাকিয়ে দেখি গ্রেনেডের ছোটছোট স্প্রিন্টারের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত দুই পায়ের গোড়ালি থেকে উরু পর্যন্ত, ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরছে। আমি অসহায়ের মত চিৎকার করতে থাকি, ‘আমাকে বাঁচান, আমাকে ওঠান, আমি উঠতে পারছি না, আল্লাহ্‌র ওয়াস্তে কেউ সাহায্য করুন!’


নিজের জান বাঁচাতে মরিয়া সেদিন কেউ এগিয়ে আসেনি। এভাবে কতক্ষণ পরে ছিলাম মনে নেই। প্রচণ্ড ব্যাথার যন্ত্রনায় সমস্ত শরীর যেন অসাড়-অবশ। অবশেষে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের ফুটপাতে কাজ করা এক মুচি সাহায্যে এগিয়ে এলো। মরা লাশের মতো টেনে হিঁচড়ে আমাকে ৫০ গজ দূরে রাস্তার একপাশে এনে রাখলো।


আমি দেখলাম, আপাকে বহনকারী গাড়ীটি দ্রুত বেরিয়ে যাচ্ছে। বুঝলাম আপা তাহলে বেঁচে আছে। তখনকার সে অনুভূতি বলে বোঝানো যাবে না, বুকের উপর থেকে যেন বড্ড ভারি একটা পাথর নেমে গেলো। ওই অবস্থাতেই ফোন করলাম সিলেটের বদরুদ্দীন আহম্মেদ কামরান ভাইসহ আরো কয়েকজন নেতাকে, জানালাম আপার প্রাণে বেঁচে যাওয়া ও এখানকার ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা।


মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করা ট্রাকের উপর আপার সাথে ছিলেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি (তৎকালীন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য) জিল্লুর রহমান, প্রয়াত আবদুর রাজ্জাক, আমির হোসেন আমু, প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, ওবায়দুল কাদের, অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর, কাজী জাফর উল্লাহ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, নজরুল ইসলাম বাবু, আওলাদ হোসেন, সাঈদ খোকন প্রমুখ। আপাকে বাঁচাতে মানব ঢাল বানিয়ে তারা সবাই হয়েছিলেন আহত-রক্তাক্ত।


আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের স্বেচ্ছাসেবী কর্মীরা আমি ও বংশাল থানা ছাত্রলীগসহ আহত কয়েকজনকে একটি ভ্যানে উঠিয়ে নিয়ে আসা হলো ঢাকা মেডিকেলের জরুরী বিভাগে। করিডোরে বসেই উপলব্ধি করলাম গ্রেনেড হামলার বিভীষিকাময়তা। যেন হাত-পা বিহীন, ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত শরীরের মিছিল আসছে ঢাকা মেডিকেলে। অপ্রতুল ডাক্তার-নার্স ওয়ার্ডবয়রা আমার অপেক্ষাকৃত মুমূর্ষু ভাই-বোনদের নিয়ে ব্যস্ত। সেখানে চিকিৎসা না পেয়ে আমাকে নিয়ে যাওয়া হয় ধানমন্ডি সেন্ট্রাল হাসপাতালে, সেখানেও একই পরিস্থিতি। হতাহত আওয়ামী লীগ নেতা কর্মীদের আহাজারি আর্তচিৎকার। প্রায় দুই ঘন্টা অপেক্ষা করেও ন্যূনতম প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যতিরেকেই ফিরে আসতে হয়। এরপর আমার স্থান হয় ফার্মগেটের আল-রাজী হাসপাতালে, সেখানে অপারেশন করে দুই পা থেকে বের করা হয় শতাধিক স্প্রিন্টারের টুকরা। ডাক্তারের ভাষ্যমতে দুই পায়ে প্রায় শ’দুয়েক ছোটছোট স্প্রিন্টার, মাংসের গভীরে ঢুকে যাওয়ায় সবগুলো বের করা সম্ভব নয়।


অপারেশন শেষে আমাকে নিয়ে ভর্তি করা হয় শিকদার মেডিকেলে। খবর পেয়ে রাতেই আহত সন্তানকে দেখতে আব্বা ছুটে আসেন, কিন্তু আমাকে ফেলে অত্যধিক আহত অন্যান্য নেতা-কর্মীদের চিকিৎসার খোঁজ-খবর নিতেই বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েন আমার আওয়ামী লীগ অন্তঃপ্রাণ আব্বা।


২১ আগস্ট। ইতিহাসের ভয়াবহতম গ্রেনেড হামলার ১২তম বার্ষিকী। ১৩ বছর ধরে শরীরে স্প্রিন্টারের ক্ষত আর অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে আছি। তবু মনে শান্তি, আমাদের আশা-ভরসার বাতিঘর জ্বলছে, দেশকে আলোকিত করে চলেছেন; দেশরত্ন শেখ হাসিনা সুস্থভাবে বেঁচে আছেন।


লেখক : রাজনীতিবিদ


বিবার্তা/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com