পুরনো সেই দিনের কথা...
প্রকাশ : ১৬ অক্টোবর ২০১৬, ১৭:৩১
পুরনো সেই দিনের কথা...
ফুয়াদ হাসান
প্রিন্ট অ-অ+

জীবনটা তখনই সুন্দর ছিল, যখন সপ্তাহে একদিন বাংলা সিনেমা দেখার জন্য ঘরভর্তি মানুষ সাদা-কালো টিভির সামনে বসে থাকতাম। সিনেমা শুরু হবার অনেক আগে আবহাওয়ার খবর দেখা, ত্রিপিটক পাঠ শোনা; সবই ছিল সিনেমা দেখার অংশ।


সিনেমা চলাকালীন বিজ্ঞাপন এলে আমরা আঙুল দিয়ে নামতার মতো করে বিজ্ঞাপন গুণতাম। ৩০টা বিজ্ঞাপন দেখানোর পরই সিনেমা শুরু হয় - এই ব্যাপারটা ততদিনে আমরা আবিষ্কার করে ফেলেছি। যেদিন ভুল করে দুপুরে ঘুমিয়ে যেতাম, খুব মন খারাপ হতো। দুপূরে ঘুমানোর মানেই হল বিকেলের খেলার টাইম মিস করে ফেলা। আমরা সারাদিন বিকেল সময়টার জন্য অপেক্ষা করতাম। শীতের সময় মাগরিবের আযান বিকেল সাড়ে ৫টায় দিয়ে দিলে কান্না কান্না মুখ করে ঘরে ফিরতাম।


ঘরে ফেরা মানেই পাটিগণিতের বই নিয়ে বসা। চৌবাচ্চার অংকটা জীবনটাকে প্রায়শই অতিষ্ঠ করে ফেলত। অংক মেলাতে গিয়ে দুশ্চিন্তায় পেন্সিলের উল্টো দিকের রাবারের অংশ কামড়ে খেয়ে ফেলতাম।


রোজ সন্ধ্যায় পড়ার সময়টাতে একবার লোডশেডিং হতো। সাথে সাথেই যে যেখানে থাকুক না কেন, একসাথে বিকট চিৎকার করে রাস্তায় জড়ো হতাম। শুধু একটা সময় লোডশেডিং হলে আমাদের কষ্ট হতো, যখন আলিফ লায়লা দেখাত।


সেই সময় কিছু শৌখিন বড়লোক ছিল, যাদের বাসায় ব্যাটারিওয়ালা টিভি থাকত অর্থাৎ কারেন্ট চলে যাবার পরেও টিভি চলবে। আমরা দল বেঁধে সেই বাসায় হানা দিতাম।


জীবনটা তখনই সুন্দর ছিল, যখন মনোমালিন্য হলে আমরা কনে আঙুলে আড়ি নিতাম, দু’দিন কথা বলতাম না। তারপর আবার আনুষ্ঠানিকভাবে দুই আঙুলে ‘ভাব’ নিতাম, অর্থাৎ এখন থেকে আবার কথা বলা যাবে।


সেই সময় সব মেয়েই একটা পুতুল কিনত, যেটার সুইচ অন করলেই শাহরুখ খানের ‘‘ছাইয়া ছাইয়া’গানটা বাজত। আর ছেলেদের সবচেয়ে দামী খেলনা ছিল রোবোকপ, যেটা চালু করতে আটটা পেন্সিল ব্যাটারি লাগত।


জীবনটা তখনই সুন্দর ছিল যখন ক্লাশরুমে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে ভাবতাম, এখন যদি ফ্যানটা খুলে পড়ে তাহলে সেটা কার মাথায় পড়বে ? অনেক পরে জেনেছি, এই জিনিস শুধু আমি না, প্রায় সবাই ভাবত !


আমাদের সময় একটা নিয়ম ছিল, যার ব্যাট সে সব সময় আগে ব্যাটিং করবে। আমাদের টস মানেই হল আগে ব্যাটিং, টসে জেতার পর কাউকে কোনোদিন ফিল্ডিং নিতে দেখিনি।


রোজ বিকেলে কটকটিওয়ালা আসত। মজার ব্যাপার হলো, কটকটি কিনতে টাকা-পয়সার দরকার হতো না। পুরনো কাগজ, প্লাস্টিকের কিছু একটা দিলেই কটকটি পাওয়া যেত।


আমরা এক টাকা দিয়ে নারকেল আইসক্রিম খেতাম; কত মার খেয়েছিলাম এই কিশমিশমেশানো নারকেল আইসক্রিমের জন্য, সব এখনো চোখের সামনে ভাসে ! আমাদের সময় সবচাইতে সুন্দর জুতা ছিল লাইটওয়ালা কেডস জুতা। হাঁটলেই জুতা থেকে লাইট জ্বলত। অন্ধকারে সেটা পায়ে দিয়ে বের হলে দুনিয়াশুদ্ধ মানুষ তাকিয়ে থাকত।


পড়ার বইয়ের ভেতরে থাকত চাচা চৌধুরী। চাচা চৌধুরীর বুদ্ধি ছিল কম্পিউটারের থেকেও প্রখর।


জীবনটা তখনই সুন্দর ছিল যখন আমরা রাজা কনডমকে বেলুন বানিয়ে খেলতাম। সব চাইতে বড় অপারেশন ছিল চটপটি খেয়ে টাকা না দিয়ে পালিয়ে যাওয়া!


স্ট্যাম্প জমাতাম। রানী এলিজাবেথ ছিল সব চেয়ে দামী স্ট্যাম্প, পাঁচ টাকা। ঈদের এক সপ্তাহ আগে ঈদ কার্ড বিক্রি করতাম। সেই সময় সব চাইতে দামী জরিওয়ালা ঈদ কার্ড যেটা ছিল। সেটা খুললে ভেতর থেকে অবিশ্বাস্যভাবে মিউজিক বাজত!


সেই দিনগুলোতে আমরা পেন্সিলের শার্পনার হারিয়ে কাঁদতাম ! আমাদের দুঃখগুলো তখন আমাদের মতোই শিশু ছিল। আমাদের কোনো প্রেমিকা না থাকলেও একটা কেউ ছিল, যার সামনে দাঁড়ালে আমাদের বুক ধুকপুক করে উঠত। দরজা বন্ধ করে ড্রয়িং খাতায় তাকে আঁকতাম। কপালের টিপ মাঝখান বরাবর না বসলে রাবার দিয়ে মুছে আবার আঁকতাম। সেদিন আর পড়ায় মন বসত না!


কী সব সোনালী দিন ছিল... আহা!


বিবার্তা/মৌসুমী/হুমায়ুন

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com