ঢাবির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী : জাতির পিতার অবমাননা তদন্তের কী হলো!
প্রকাশ : ৩০ জুন ২০১৭, ২১:৪৯
ঢাবির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী : জাতির পিতার অবমাননা তদন্তের কী হলো!
মো. আবদুর রহিম
প্রিন্ট অ-অ+

শনিবার ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৬তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী। প্রতি বছর সাড়ম্বরে দিনটি পালন করা হয়ে থাকে। শত বছরের দোড়গোড়ায় দাঁড়িয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জনের খতিয়ান দেখে পুলকিত হই, অন্যদিকে সাম্প্রতিককালে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা আমাদের সমস্ত অর্জনকে ম্লান করে দেয়।


বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে আমার মাথা হেট হয়ে যায়। গতবছর এই দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৫তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে প্রকাশিত স্যুভেনিরে ‘স্মৃতি অম্লান’ শীর্ষক একটি লেখায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে খাটো করে দেখানো হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত স্যুভেনিরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেতা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘জাতির জনক হিসেবে বিবেচিত’ বলে উল্লেখ করা হয়। অনেকেই মনে করেন, এটি জাতির জনককে দ্বিতীয়বার হত্যার শামিল।


ভাষাগত দিক থেকে অন্যতম শব্দের অর্থ হলো অনেকের মধ্যে একজন। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের অন্য দশজন রাজনৈতিক নেতার একজন। অথচ সমসাময়িক বিশ্বের রাজনৈতিক সচেতন মহলের কে না জানেন যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা। যাকে অন্য কারো সাথে তুলনা করার কোনো সুযোগ নেই।


এছাড়া বাংলাদেশের সংবিধান যেখানে বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি হিসেবে মর্যাদা দিয়েছে, সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশনায় কী করে তাঁকে ‘জাতির পিতা হিসেবে বিবেচিত’ বলে উল্লেখ করা হয়? বাংলাদেশের সংবিধানের স্বীকৃত বাস্তবতাকে কারা অস্বীকার করার সাহস দেখায়, বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা হিসেবে কারা স্বীকার করে না তা সবারই জানা।


এছাড়া একই প্রকাশনার অন্য অংশে জিয়াউর রহমানকে ‘বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দুয়ে দুয়ে চার হয় এটা সবাই জানে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এরকম একটি ঘটনা কি নিছক কোনো ভুল, নাকি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সেটি গত এক বছরেও জানা গেল না।


জাতির যে কোনো পরিস্থিতিতে দিক নির্দেশনার কেন্দ্রবিন্দু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতির আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতীক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশনায় এহেন শাস্তিযোগ্য ইতিহাস বিকৃতি একদিকে জাতিকে বিভ্রান্ত করে, অন্যদিকে আমাদের রক্তমূল্যে অর্জিত স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতিকারী বিএনপি-জামায়াত একে মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে পেয়ে যায়।


এই অপশক্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশনায় সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে ঘোষণা দিয়ে দম্ভ প্রকাশ করে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উত্তাল হয়। টিএসসির অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত ছাত্র-শিক্ষক কর্মকর্তা-কর্মচারী সকলেই এর প্রতিবাদ জানায়। ছাত্ররা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ছাত্ররা ভিসির বাসভবন ঘেরাও করে রাখে। ছাত্রদের শান্ত করার জন্য সাময়িকভাবে কতকগুলো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার সৈয়দ রেজাউর রহমানকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়, কিন্তু টিএসসির উপ-পরিচালক পদে বহাল থাকে।


দোষীদের চিহ্নিত করার জন্য একটি তদন্ত কমিটি করা হয়। বছর ঘুরে আবার যখন ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস পালন করা হচ্ছে, তখন গত বছরের ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিরা বহাল তবিয়তেই থেকে গেছে। কতকগুলো প্রশ্নের উত্তর আজও পাওয়া যায়নি। বিএনপি সরকারের আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক এসএমএ ফায়েজের সময় সৈয়দ রেজাউর রহমান রেজিস্ট্রার নিযুক্ত হন।


আমাদের প্রশ্ন, সেই রেজিস্ট্রার বর্তমান প্রশাসনের আমলে দীর্ঘ সময় ধরে বহাল থাকলো কী করে? ঘটনার এক বছর পেরিয়ে গেলেও তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন জাতি জানতে পারল না কেন? আর হলি আর্টিজানের ঘটনার দিনে এই ঘটনা ঘটার কোনো যোগসূত্র আছেকি?


এসব প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি। কোনো সুযোগসন্ধানী ব্যক্তির অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের দায়ভার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার নিতে পারে না। মোট কথা, তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে দায়ীদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় এনে সঠিক ইতিহাস তৈরী না করতে পারলে এই প্রকাশনা একসময় সুযোগ সন্ধানী ইতিহাসবিদদের কাছে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হবে। আর সুষ্ঠু তদন্ত না হওয়ায় পরবর্তীতেও এমন ন্যক্কারজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।


উপরন্তু, গত ৪ মার্চ ২০১৭ তারিখ অনুষ্ঠিত সমাবর্তন উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেরিফাইড ফেসবুক পাতায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামের আগে জাতির পিতা লেখা হয়নি ও ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও সত্যেন্দ্র নাথ বসুর নামের পর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম লেখা হয়। কোনো অপরাধের সুষ্ঠু তদন্ত না হলে এ ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটবেই।


এ ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কি তাদের দায় এড়াতে পারেন? কাজেই সঠিক ইতিহাসের স্বার্থে; সংবিধানে গৃহীত সিদ্ধান্তের আলোকে সর্বোপরি, ঘটনার পুনরাবৃত্তি ও ইতিহাস বিকৃতি রোধে এই ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন অবিলম্বে প্রকাশ এবং দোষীদের শাস্তির আওতায় আনা জরুরি।


লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


বিবার্তা/কাফী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com