বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ : পয়লা বৈশাখের মূল চেতনা
প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০২২, ০০:০০
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ : পয়লা বৈশাখের মূল চেতনা
ডা. ফেরদৌস খন্দকার
প্রিন্ট অ-অ+

বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন আজ। শুরু হতে যাচ্ছে বাংলা পঞ্জিকার ১৪২৯। উৎসব উদযাপন, ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানাদি পালন ও বাঙালিয়ানার রীতি পালনের মাধ্যমে বছরান্তে বর্ষবরণ করে থাকে বাঙালি। এই দিনকে বরণ করে সকল অশুভ ও অপশক্তি প্রতিহ করার শুভচিন্তা নিয়ে— সুখ, সমৃদ্ধি ও মঙ্গলের প্রত্যাশায় বাংলা নববর্ষের সূচনা করে বাংলাদেশ।


আজ বর্ষবরণের এই আনন্দঘন মুহূর্তে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মরণে আসছেন প্রাসঙ্গিকভাবেই। সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক ইস্যুগুলোই এর কারণ। খুব কাছাকাছি সময়ে, বাংলাদেশের মানুষ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মতভেদ নিয়ে বিবাদে জড়িয়ে পড়েছে। পয়লা বৈশাখ বাঙালির সার্বজনীন উৎসব। এই উৎসবের সূচনালগ্নে দাঁড়িয়ে বাঙালি জাতিসত্তা প্রশ্নবিদ্ধ। বাঙালি সংস্কৃতি পালিত হবে না শুধুই মানা হবে ধর্মীয় অনুশাসন? তাও গোঁড়া ধার্মিকরা যে-কোনো একটি নির্দিষ্ট ধর্মকে ব্যবহার করছে সাম্প্রদায়িক চেতনাকে প্রতিষ্ঠিত করতে


যুগ যুগ ধরে বাংলায় বিভিন্ন দল-মত-ধর্মের মানুষ নিজ নিজ আচার-অনুষ্ঠান পালন করে পারস্পরিক সহাবস্থান করে আসছে। তবে এই সুখধারা অবিচ্ছিন্ন নয়। দিন কয়েক পরপরই বিবাদের সৃষ্টি হয়, তার মানে সাম্প্রদায়িক রোষ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘাপটি মেরে বসে। সময় সুযোগে বিকট আকার ধারণ করে বেরিয়ে এসে— সামাজিক শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিঘ্নিত করে।



আমাদের স্বাধীনতার মূল ভাবধারা ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনার। এই ভাবধারার প্রেরণা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শুধু প্রেরণাই নন, তিনি এই ভাবধারার বাস্তবায়ক। তিনি ধর্মের ভিত্তিতে দেশগঠন চাননি কোনোদিন, বরাবরই চেয়েছেন বাংলা ভাষাভাষীদের জন্য পৃথক একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থা। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জনের পেছনের ইতিহাসে রয়েছে এসব সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাহাঙ্গামারই বিভীষিকাময় দিন। আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলার ইতিহাসে একজনই মহামানব ছিলেন— যিনি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়েই দীর্ঘ সময় লড়েছেন।



বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘‘সাম্প্রদায়িকতা যেন মাথাচাড়া দিয়ে না উঠতে পারে। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র বাংলাদেশ। মুসলমান তার ধর্মকর্ম করবে। বৌদ্ধ তার ধর্মকর্ম করবে। কেউ কাউকে বাধা দিতে পারবে না। কিন্তু ইসলামের নামে আর বাংলাদেশের মানুষকে লুট করে খেতে দেওয়া হবে না।' আরও কত বছর আগে কথাটা বলেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, কিন্তু আজকে ২০২২ সালে ১৪২৯ বঙ্গাব্দে এসেও তার এই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন কথাটাই সত্যি!



১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বিবার্ষিক সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “রাজনীতিতে যারা সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি করে, যারা সাম্প্রদায়িক তারা হীন, নীচ, তাদের অন্তর ছোটো। যে মানুষকে ভালোবাসে সে কোনো দিন সাম্প্রদায়িক হতে পারে না। আপনারা যারা এখানে মুসলমান আছেন তারা জানেন যে, খোদা যিনি আছেন তিনি রাব্বুল আলামিন। রাব্বুল মুসলিমিন নন। হিন্দু হোক, খ্রিস্টান হোক, মুসলমান হোক, বৌদ্ধ হোক সব মানুষ তাঁর কাছে সমান। সেজন্যই এক মুখে সোশ্যালিজম ও প্রগতির কথা এবং আরেক মুখে সাম্প্রদায়িকতা পাশাপাশি চলতে পারে না। যারা এ বাংলার মাটিতে সাম্প্রদায়িকতা করতে চায়, তাদের সম্পর্কে সাবধান হয়ে যাও। আওয়ামী লীগের কর্মীরা তোমরা কোনো দিন সাম্প্রদায়িকতাকে পছন্দ করো নাই। তোমরা জীবনভর তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছ। তোমাদের জীবন থাকতে যেন বাংলার মাটিতে আর কেউ সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন না করতে পারে।” জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সবসময়ের আহবান ছিল সাম্প্রদায়িক অপশক্তির ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে বাংলাদেশের মানুষকে। সাম্প্রদায়িক ঘটনার পেছনে নানা ষড়যন্ত্র কাজ করে, এ ব্যাপারেও তিনি হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন।



একটা বিষয় লক্ষ্য করুন, রমনার বটমূলের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান কিংবা চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নিতে কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে আমন্ত্রণ জানানো হয় না বা আহবানও করা হয়। আহবান করা হয়, সুশৃঙ্খল ও সুচারুভাবে নববর্ষকে বরণ করা হোক। একটা অনুষ্ঠানে তো নিয়ম-শৃঙ্খলা কাম্য হবেই। কিন্তু এমন কি চিন্তা করা হয় যে, শুধু হিন্দু-বৌদ্ধরাই এই উৎসবে আসুক, কিংবা খ্রিষ্টানরা আসুক, অথবা মুসলমানরা আসুক? কখনোই না।


বর্ষবরণের উৎসবে তারাই আসেন যারা বাঙালি সংস্কৃতিকে ভালোবাসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় এত হাজার হাজার মানুষের সমাগম হয়, কারো মুখ দেখে বলতে পারবেন কে হিন্দু, কে খ্রিষ্টান, কে বৌদ্ধ, কে-ই বা মুসলমান? কারো মুখে লেখা থাকে না ধর্মের নাম, লেখা থাকে একটিই নাম— বাঙালি।



বাঙালির আনন্দমুখর উৎসবমুখর জীবনের লক্ষ্যেই তো স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে চাইতেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। স্বপ্নের সোনার বাংলায় সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশা করতেন অসাম্প্রদায়িকতা। বাংলা নববর্ষ পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ১৩ এপ্রিল জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত এক বাণীতে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘বাংলাদেশকে আমরা সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলবো। এই হোক আমাদের নববর্ষের শপথ।’ আবার, কোথাও বলে দেওয়া হয় না কিন্তু উৎসব আমেজের ঢংয়ে এটাই সঠিক যে পয়লা বৈশাখের মূল চেতনা হচ্ছে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ এবং বাঙালি সংস্কৃতির প্রধান উৎসব ‘বর্ষবরণ’।



বাংলা সাল গণনা শুরু হয়েছিল সম্রাট আকবরের সময়ে। সে সময় থেকে রাজা-বাদশারা এবং জমিদারি আমলে জমিদাররা চৈত্র সংক্রান্তিতে খাজনা আদায় করে পহেলা বৈশাখে প্রজাদের মিষ্টিমুখ করাতেন। কোথাও কোথাও মেলাও বসত। নববর্ষের উদযাপনের শুরুটা এভাবেই হয়েছিল। আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের শুরু ১৯১৭ সালে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর পহেলা বৈশাখে কীর্তন ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়। লক্ষ্য করে দেখুন, এই যে নববর্ষের ইতিহাস এখানেও বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনারই বহিঃপ্রকাশ।


১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়ন ও সাংস্কৃতিক সন্ত্রাসের প্রতিবাদে ১৯৬৭ সালে ছায়ানট বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা করে। পাকিস্তান সরকারের নিরাপত্তা আইনে সেসময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কারাগারে। পরবর্তী সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দেওয়া হয়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় কোথাও ‘পহেলা বৈশাখ’ পালন হয়নি। যেটা সম্ভবও ছিল না। ১৯৭২ সালে স্বাধীন দেশে বঙ্গবন্ধু পহেলা বৈশাখকে জাতীয় উৎসব হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন এবং এই দিনটিকে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করেছিলেন। এরপর থেকেই নববর্ষ উদযাপনের মাত্রা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে থাকে। স্বাধীনতা পরবর্তী বর্ষবরণ উৎসব জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়। ১৯৮৯ সালে বর্ষবরণে নতুন মাত্রা যুক্ত হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। ২০১৬ সাল থেকে বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা নববর্ষের ভাতা প্রদান করা শুরু করেছেন। তাঁর প্রচেষ্টাতেই ইউনেস্কোর মানবতার অধরা বা অস্পর্শনীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান লাভ করে মঙ্গল শোভাযাত্রা।



অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসাম্প্রদায়িক চেতনার কল্যাণেই স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাধীনভাবে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করছি আমরা। মনে হতে পারে, ধান ভানতে শীবের গীত গাইলাম। আসলে, গভীরভাবে ভাবুন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যদি এই বাংলায় না জন্মাতেন তাহলে কোথায় থাকতাম আমি বা আপনি? প্রতিটি ধর্মীয় মূল্যবোধও কি টিকে থাকত বাংলায়? বাঙালি সংস্কৃতি ইতিহাসের অতলেই হারাত। তার অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে নিজেদের আদর্শ হিসেবে ধারণ করতে পারলে সার্থক হবে বর্ষবরণের আয়োজন।



পয়লা বৈশাখ আবহমান বাংলার উৎসব। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন বছরকে বরণ। পুরাতনকে বিদায় দেওয়া। প্রকৃতি ও মানবমনের সব ক্লান্তি-গ্লানি-ব্যর্থতা-অবসাদকে পেছনে ঠেলে দিয়ে নতুনকে সাদরে আহ্বান। নববর্ষের উৎসবকে যারা ধর্মের দ্বারা দ্বিধাবিভক্ত করে, তারা আসলে বাঙালি সংস্কৃতির বিরোধী। এটি আমাদের স্বাধীনতার মূল প্রেরণা ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনারও পরিপন্থি। ধর্মান্ধতা ও মৌলবাদী অপশক্তিকে সমূলে বিনাশ এবং বাঙালি চেতনার সর্বব্যাপী উজ্জীবনের মধ্যেই রয়েছে পয়লা বৈশাখ উদযাপনের সার্থকতা ও বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্নের বাস্তবায়ন। ১৪২৯ সবার জীবনে আনন্দ ও মুক্তির বার্তা বয়ে আনুক, অসাম্প্রদায়িকতার জয় হোক প্রিয় বাংলাদেশে।
জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।


লেখক: ডা. ফেরদৌস খন্দকার, এম.বি.বি.এস, এম.ডি, এফ.এ.সি.পি, সভাপতি, শেখ রাসেল ফাউন্ডেশন, ইউএসএ।


বিবার্তা/এসবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com