আনিস কাকা: আপনার চেয়ে আপন যে জন!!
প্রকাশ : ১৭ মে ২০২০, ১৮:২৮
আনিস কাকা: আপনার চেয়ে আপন যে জন!!
সেলিম রেজা নূর
প্রিন্ট অ-অ+

বৃহস্পতিবার (মে ১৪) সকাল বেলায় আনিস কাকা’র মৃত্যু সংবাদটি শোনা অবধি খুবই বিপন্ন বোধ করেছি কারণ কাকা’র সাথে আমাদের পারিবারিক যে বন্ধন – তাকে কি বলবো? হয়তো বলা যায় সৃজন দিনের যোগ! হ্যা, কাকা’র সাথে আমাদের পারিবারিক সম্পর্কটি ছিল সে রকমই। আমাদের বাবা’র কোলকাতার মতো বিশাল নগরীতে কপর্দকহীন অবস্থায় শিক্ষা-গ্রহণ করতে যাওয়া ছিল এক কষ্ট কল্পনা, ফলে আনিস কাকাদের পরিবার তথা উনার বাবা যাকে আমরা খুব ছোট বেলায় দেখেছি – দাদা বলতাম – মোয়াজ্জেম দাদা, উনার সাহায্য – সহযোগিতা না পেলে আমাদের বাবা পরবর্তী জীবনে যে সিরাজুদ্দীন হোসেন হয়ে উঠেছিলেন – সেই ব্যক্তিত্ব ও সাফল্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হতে পারতেন না! আমার অন্য ভাইদের স্মৃতি-তর্পণে এই সম্পর্কের গভীরতার বিষয়টি বার বার উঠে এসেছে বিধায় সে প্রসঙ্গে আর না-ই বা গেলাম। নানা কারণেই আনিস কাকা আমাদের পরিবারের ‘আপনার চেয়ে আপন জন’ হয়ে থেকেছেন।


আমাদের বাবা আমাদের জন্য এই পার্থিব-জীবনে বৈষয়িক তেমন কিছু রেখে যেতে পারেন নি সত্য, কিন্তু এমন কিছু বন্ধু – স্বজন-সুজন রেখে গিয়েছিলেন যাদের মধ্যে রেজা কাকা ও আনিস কাকা অন্যতম। স্বাধীনতাত্তোর কালে আমাদের জীবন শূন্য থেকে নয় বরং মাইনাস থেকে শুরু করতে হয়েছিল! আব্বা’র কাছে আসতো না এরকম ‘গণ্য-মান্য-বিশিষ্ট লোকজন’ খুব কমই ছিলো এদেশে! আমার বাবার কাছে – আমাদের বাসায় প্রতিদিন একবার না এলে যাদের ‘ভাত হজম’ হ’তো না – তারা সবাই স্বাধীনতাত্তোর কালে বেশ বড় সড় কেউকেটা হয়ে প্রায় অতীতটা ভুলেই গেল! ফলে আমাদের বাবা’র পরিচিত অধিকাংশ জনই কেমন যেন অপরিচিত হয়ে গেল।


তাদের তো কোনো দায়ই রইলো না আমাদের খোঁজ-খবর নেবার; এমন কি আমাদের পরিবারের থেকে এ জাতীয় ‘ভদ্রলোক’দের সাথে যোগাযোগ করবার চেষ্টা করলে অনেক সময় সে অভিজ্ঞতা সুখকর ছিলো না। মূলতঃ বঙ্গবন্ধু প্রতিনিয়তঃ আমাদের খবরা-খবর নিতেন আমাদের বড় মামা ও বঙ্গবন্ধু ও আমাদের বাবা’র সহপাঠী আওয়ামী লীগ নেতা জনাব শামসুদ্দীন মোল্লা এম,পি,’র মাধ্যমে।


সেই ভয়াবহ দিনগুলিতে আব্বা’র অবর্তমানে বঙ্গবন্ধু – বড় মামা আমাদের অভিভাবকের আসন নিয়েছিলেন বলেই অনেক ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ সময় পেরিয়ে আসতে পেরেছিলাম আমরা। আমাদের তখন চরম আর্থিক সংকট - বাড়ি ভাড়া দেবার কোনো উপায় ছিলো না তবুও মা চামেলীবাগ ছাঁড়বেন না বলে গোঁ ধরে রইলেন! বঙ্গবন্ধু’র ঘনিষ্ঠ বন্ধু বড় মামা শামসুদ্দীন মোল্লা এম,পি, - বড় ভাই, মেজ ভাই বাস্তবতার নিরিখে মা’কে সরকার প্রদত্ত বাড়িতে উঠাতে ক্রমাগত ব্যর্থ হয়! বড় মামা’র কাছ থেকে বঙ্গবন্ধু সেই খবর পেয়ে আমাদের বাসায় দুই দুইবার পাঠান আমাদের আব্বার স্নেহধন্য বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব তোফায়েল চাচাকে আমার মা’র কাছে এই বার্তা দিয়ে যে ‘এটা বঙ্গবন্ধু’র নির্দেশ যে উনি সিরাজের পরিবারকে সরকার প্রদত্ত বাড়িতে দেখতে চান অবিলম্বে’! আমার মা বলেছিলেন আমার স্বামীর জীবনের বিনিময়ে আমি কোনো সুযোগ সুবিধা চাই না - আমি আমার স্বামী’র স্মৃতি বিজড়িত এ বাড়ি ছাড়তে পারববো না! প্রচণ্ড আবেগ- মথিত বেদনায় আমার মা দীর্ণ-জীর্ণ ছিলেন! পরে বঙ্গবন্ধু স্বয়ং মা’কে গণ-ভবনে ডেকে পাঠান ও বড় ভাই - মেজ ভাই - আব্বার আজীবনের বন্ধু রেজাকাকা মিলে বসে মা’কে বুঝিয়ে অবশেষে রাজী করান সরকার প্রদত্ত বাড়িতে গিয়ে উঠবার জন্য!


ততদিনে বাড়ি বরাদ্দের থেকে বাড়িতে উঠবার সময় পর্যন্ত ক্যালেন্ডারের পাতায় নয় মাস সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে! বাড়ি বরাদ্দ দেয়া হয় ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দিকে- ঐ বাড়িতে আমরা উঠি অক্টোবর ১, ১৯৭২ সালে! ৮০’র দশকের গোঁড়াতে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকার সামরিক অভ্যুথান ঘটিয়ে সরকারের দায়িত্ব নেবার ৪৮ ঘন্টার মধ্যে মাত্র ২ ঘন্টার নোটিশ দিয়ে কয়েক ট্রাক সশস্ত্র পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেট পাঠিয়ে আমাদের অনিচ্ছায় সরকারিভাবে দেয়া সরকারি বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করেছিল! আমার মা বা আমরা সরকারি কোনো করুনা প্রার্থী হইনি কোনো দিনও! এটা আমাদের চরম গর্ব যা আমাদের বাবা - মা শিখিয়ে গেছেন।


পচাঁত্তর পরবর্তী সময়ে বাস্তবতার কারণেই বঙ্গবন্ধু ও বড়-মামা শামসুদ্দীন মোল্লা আর আমাদের পাশে নেই! ফলে তখনকার এরকম বৈরী পরিবেশের মাঝে দুই কাকা ছিলেন চূড়ান্ত রকমেরই ব্যতিক্রমঃ ইত্তেফাকে আব্বা’র আজীবনের সহকর্মী ও কোলকাতার ইসলামিয়া কলেজের সহপাঠী জনাব আসফউদ্দৌলা রেজা কাকা ও আনিস কাকা! সর্ব সময় এই দুই কাকার দরোজা আমাদের জন্য খোলা ছিল। যখন যে কোনো অবস্থায় রেজা কাকা বা আনিস কাকা’র কাছে আমরা গেছি তখনই উনারা দুইজন আপন সন্তানের মতো আমাদের বুকে টেনে নিয়েছেন – আমাদের বুদ্ধি-পরামর্শ এবং সার্বিক সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন। বিশাল হৃদয়ের এই দুই মহাজন ব্যক্তিত্ব আমাদের মাথার উপরে হয়েছিলেন বট-বৃক্ষের ছায়া সম! রেজা কাকা আজ বহু দিন হয় না ফেরার দেশে চলে গেছেন – আনিস কাকা এই সদ্য চলে গেলেন না ফেরার দেশে! আজ ‘প্রাণের বেদনা – প্রাণের আবেগ রুধিয়া রাখিতে নারি’ – তা-ই আনিস কাকা’র উপর এই স্মৃতি-তর্পণ!


আমার মেজ ভাই ঠিকই বলেছে মোয়াজ্জেম দাদা সম্পর্কে: উনি একজন যশস্বী হোমিওপ্যাথ ডাক্তার ছিলেন, বসতেন ঢাকার ফুলবাড়িয়া রেল স্টেশনের কাছে চেম্বারে, খুব ছোট বেলায় আমরা দাদা’র সেই চেম্বারে প্রায় প্রতি মাসেই আব্বা’র সাথে যেতাম – উনাদের বাসায়ও যেতাম! খুব আদর করতেন দাদা আমাদের! দাদা আমাদের কাছে নাত-বৌ খুঁজতেন – আর দেখামাত্র বলতেন ‘কয়টা লাল টুকটুকে বৌ এনে দিবি?” তখন ঐ ছোট্ট বয়সে “বৌ” শব্দটি অন্ততঃ আমার কাছে খুব প্রীতিকর ছিলোনা – খুব লজ্জা পেতাম – মনে হ’তো আমি দাদা’র ঠাট্টার পাত্র!


যাইহোক, এরপরে আমরা পুরনো ঢাকা থেকে নুতন ঢাকায় গিয়েছি – স্কুলে ভর্তি হয়েছি – দেশের রাজনৈতিক অবস্থা পরিবর্তন হ’তে থাকায় আব্বা ভীষণ ব্যস্ত হয়ে উঠতে থাকেন ৬৬’র ৬-দফা আন্দোলন, পরে ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান সময়কালে আব্বা দিনরাত্রি ব্যস্ত থেকেছেন; তাছাড়া আব্বা’র আসা-যাওয়ার পথে আর দাদা’র চেম্বার পড়তো না বলেই হয়তো নিত্য সেই যাওয়া আসাটি কমে গিয়েছিল। একটু একটু মনে পড়ছেঃ মোয়াজ্জেম দাদা সম্ভবতঃ স্বাধীনতার পরে মারা যান – দাদা’র মৃত্যু সংবাদ ও কুলখানির দাওয়াত মা ও আমাদের পরিবার’কে দিতে আনিস কাকা নিজে চামেলীবাগের বাসায় এসেছিলেন। অনেক দিন পর কাকা’কে আবার আমরা দেখলাম – অনেক ভুলে যাওয়া স্মৃতি মা আর কাকা আলাপ করে গেলেন – তাদের সামনে বসে গল্পের মতো সব অতীত কাহিনী শুনে গেলাম! সেটাই মনে হয় আমার জীবনে প্রথম আনিস কাকা’কে মনে রাখার ব্যাপার, কারণ এর আগেকার আমার সব স্মৃতি কিন্তু উনার বাবা মোয়াজ্জেম দাদা’কে জড়িয়ে ছিলো। আমাদের বাসায় আসা কাকা’কে সম্ভবতঃ আমি প্রথম দেখলাম ঐদিনই – চিনলাম, মনে রাখলাম ‘মোয়াজ্জেম দাদা’র ছেলে’ এই পরিচয়ে যেটা মা বলে দিয়েছিলেন! এর আগে কাকা’কে মনে না রাখবার একটা কারণ হ’তে পারে আমি যে পর্বের স্মৃতি রোমন্থন করলাম এতক্ষণ সেই পর্বে মনে হয় কাকা আর ঢাকা তথা দেশেই ছিলেন না – পিএইচডি করতে দেশের বাইরে ছিলেন বলে আনিস কাকা’র কথা আমি আর ঐ সময়টিতে মনে করতে পারিনা!


এরপর পদ্মা-মেঘনা-যমুনায় বহু পানি গড়িয়ে গেছে – আমরা জীবন-সংগ্রামে রত থেকেছি ক্রমাগত। বেশ কিছু বছর পর একবার বেড়াতে গেলাম চট্টগ্রামে যেখানে আমার চাচাতো বোন ডলি বু’রা থাকতেন আর থাকতো আমার ছোট চাচাতো ভাই রুনু, সে বয়সে আমার থেকে কিছুটা ছোট হলেও আমাদের বরাবরের সম্পর্কটি হ’লো বন্ধুর মতো। আমার ভাই রুনু তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। ছোট বেলা থেকেই শুনে এসেছি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়টি মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা এলাকায় অবস্থিত। সে সময়ে চট্টগ্রামের আরেকটি বৈশিষ্ট্যময় জিনিস ছিল যেটি না দেখে কেউ ফেরত আসতো নাঃ সেটি হ’লো নিউ মার্কেটের চলন্ত সিড়ি মানে এস্কিলেটর! ঢাকা শহরেও তখন এই এস্কিলেটর ছিলোনা! রুনু আমাকে চট্টগ্রামের দ্রষ্টব্য স্থানগুলি দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল সেবার। বোনের বাসায় যাবার দু’দিনের মধ্যে রুনু ঠিক করলো পরদিন সকালে আমাকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় দেখাতে নিয়ে যাবে। ট্রেনে করে শহর থেকে বহু দূরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হয় – মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মধ্য দিয়ে ট্রেনে চেপে যেতে খুব ভালো লাগছিল। ওদের স্টেশনে নামবার পর রুনু আমাকে একটা ভবনের দুই কি তিন তলায় নিয়ে গেল।


এরপর একটা কক্ষের সামনে দাঁড়াতে বললো আমায়! জিজ্ঞেস করলাম ‘এখানে এনেছো কেনো?’ রুনু বললো” ‘আনিস কাকা’র সাথে দেখা করবেন না?’ আমার মনেই ছিলো না তখন যে আনিস কাকা এই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষকতা করেন! সুযোগটি পাওয়াতে খুশিই হলাম। রুনু আমাকে কক্ষের সামনে দাঁড় করিয়ে দরোজা গলে ভিতরে ঢুকলো ও কিছুক্ষণ পরে বেরিয়ে এসে বললো যে ‘কাকা টিচারদের সাথে মিটিং করছেন, বলেছি ঢাকা থেকে আপনি এসেছেন – কাকা ভিতরে যেতে বলেছেন!’ কাকা ব্যস্ত মানুষ, তার উপরে মিটিং-এ আছেন ভেবে কাকাকে বিরক্ত করতে সঙ্কোচ বোধ করছিলাম। রুনু ঠেলেই আমাকে ঢুকিয়ে দিলো ঘরের মধ্যে! কাকাকে দেখেই সালাম দিয়ে দাঁড়ালাম! কাকা জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কবে এসছো? ভাবী কেমন আছেন?’ –আমাকে উনার সামনে এসে বসতে বললেন। আমি উত্তর দিতে দিতে কাকা’র সামনে গিয়ে বসলাম! বুঝলাম উপস্থিত সবার চোখ আমার উপর নিবদ্ধ যে ‘কোন মহারথী এলো রে বাবা যে আমাদের মিটিং-টাই বন্ধ করে দিল!’ কাকা এবার উপস্থিত শিক্ষকদের দিকে তাঁকিয়ে বললেন ‘ঠিক আছে – আজ আর কিছু হবেনা – ঢাকা থেকে সিরাজ ভাই’র ছেলে এসছে – আমি এখন ও’কে সময় দেবো – আমরা কালকে বসবো’! সকলে উৎসুক দৃষ্টিতে মনে হ’লো আমাকে দেখছে! (আমার এই একই রকমের অভিজ্ঞতা আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যারের সাথেও) যাইহোক, সবাই চলে গেলে কাকা আমাদের সকলের কথা – আমার পড়া-লেখা – ভবিষ্যৎ উদ্দেশ্য-বিধেয় নিয়ে প্রশ্ন করলেন।


এক পর্যায়ে আমি আনিস কাকা’র কাছ থেকে বিদায় নিতে গেলে বললেন, ‘মানে? তুমি এদ্দুর থেকে এসছো – আমার সাথে দেখা করেই চলে যাবে – চাচী’র সাথে দেখা করবে না – আমার বাসায় থাকবে না দু’দিন? সেটা কি হয়! ভাবী শুনলে কি বলবেন?’ বলেই ফোন তুলে বাসায় কাকী’কে জানিয়ে দিলেন ‘সিরাজ ভাই’র ছেলে সেলিম এসেছে – আমার এখানে আছে – এখন তোমার কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছি। ওকে বাসায় নিয়ে যেতে হবে – আমাদের ওখানে থাকবে দু’দিন’! বলেই রুনু’কে বললেন ‘তুমি তো চিনবে তোমাদের কাকী কোথায় বসেন’ – বলেই ওকে বুঝিয়ে দিলেন কাকী’কে পেতে কোথায় যেতে হবে। আমি তো প্রমাদ গুনলাম! ভাবলাম চট্টগ্রাম এসেছি নিজের মতো ঘুরে ফিরে বেড়াবো – গল্প-গুজব করবো – উত্তপ্ত রাজনৈতিক বিতর্ক চলবে দিন রাত – না! কিন্তু পুজনীয় কাকা’র ডেরায় বন্দী থাকতে হবে! ভয়ই পেয়ে গেলাম! যাই হোক নীচে কোনো এক জায়গায় কাকী কাজ করেন – আমাদের দেখে সাদরে গ্রহণ করলেন। খুব খুশি হলেন – মা এবং আমাদের সবার কথা জিজ্ঞেস করলেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে – আব্বার কথা অনেক বললেন। আমি অনেক সাহস ক’রে বললাম ‘কাকী! এসেছি মাত্র কয়েকটা দিনের জন্য – চট্টগ্রাম এই প্রথম এলাম (যদিও সেটা ছিল আমার দ্বিতীয় সফর) একটু ঘুরে টুরে দেখাবে বোন ও ভাইরা তাই এখানে দু’দিন থাকলে তো আমার সেট করা প্রোগ্র্যাম আপ-সেট হয়ে যাবে যে, তা-ই কাকা’কে একটু বুঝিয়ে বলেন এবার আর আমি এখানে থাকবো না – পরে অন্য কোনো সময় এলে নিশ্চয়ই আপনার এখানে দু’দিন আমি থেকে যাবো। কাকী কিছুতেই মানতে চাইছিলেন না। বললেন, “তুমি সিরাজ ভাই’র ছেলে চট্টগ্রাম এসে আমাদের বাসায় থাকবেনা সেটা কি করে হয় – ভাবী’র (মানে আমাদের মা) কাছে কি জবাব দেবো?”


যাইহোক, জান বাঁচানো ফরজ!! তাই সত্য মিথ্যা মিলিয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে বহু কিছু বলে কাকা’র বাসায় থাকার ব্যাপারটি আঁটকাতে পারলাম। এরপর এলো দুপুরে খাবার বিষয় – এটাতেও আমাকে ‘কাট’ মারতে হবে কারণ বাইরে আমাদের নিজেদের মতো ঘোরাঘুরী করার পরিকল্পনা আছে সেটায় পিছিয়ে যাচ্ছি দেখে আবার কাকী’কে বললাম আজকের মতো আমাদের বিদায় দিতে, কারণ আমরা অন্য রকম পরিকল্পনা নিয়ে বেরিয়েছি – আর বেশিক্ষণ এই বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় থাকবো না – আমাদের খুব শিগগিরই শহরে ফিরে যেতে হবে। কাকী মানতে চাইলেন না – তবে বহু কথা খরচ করে রাজী করিয়ে ফেললাম ঠিকই। কাকী টেলিফোনে কাকা’কে আমার চলে যাবার কারণ জানালে আমি ফোনে কাকা’র কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কাকাকে সালাম জানিয়ে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলাম সেবার!


আনিস কাকা’র সাথে আমার আরো ঘনিষ্ঠভাবে দেখা-সাক্ষাত হয় আরো কয়েক বছর পর! ততদিনে আমি পড়া-লেখা শেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী হয়েছি। এদিকে ১৯৭৬ সাল থেকে আমাদের বাবা’র কর্মময় জীবনের উপর স্মৃতি-গ্রন্থ বের করবার একটি উদ্যোগ নেন আব্বা’র সহকর্মী ইত্তেফাকের কার্য-নির্বাহী সম্পাদক জনাব আসফউদ্দৌলা রেজা কাকা ও ইত্তেফাকের তৎকালীন সাহিত্য সম্পাদক – আব্বার স্নেহধন্য প্রাক্তন ছাত্রলীগ নেতা জনাব আল্‌-মুজাহিদী এবং আমাদের মেজ ভাই দৈনিক ইত্তেফাকে কর্মরত শাহীন রেজা নুর। এই তিনজনের নামে “শহীদ সিরাজুদ্দীন হোসেন স্মৃতি পরিষদের” লেটার হেড-এ একটি চিঠি ছাপানো হলো এবং আমার বাবা’কে চিনতেন – জানতেন এরকম এক শ’রও বেশী ব্যক্তিত্বদের বাছাই করে আমরা প্রত্যেক ভাই সেই চিঠি পৌঁছে দিয়ে এবং ক্রমাগত তাগাদা দিয়ে পুরো আশির দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত অনেকগুলি লেখা জোগাড় করতে সক্ষম হলাম।


এতে লাভ হ’লো এটা: এইসব লেখা থেকে আমাদের বাবা’র এমন একটি অবয়ব বেরিয়ে এলো যার অনেকটাই আমাদের কাছে ছিলো অজানা! ঘরের বাইরে আমাদের বাবা’র কর্মযজ্ঞ বিষয়ে আমদের জ্ঞান স্বাভাবিকভাবেই ছিল খুবই সীমিত। এতোগুলি লেখা থেকে আমাদের বাবা সিরাজুদ্দীন হোসেন অন্য এক মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠলেন! বই আকারে এই লেখাগুলি প্রকাশ করাটি তখন আমাদের জন্য হয়ে দাঁড়ালো একটি অবশ্য কর্তব্য বিষয়! এখন সমস্যা হলোঃ লেখা তো জোগাড় হলো কিন্তু এই বই প্রকাশের অর্থ আমরা কোথায় পাবো? আর্থিক অনিশ্চয়তার কারণে বেশ কয়েক বছর এই লেখগুলি ফাইল বন্দী হয়েই রইলো, যেটা আমার কাছে ছিলো চরম বিরক্তিকর ব্যাপার।


এদিকে আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকে ঠিক করা হলো আব্বা’র উপরে প্রকাশিতব্য বইটি সম্পাদনা করবেন আনিস কাকা। কাকাকে জানানো হলো - পান্ডুলিপি পৌঁছে দেয়া হলো; কাকা ভীষণ আগ্রহ নিয়ে কাজটির দায়িত্ব নিলেন আমার মায়ের একটি ফোন কলেই! বই প্রকাশের কোনো তহবিল না থাকায় বইটি আর ছাপাখানায় পাঠানো যাচ্ছিলো না – আনিস কাকারও আর কিছু করার ছিলোনা। যাইহোক, বছর দুয়েক যুক্তরাষ্ট্রে থেকে আমি অস্থিরতায় ভুগছিলাম কত তাড়াতাড়ি আব্বা’র উপরে প্রকাশিতব্য বইটি ছাপাখানায় পাঠানো যায়। ভাইদের সাথে আলাপ করে বই প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিয়ে ১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা গেলাম। যেদিন বিকালে গিয়ে আমরা ঢাকা নামলাম তার পরেরদিনই সকালে ঘরে নাস্তা খেয়েই বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ার্টারে কাকার বাসায় চলে গেলাম। কাকা ততদিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে যোগ দিয়েছেন। উনি আগে থেকেই জানতেন যে আমি এবার এসেছি বইটি বের করবার জন্য। আনিস কাকা আমার জন্য বসেই ছিলেন! আমাকে দেখে বসতে বলে মেয়েকে পান্ডুলিপি’র ফাইলটি আনতে বললেন। কাকীকে বললেন আমাদের নাস্তা দিতে। মৃদুভাবে ‘নাস্তা খেয়ে এসেছি’ বলে কাকা-কাকীর অনমনীয়ভাব দেখে এবার চেপে গেলাম। অল্প একটু খেয়েই কাকা’কে জানালাম এবার আমরা বেরিয়ে যেতে পারি! আমি তখন বই প্রকাশের আনন্দে উত্তেজনায় কাঁপছি! রাস্তায় এসে আমরা দু’জনে রিক্সা নিলাম – কাকা রিক্সাওয়ালাকে বললেন “বাংলা একাডেমী”!


আমি একটু অবাক হলাম – বই প্রকাশ করতে বাংলা একাডেমী যাবো কেনো? কাকা যে বাংলা একাডেমী’র সভাপতি এবং বাংলা একাডেমী যে বইও প্রকাশ করে সেসব কথা আমার মাথায় খেলছিলো না! যদিও বইটি বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত হয়নি তবে বাংলা একাডেমী’র প্রেস ম্যানেজার জনাব আশফাকের তত্বাবধানে প্রকাশ করিয়েছিলেন কাকা। চাচা-ভাতিজা আমরা দু’জনে রিক্সায় করে বেশ কিছুক্ষণ সময় নানা বিষয়ে আলাপ করতে করতে বাংলা একাডেমী গিয়ে পৌঁছালাম। প্রেস ম্যানেজারের কক্ষে ঢুকে দেখি ওখানে তিন জন বসে আছেন – যাদের মধ্যে আছেন আমার বাবা’র বন্ধু ও বাংলা সাহিত্যের আরেকজন স্বনামধন্য অধ্যাপক জনাব মুস্তাফা নুরুল ইসলাম। আনিস কাকা আমার সাথে অধ্যাপক ইসলামের পরিচয় করিয়ে দিতেই উনি চেয়ার থেকে উঠে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন – কি করছি – না করছি ইত্যাদী নানা প্রশ্ন করলেন।


কাকা জানালেন ‘সিরাজ ভাই’র উপরে ওরা একটি স্মৃতি-গ্রন্থ বের করছে – আমি সম্পাদনা করছি, কিন্তু এরমধ্যে আপনার লেখা তো নেই! আমি আশফাক’কে দিয়ে কাজটি করাবো তাই এখানে নিয়ে এসেছি – আপনি একটা কিছু লিখে আশফাকের কাছে পাঠিয়ে দেবেন।‘ মুস্তাফা নুরুল ইসলাম কথা রেখেছিলেন এবং উনার বন্ধু – আমাদের বাবা শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের উপর একটি চমৎকার লেখা দিয়েছিলেন। এভাবে কাকা আশফাক সাহেবের হাতে আমাকে হাওলা করে দিয়ে জানালেন ‘সেলিম মাঝে সাঝে এসে তোমার সাথে যোগাযোগ করবে – আর তোমার দরকার হলে আমার সাথে যোগাযোগ করে নেবে’! এভাবে বহুদিন পর বইয়ের কাজ শুরু হয়ে গেলো!


বইটি বের করতে বেশ কয়েক মাস লেগে গিয়েছিল। আমি প্রতিদিন সকালে বাংলা একাডেমী গিয়ে আশফাক সাহেবের সাথে কথা-বার্তা বলে কাজের অগ্রগতি শুনে নিয়ে এই বাংলা একাডেমীর লাইব্রেরিতে গিয়ে ষাটের দশকের ইত্তেফাক কপি নিয়ে বসতাম, বিকাল পর্যন্ত কাজ করতাম! আমাদের বাবা সিরাজুদ্দীন হোসেনের সমস্ত রাজনৈতিক লেখা – প্রতিবেদনগুলি হাতে লিখে কপি করাটাই ছিল আমার কাজ। একদিন আমার বন্ধু পাপ্পু বললো সারাদিন ধরে পুরনো দিনের কাগজ থেকে হাতে লিখবার এই পদ্ধতীতে আমার এক জনম লেগে যাবে এই লেখাগুলি জোগাড় করতে, তাই বুদ্ধি দিল উপর থেকে অনুমতি নিয়ে ফটোকপি মেশিন একাডেমীতে এনে কপি করলে দু’দিনেই কাজ হয়ে যাবে! কথাটি আমার মনে ধরলো। বাংলা একাডেমীর লাইব্রেরিয়ানের কাছে গিয়ে জানতে চাইলাম এটা করা যায় কি-না! আমার কাজের ক্ষেত্র যে আমাদের বাবা সিরাজুদ্দীন হোসেন সেটা জেনে মনে হলো লাইব্রেরিয়ান সাহেব সহানুভুতিশীল হলেন! বললেন, ‘আনিস স্যার তো চেয়ারম্যান একাডেমী’র! আপনার চাচা হন। উনার কাছ থেকে একটি পারমিশন নিয়ে আসেন – তাহলেই ফটোকপি মেশিন এনে কাজ করতে পারবেন – আমি অনুমতি দিয়ে দেবো’। যেই কথা – সেই কাজ! আনিস কাকা’কে ফোন করে আমার উদ্দেশ্য জানালাম। কাকা বললন, ‘ঠিক আছে! আমি এখনই লাইব্রেরিয়ানকে বলে দিচ্ছি! – তুমি ফটোকপি মেশিন নিয়ে এসে কাজ করো!’ আমার ছোট মামার ছেলে ফারুক তখন একটি ফটোকপির দোকানে কাজ করতো। ব্যাস, ওকে কাজে লাগিয়ে ফটোকপি মেশিন ভাড়া করে ফেললাম! দিন দুয়েক পরে ভ্যান গাড়িতে করে এক বিরাট ফটো কপি মেশিন এসে লাগলো বাংলা একাডেমী’র লাইব্রেরির নিচের তলায়। দুই দিন ধরে আমি লাইব্রেরি থেকে ষাটের দশকের ইত্তেফাকের ফাইল নামিয়ে এনে আমাদের বাবা সিরাজুদ্দীন হোসেনের সিরিজ লেখা প্রিণ্ট করে নিয়ে আসতে পেরেছিলাম। যার ভিত্তিতে আমরা আমাদের বাবাকে নূতন করে আবিস্কার করতে পেরেছি! আনিস কাকা ছিলেন বলেই হারিয়ে যাওয়া পত্রিকার পৃষ্ঠা থেকে উঠিয়ে আনতে পেরেছিলাম আমাদের বাবা’র অমর কীর্তিগুলিকে!


এরপর থেকে আনিস কাকা-কাকী বেশ কয়েকবার নিউ ইয়র্কে এসেছেন বাঙালি নানা অনুষ্ঠান-আয়োজনে যোগ দিতে। অধিকাংশ সময়ই কাকা থেকেছেন আমাদের সেঝ ভাই ফাহীমের বাসায়। ঘটনা-চক্রে ফাহীম নিউ ইয়র্কের এসব অনুষ্ঠান আয়োজনের সাথে ওতো-প্রতোভাবে জড়িত থাকতো বিধায় কাকা এলে আমরা কাকা-কাকী’কে সময় দেবার চেষ্ঠা করতাম। একবার ফাহীমের বাসায় কাকা – কাকী এসে উঠেছেন – তিনদিনব্যাপী অনুষ্ঠান লাগোর্ডিয়া কলেজে। প্রথম দিনের অনুষ্ঠানের পর ফাহীম ফোন করে আমাকে বললো যে পরের দিন ৮টার মধ্যেই ওকে চলে যেতে হবে অনুষ্ঠানে – অনেক কিছু ওখানে সেট করতে হবে কিন্তু কাকাদের ১১টার আগে যাবার দরকার নেই – তাই আমি কি উনাদের ১১টার দিকে নামিয়ে দিয়ে আসতে পারবো কি-না? সাথে সাথেই রাজী হয়ে গেলাম। বললাম, ‘তাহলে কাকা-কাকী’কে আমি সকালেই নিয়ে আসবো – আমার এখানেই নাস্তা করবেন’। আমার স্ত্রী পলি বেশ আয়োজন করে ফেললো আপ্যায়নের। আয়োজন আর শেষ পর্যন্ত নাস্তা’তে সীমাবদ্ধ থাকে নি। বিদেশ-বিভুঁইতে কাকা-কাকীকে দেশী ফ্লেভ্যার দিতে গিয়ে একেবারে ব্রেক-ফাষ্ট ও লাঞ্চের মাঝামাঝি “ব্রাঞ্চে”র আয়োজনই করে ফেললো! কাকা-কাকী এতো আয়োজন দেখে অবাকই হয়েছিলেন – তবে ভীষণ খুশি হয়েছিলেন। খাবার শেষ করার পর চা-পর্বের মুহূর্তে হঠাৎ কাকা’র মনে হ’লো উনার এস্প্রিন ঔষধটা খেতে হবে, ফলে পাঞ্জাবি’র পকেটে হাত দিয়ে ঔষধ খুঁজে পাচ্ছিলেন না বলে বার দুয়েক একবার এ পকেট – আরেকবার ও পকেট করতে গিয়ে হঠাৎ করেই ধাক্কা লেগে চায়ের কাপটি উলটে কাকা’র পাঞ্জাবি’র একটা অংশ ভিজিয়ে দিলো। একটি অনুষ্ঠানে কাকা যাচ্ছেন – তার আগে এই ঘটনা! কাকী খুব আপসেট হলেন – কাকা’কে এত তাড়াহুড়া না করার জন্য বললেন! ঔষধটা জায়গা মতোই পরে পাওয়া গিয়েছিল কিন্তু ক্ষতি হলো পাঞ্জবির। যাইহোক, পলির প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের কারণে সে যাত্রা অবস্থা সামাল দেয়া গেলো। পলি দৌড়ে কিচেনে গিয়ে কয়েক টুঁকরা লেবু কেটে নিয়ে এসে বললো, ‘কাকা! জলদি আমাকে পাঞ্জাবিটা খুলে দেন – চায়ের দাগ পাঞ্জাবি’তে পড়বে না যদি এখনই লেবু ঘষে জায়গাটা ধুয়ে দিতে পারি!’ কাকা পাঞ্জাবি খুলে দিলে পলি বাথরুমে নিয়ে গিয়ে লেবু দিয়ে ঘষাঘষি করে পাঞ্জাবিটা ফেরত এনে দেখালো কাকা-কাকী’কে যে পাঞ্জাবি’তে কোনো দাগ লাগেনি। কাকা-কাকী ভীষণ খুশি হলেন। এরপর পলি পুরো পাঞ্জাবিটা ভালো করে ইস্ত্রী করে দেয়! কাকা বললেন ‘বৌ-মা যে দেখি ম্যাজিক জানে! আমি তো ভাবিই নি যে এই দাগ উঠে যাবে এতো সহজে! মনটা খারাপই হয়ে গিয়েছিল পাঞ্জাবিতে দাগ পড়ে গেছে মনে করে!’ কাকীও উচ্ছসিত প্রশংসা করলেন নাস্তা – আয়োজন- আতিথেয়তা সব কিছুর জন্য।


এরপর আমি কাকা-কাকী’কে গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে চললাম লাগোর্ডিয়া কলেজের অনুষ্ঠানে নামিয়ে দিয়ে আসতে। আমি যদি গাড়ি ড্রাইভ করি তবে আমার অভ্যাস গাড়ি চালানোর সময় গাড়িতে আমার পছন্দের রবীন্দ্র সঙ্গীত সারাক্ষণই বাঁজতে থাকবে – এবং সেটি হতে হবে আদি ও অকৃত্রিম রবীন্দ্র সঙ্গীত – বরীন্দ্র সঙ্গীতের নামে রবীন্দ্র-জ্যাজ বা রবীন্দ্র-বীটল সঙ্গীত নয়! আনিস কাকা গাড়িতে উঠে রবীন্দ্র সঙ্গীতের মূর্ছনা শুনতে পেয়ে খুব খুশি হলেন। বললেন ‘এগুলি কি তোমার পছন্দের না বৌ’মার পছন্দের গান?’ কাকী বললেন ‘নিশ্চয়ই দু’জনের পছন্দের’! আমি হেসে বললাম, ‘কাকী, ঠিকই বলেছেন, আমাদের দু’জনেরই পছন্দের – তবে আমার বেশী!” বলেই সবাই হাসতে লাগলাম। আমি এক পর্যায়ে কাকা’কে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কাকা, এই যে ইদানীং কালে বাংলাদেশে ১লা ২রা – এগুলি ঊঠিয়ে দিয়ে অন্যভাবে শুধু সংখ্যাগুলি বলার চল হয়েছে সংবাদ পাঠে বা অন্যান্য ক্ষেত্রে এটা কতটা সমীচীন আর আগের ফর্মে বলাটা কতটা ভুল ছিল? আর সেটা যদি ভুলই ছিল তবে আপনারা এতদিন সেটি চালিয়ে গেলেন কোনো যুক্তিতে? ইংরেজিতে তো এখনও 1st 2nd চল্‌ চালুই আছে তাহ’লে আমাদেরটায় কি এমন মহা-ভারত অশুদ্ধ হলো’। আনিস কাকার মুখটি একটু মলিন হলো – বললেন, ‘দেশে এখন যে যার মতো অনেক কিছুই করছে – এর কোনো অর্থ হয় না – কিছু একটা করতে হবে করে দিচ্ছে – কেউ কাউকে মানছে না – একটা স্বেচ্ছাচারিতার ব্যাপারে দাঁড়িয়ে গেছে’।


এরপর আমি একটু অন্য প্রসঙ্গে গেলাম! মাত্র এক বছর আগে নিউ ইয়র্কের একটি চক্র, যাদের সম্পর্কে আমি খুব ভালোভাবেই জানি, বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে বিরাট একটি হৈ-চৈ বাঁধানো চোখ ধাঁধাঁনো সারা বাংলাদেশ জুড়ে এক বিশাল পুরস্কার প্রদানের অনুষ্ঠান করার প্রচারণা চালিয়ে গেলো। এবং সেই আয়োজনে কমিটির সদস্য করলো দেশের সব চোখে পড়ার মতো সব বরেণ্য ব্যক্তিত্বদের আর সেইসব নামের মিছিলে সবার উপরে দুইটি নাম ছিল আমার অন্যতম প্রিয় দুই ব্যক্তিত্ব আনিস চাচা ও আমার সাক্ষাত শিক্ষক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী! এই ভন্ডামী’র আয়োজনে উনাদের নাম দেখে আমার মেজাজ গেলো বিগড়ে! আমি এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলাম এর আয়োজকদের কাছে যে এগুলি ফেরেববাজি – আত্ম-প্রচার সর্বস্ব কর্মকান্ড – এগুলি বন্ধ হওয়া উচিত! দেখলাম এই চক্রটি অনেক বড় জাল বিস্তার করেছে এই অনুষ্ঠানটি করবার জন্য – এমন কি আমাকে থামাবার জন্য আমার ভাইকেও লাগানো হ’লো আমার বিরুদ্ধে! আমার আর সহ্য হ’লো না! বিরাট এক ঈ-মেইল লিখে এই আয়োজকদের উদ্দেশ্য-বিধেয় সব জানিয়ে আমার ছোট ভাই প্রথম আলো’তে চাকুরীরত জাহীদ রেজা নূর’কে পাঠিয়ে অনুরোধ করলাম আমার মেইলটি প্রিন্ট ক’রে আমার স্যার সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও আনিস চাচা ও অন্যান্যদের এই চক্রের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানিয়ে দিতে এবং এদের যেন উনারা প্রমোট না করেন। জাহীদ তার সম্পাদক সাহেবকে আমার চিঠি দিলে উনি সেটা প’ড়ে আমার সাথে একমত হলেন! আরও কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে জানালো – উনারাও উদ্যোক্তাদের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছেন ব’লে জানালেন ও আমার বর্ণনামুলক চিঠির জন্য ধন্যবাদ দিলেন! আমার উদ্দেশ্য ছিল কাকা ও আমার স্যার’কে বার্তাটা পৌঁছে দেওয়া এবং জাহীদ সেই কাজটি স্বার্থকভাবেই করেছিল! সিরাজুল ইসলাম স্যারের কাছে আমার কথা বলে চিঠিটি দিলে স্যার হেসে বলেছিলেন ‘আমি ব্যাপারটা আগেই বুঝতে পেরেছি, তাই আমি ঠিক করেছি এর সাথে আমি থাকবো না। তবে সেলিমের সতর্ক-বার্তা পাঠাবার জন্য ধন্যবাদ দিতে বলে আমার কিছু খোঁজ-খবর নিলেন’।


জাহীদ আনিস কাকা’র কাছে একই বার্তা নিয়ে গেলে প্রায় একই প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলো। জাহীদ আমাকে সব জানালো আমি খুশি হলাম! কিন্তু হতাশ হলাম অনুষ্ঠানের দিন ঢাকার মিডিয়াতে এক বিশাল কাভারেজ ও দেখলাম একমাত্র সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যার ছাড়া আমার বার্তার সাথে একমত পোষণকারী সকলেই গিয়েছিলেন আর সেটা দেখে হতাশ হয়েছিলাম। বেশী হতাশ হয়েছিলাম আনিস কাকা’কে ঐ অনুষ্ঠানে দেখে। এবার কাক’কে পেয়ে সরাসরি অভিযোগ করলামঃ “কাকা জাহীদ’কে আপনার কাছে পাঠিয়ে গত বছরের ঐ অনুষ্ঠানের সাথে সম্পর্ক না রাখবার জন্য খবর পাঠয়েছিলাম কিন্তু তারপরেও আপনাকে ওখানে যেতে দেখে আমি ভীষণ হতাশ হয়েছি, কাকা! সাথে সাথেই কাকী বললেন, ‘তোমার কাকা এসব কিছুই বোঝে না – যে-ই যায় তাকেই বিশ্বাস করে আর ভুল করে বসে’! এবার কাকা বললেন, ‘হ্যা, জাহীদ গিয়ে বলেছিল আমাকে, তোমার চিঠিও আমি পড়েছিলাম – এবং অবস্থা কি হ’তে যাচ্ছে সেটাও বুঝতে পারছিলাম! কিন্তু ব্যাপারটা ছিল এত দূর এই নিউ ইয়র্ক থেকে একটা বাঙালী ছেলে এসে দেশে একটা কিছু করতে চাইছে দেখে মনে হয়েছিল এতো কষ্ট ও খরচ ক’রে এসেছে ওদের ফিরাই কি করে? এদিকে আবার অতো-শতো বুঝবার আগেই আমন্ত্রণ গ্রহণ ক’রে যে ওদের “হ্যা” বলে দিয়েছি ব’লে না গিয়ে পারলাম না!


তবে পরে খুব ভালো ভাবেই বুঝতে পেরেছি তুমি ব্যাপারটি খুব ভালোভাবে বুঝেছিলে এবং ঠিক কাজটিই করেছিলে!’ এবার কাকী মুখ খুললেনঃ ‘দেখো গতকাল সারাদিনের অনুষ্ঠান, তোমার কাকা এতদুর জার্নি ক’রে এসেছেন – অসুস্থ্য মানুষ, সময় মতো ওষুধ খেতে হয়, আর দেখো গতকাল দুপুর হয়ে গেছে – আয়োজকদের কাউকেই আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না যে আমরা লাঞ্চের সময় কোথায় যাবো – কোথায় খাবো! নিউ ইয়র্কের বাইরে ত্থেকে ওরা অতিথিদের এনেছে – সকলেই এদিক – ওদিক খুঁজছি আয়োজকদের কিন্তু কাউকেই পাওয়া গেলো না। পরে একটি বাচ্চা ছেলে এসে আমাদের সকলকে নিয়ে পাশে একটি ম্যাগডোনাল্ড’স ছিল সেখানে সবাইকে নিয়ে ঢুকে খেতে বললো’! কাকা যোগ করলেন, ‘ব্যবস্থাপনা এতো খারাপ, আমি খুব হতাশ হয়েছি’!


যাইহোক, ততক্ষণে গাড়ি এসে থামলো জায়গা মতো! আমি জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম অনুষ্ঠানের মুল-আয়োজককে, একদল লোক নিয়ে বক্তৃতা দিয়ে বেড়াচ্ছে। আমি তার দৃষ্টি আকর্ষণ ক’রে বার বার দেখাচ্ছিলাম অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি আনিস কাকা গাড়িতে বসা, এসে নিয়ে যান – ভদ্রলোক আমাকে পুরোপুরি অবজ্ঞা ক’রে গেলেন, মুলতঃ সেই অবজ্ঞাটি দেখানো হ’লো আনিস কাকা ও কাকী’কেই! আমি খুব অপমানবোধ করলাম! চীৎকার ক’রে আয়োজক’কে নাম ধ’রে কয়েকবার ডাকলাম, শুনেও ভদ্রলোক না শুনবার ভান ক’রে অডিটরিয়ামের দিকে হেঁটে চলে গেলেন।


আনিস কাকা-কাকী – অগত্যা সেই অপমান হজম ক’রে নিজেরাই গাড়ি থেকে নেমে আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হেঁটে হেঁটে এগিয়ে গেলেন মিলনায়তনের দিকে। দেখলাম মাঝপথে ভিতর থেকে একজন বেরিয়ে এসে কাকাদের ভিতরে নিয়ে গেল! আমি মনঃক্ষুন্ন হয়ে ঘরে ফিরে এলাম!


কাকা’র এই চির বিদায়কালে বার বার কাকা’র সান্নিধ্যে কাঁটানো আমার কিছুটা সময় চিরকালের স্মৃতি হয়ে রইলো – যা আমার জীবনের এক পরম সম্পদ! কাকা, যেখানে থাকুন – ভালো থাকুন!!


“জীবনেরে কে রুধিতে পারে, আকাশের প্রতি তারা ডাকিছে তাহারে!”


বিবার্তা/জাহিদ

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com