
দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল বিএনপি এখন তিনটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কর্মকৌশল নিয়ে গৃহবিবাদে জড়িয়ে গেছে বলে শোনা যাচ্ছে। এ তিনটি চ্যালেঞ্জ হচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মামলার রায়-পরবর্তী পরিস্থিতি এবং সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে কানাডার আদালতের রায়ের পর করণীয় কী। কিন্তু এ তিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সর্বসম্মত কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না দলটি। বরং যতই সময় যাচ্ছে, কর্মপন্থা নিয়ে দলটিতে মতবিরোধ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দলের নেতাকর্মীদের সক্রিয় এবং ঐক্য গড়তে নানা উদ্যোগ নিলেও তা সফল হচ্ছে না। তারপরও চলমান মামলা ও আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ফের দলের ঐক্য জোরদারের চেষ্টা শুরু করেছেন খালেদা জিয়া।নিষ্ক্রিয় ও দলে সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিতদের তিনি এখন কাছে ডাকছেন।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, একের পর এক সংকটে কঠিন পরিস্থিতির দিকে ধাবিত করছে বিএনপিকে। বলঅ হচ্ছে দলটিকে ৩৯ বছরের ইতিহাসে এমন দুঃসময়ে পড়তে হয়নি। দলের নেতারা দিন কাটাচ্ছেন চরম অস্বস্তিতে। অনেক নেতা হাল ছেড়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছেন। অনেক নেতা মামলায় কাবু। কেউ কেউ জেলে, কেউ আত্মগোপনে, কেউ দলে থেকেও দলে নেই। তারা না পারছেন সরকারবিরোধী কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলতে আবার না পারছেন দল পুনর্গঠন করতে।
বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা বলছেন, বেশ কিছুদিন ধরে বিভিন্ন মহলে আলোচনা আছে যে জিয়া চ্যারিটেবল ও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় শীঘ্রই খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সাজার রায় হতে পারে। সেক্ষেত্রে বিএনপির নেতৃত্বে কে আসবেন তা নিয়েও এক ধরনের শঙ্কা রয়েছে দলে। খালেদা জিয়াকে জেলে পাঠিয়ে বিএনপির একটি অংশকে নিয়ে সরকার আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে কি পদক্ষেপ নেয়া হবে তাও ঠিক করতে পারেনি দলটি।
এ বেসামাল অবস্থায় দলের ঐক্য সুদৃঢ় করার উদ্যোগ নিয়েছেন বিএনপির চেয়ারপারসন। এরই অংশ হিসেবে নিষ্ক্রিয়-সংস্কারপন্থী নেতাদের দলে ডেকে সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন তিনি। এ লক্ষ্যে ধারাবাহিকভাবে নিষ্ক্রিয়-সংস্কারপন্থীদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করে তাদের বিএনপিতে স্বাগত জানাবেন খালেদা জিয়া। এরইমধ্যে সংস্কারপন্থী দুই নেতাকে ডেকে বৈঠক করার মধ্য দিয়ে প্রকাশ্যে এলো তার সংগঠন গোছানোর চিন্তাভাবনা।
গত ২৩ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টায় বৈঠক করেন আলোচিত সংস্কারপন্থী নেতা বিএনপির সাবেক তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক সাবেক সংসদ সদস্য জহির উদ্দিন স্বপন এবং সাবেক সংসদ সদস্য সর্দার সাখাওয়াত হোসেন বকুলের সঙ্গে। গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে আধাঘণ্টাব্যাপী অনুষ্ঠিত বৈঠকে জহির উদ্দিন স্বপন ও সাখাওয়াত হোসেনকে দলে সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান খালেদা জিয়া।
তবে এর আগে দলের একজন বুদ্ধিজীবী জামায়াতবিরোধী বক্তব্য দিয়ে কটু মন্তব্যের শিকার হয়েছিলেন। এ কারণে তিনি বিএনপির ওপর মনোক্ষুণ্ন। তার মান ভাঙানোর জন্য দলের মহাসচিবসহ কয়েকজন ওই বুদ্ধিজীবীর বাসায় গিয়েছিলেন। এছাড়া গত বছর হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পরও জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। যদিও দলে ও দলের মনোভাবাপন্ন বুদ্ধিজীবীদের নানা পরামর্শ ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির পালাবদলের কারণে সে ঐক্য গড়ে তুলতে পারেননি তিনি।
বিএনপি সূত্র জানায়, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তার মামলার পরিণতির বিষয়ে দলের বুদ্ধিজীবী মহলের আলোচনায় বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। মামলার রায়ের আগেই সাজার বিষয়টি আলোচনায় আনায় তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সামনে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, মিথ্যা মামলায় সাজা হলেও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নির্বাচনে শুধু অংশগ্রহণই নয়, বরং নির্বাচন সময়ে দলের ও জোটের নেতৃত্বও দিতে পারবেন। তিনি বলেন, আজকে একটা ধারণা পরিষ্কার করে বলে দেই, বেগম খালেদা জিয়ার যদি সাজা হয়ে যায় তাহলে উনি আর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না- এটা সঠিক কথা নয়। পরিষ্কার করে বলছি, মিথ্যা মামলায় খালেদা জিয়ার যদি সাজাও হয় তাহলে তার জনপ্রিয়তা আরও অনেক বেড়ে যাবে। এটা বাংলাদেশের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত কোন ব্যক্তি আমার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করবেন না। তিনি বলেন, সাজা হলে আমরা আপিল ফাইল করব। আপিল হলো যে বিচার হয়েছে এর ধারাবাহিকতা। তখন আমরা তার জন্য জামিন নেব। বেগম খালেদা জিয়ার সাজা হলেও নির্বাচনে তিনি সরাসরি অংশ নিতে পারবেন। সাধারণত তিন বছর সাজা হলে এমনিতেই তো জামিন হয়। আর সাত বছর সাজা হলে অল্প কিছুদিনের ব্যবধানে জামিন নিশ্চিত হবে। খালেদা জিয়া জেলখানা থেকে আবার মুক্ত হয়ে ফিরে আসবেন। এটাই হলো কথা। কিন্তু এটা নিয়ে নানা ধরনের জল্পনা-কল্পনা কথাবার্তা হচ্ছে।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, যারা আগ বাড়িয়ে খালেদা জিয়াকে প্রিজন ভ্যানে তুলে দিতে চায়, তারা নিকট ভবিষ্যতে রাজনীতিতে বেকায়দায় পড়তে বাধ্য। এটা সরকারের বেলায় যেমন প্রযোজ্য, তেমনি দলের বেলায়ও প্রযোজ্য।
সূত্রমতে, ১১ ফেব্রুয়ারি বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ঢাকা মহানগর কমিটির একটি বৈঠক হয়। বৈঠকে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ জ্যেষ্ঠ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। জানা গেছে, ওই বৈঠকে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের দাবি এবং খালেদা জিয়ার মামলার বিচারের রায় সামনে রেখে কী ধরনের কর্মসূচি দেয়া যায়, তা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়।
এরই মধ্যে আবার কানাডার ফেডারেল আদালত একটি মামলার রায়ে বিএনপিকে সন্ত্রাসী দল হিসেবে উল্লেখ করেছে। এ নিয়ে দলের মধ্যে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। এ রায় দেয়ার পর এখনও করণীয় ঠিক করতে পারেনি বিএনপি।
জানা গেছে, কানাডার আদালতের রায়ের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে বিএনপি। এক্ষেত্রে দলটির কয়েকটি টিম কানাডার প্রবাসী বিএনপি নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। পাশাপাশি রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়া জুয়েল হোসেনের বিস্তারিত বিবরণ সংগ্রহ করার চেষ্টা চলছে। আশ্রয় চাওয়া ব্যক্তির সন্ধান ঠিকঠাক পেলেই কানাডার উচ্চ আদালতে আপিল করার বিষয়টি নিয়ে ভাববে বিএনপি।
বিবার্তা/জিয়া
সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি
এফ হক টাওয়ার (লেভেল-৮)
১০৭, বীর উত্তম সি আর দত্ত রোড, ঢাকা- ১২০৫
ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫
Email: [email protected] , [email protected]