রাজনীতি
বিএনপির সমাবেশ নিয়ে আ.লীগের ‘সুপারিশ’ সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, কিন্তু কেন?
প্রকাশ : ২৮ নভেম্বর ২০২২, ০৮:০৯
বিএনপির সমাবেশ নিয়ে আ.লীগের ‘সুপারিশ’ সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, কিন্তু কেন?
সোহেল আহমদ
প্রিন্ট অ-অ+

নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদ আন্দোলন কর্মসূচিতে গুলি করে নেতা-কর্মীদের হত্যার প্রতিবাদে সেপ্টেম্বর মাসে দেশের ১০ সাংগঠনিক বিভাগে সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছিল বিএনপি। এর মধ্যে আটটি সমাবেশ শেষ করেছে দলটি। আগামী ৩ ডিসেম্বর রাজশাহী বিভাগীয় সমাবেশ। এরপর ১০ ডিসেম্বর রাজধানীর নয়াপল্টনে সমাবেশের মধ্য দিয়ে বিভাগীয় সমাবেশ শেষ করতে চান বিএনপি নেতারা। ইতোমধ্যে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশের অনুমতি চেয়ে পুলিশ কমিশনার বরাবর আবেদনও করেছেন দলটি।



তবে নয়াপল্টনে রাস্তা বন্ধ করে ‘বড় সমাবেশ’ করার ব্যাপারে বিএনপিকে নিরুৎসাহিত করে পুলিশ বলছে, বিকল্প ভেন্যু ঠিক করার জন্য। এরইমধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল নয়াপল্টন নয় বরং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের অনুমতি দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন। এমনকি ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারাও নয়াপল্টন বাদ দিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করার জন্য বিএনপিকে পরামর্শ দিচ্ছেন। তবে এসব কিছুর পরও নয়াপল্টনে সমাবেশ করার ব্যাপারে এখন পর্যন্ত অনড় বিএনপি।



বিএনপির সমাবেশ নয়াপল্টনা না সোহরাওয়ার্দী উদ্যান? এ নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে চলছে রাজনৈতিক মহলে চলছে তুমুল আলোচনা। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে- বিএনপি নয়াপল্টনে সমাবেশ করতে চাইলেও সরকারি দল আওয়ামী লীগ কেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের পক্ষে?


নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ঢাকা বিভাগীয় সমাবেশ করতে চেয়ে গত ১৫ নভেম্বর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এর অনুমতি চায় বিএনপি। সেদিন বিএনপির কয়েকজন নেতা সমাবেশের অনুমতির আবেদন নিয়ে ডিএমপি কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুকের কার্যালয়ে যান। আবেদন জমা দেয়ার পর বিএনপির ঢাকা মহানগর উত্তরের আহবায়ক আমানউল্লাহ আমান গণমাধ্যমকে বলেন, আগামী ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় ঢাকা বিভাগীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। সেই সমাবেশের জন্য আমরা অনুমতি চেয়েছি। তারা বলেছেন, তারা আলাপ-আলোচনা করে সেটা আমাদের জানাবেন।



সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির আবেদন পর্যালোচনা করে দলটিকে সমাবেশের জন্য বিকল্প স্থানের ব্যাপারে মৌখিক প্রস্তাব দেয় পুলিশ। বিশেষত ঢাকার বাইরে টঙ্গী ইজতেমা মাঠ বা পূর্বাচল বাণিজ্য মেলার মাঠে সমাবেশ করার জন্য প্রস্তাব দেয়া হয়। তবে এসব প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে বিএনপি নেতারা বলছেন, ঢাকা বিভাগীয় সমাবেশ অনুমতি না দিলেও নয়াপল্টনে করা হবে।



এ বিষয়ে শনিবার (২৪ নভেম্বর) দুপুরে রাজধানীর ঢাকা ক্লাবে এক অনুষ্ঠান শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, বাধ্য হয়ে সরকার কোথাও অনুমতি দেবে না। সরকার যেখানে ভালো মনে করে সেখানেই অনুমতি দেয়া হয়েছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ছাড়া বড় সমাবেশ সম্ভব নয়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেন্যু বিএনপিই চেয়েছে। ডিএমপি কমিশনার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানই উপযুক্ত মনে করেছেন। এজন্য বিএনপিকে সেখানেই অনুমতি দেয়া হয়েছে। আমাদের কিছু দলীয় প্রোগ্রাম রয়েছে, সেগুলো শেষ হয়ে যাবে। এরপর বিএনপি সেখানে সমাবেশ করতে পারবে। তারা (বিএনপি) কী বলছে, সেটা আমরা জানি না।


এ ঘটনার পর রাতেই বিএনপির প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী বলেন, প্রথমত আমরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের অনুমতি চাইনি। দ্বিতীয়ত, ৮ ও ৯ তারিখে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠনের সম্মেলন আছে। সেখানে ১০ তারিখে আমাদের সমাবেশ করা সাংঘর্ষিক।


এদিকে, রবিবার (২৭ নভেম্বর) আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জানান, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সম্মেলনের তারিখ পিনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। ঢাকায় ১০ ডিসেম্বর বিএনপি সমাবেশ যেন সুষ্ঠুভাবে করতে পারে সেজন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ছাত্রলীগের ৮ ডিসেম্বরের কেন্দ্রীয় সম্মেলন ৬ তারিখে করা হয়েছে বলে জানান ওবায়দুল কাদের।


জানতে চাইলে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ এমপি বিবার্তাকে বলেন, ডিসেম্বরের ১০ তারিখে বিএনপি সমাবেশ করলে আওয়ামী লীগের কোনো অসুবিধা নেই। তারা সমাবেশ পল্টনে করার জন্য অনুমতি চেয়ে পুলিশের কাছে আবেদন করেছেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে তারা সমাবেশ করতে চান। ওখানে তো ৫০-৬০ হাজারের বেশি মানুষ হবে না।


তিনি বলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৮ ডিসেম্বর ছাত্রলীগের সম্মেলন ছিল। ১০ তারিখে যেহেতু বিএনপি'র সমাবেশ; ছাত্রলীগের সম্মেলনের পর দুই দিনে স্টেজ সরানোসহ সমাবেশ করতে বিভিন্ন অসুবিধা হতে পারে। এজন্য ছাত্রলীগের সম্মেলন ৬ ডিসেম্বর এগিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে।


বিএনপি কেন সোহরাওয়ার্দী যেতে চায় না?


বিএনপি নেতারা বলছেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৮ ও ৯ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগের জাতীয় সম্মেলনের তারিখ নির্ধারিত আছে। সমাবেশস্থলে মঞ্চ তৈরিসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে অন্তত এক সপ্তাহ সময় প্রয়োজন। তাই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করলে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির তৈরি হতে পারে। এছাড়া অতীতে নয়াপল্টনেই অনেক সমাবেশ-মহাসমাবেশ শান্তিপূর্ণভাবে হয়েছে। আগামীতেও সেখানে শান্তিপূর্ণ বড় সমাবেশে কোনো সমস্যা হবে না।


দলটির নেতাদের ভাষ্য, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের লেকের পূর্ব পাশে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের সম্মেলনের জন্য মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) ও মহিলা আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। আগামী ২৪ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিলের আগ পর্যন্ত এই মঞ্চেই দলটির অন্যান্য অঙ্গ সংগঠনের সম্মেলন হবে।


এছাড়া সরকার বিএনপিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের এক পাশে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের পাশে সমাবেশের অনুমতি দেয়। যার ফলে মাত্র একটি গেট দিয়ে নেতা-কর্মীদের ভেতরে প্রবেশ করতে হয়। এতে করে নেতা-কর্মীর এক জায়গায় জড়ো হতে সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। উদ্যানের এক পাশে লাখ লাখ নেতা-কর্মীর সমাগম ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বলেও মনে করেন দলটির নেতারা।


বিএনপি নেতারা বলছেন, দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় নয়াপল্টনের সামনে এর আগেও বড় বড় সমাবেশ শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে। উন্মুক্ত জায়গা হওয়ায় চারদিক থেকে লোক সমাগম ঘটানোও সুবিধা। দলেরও কেন্দ্রীয় কার্যালয় হওয়ায় নেতা-কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা থাকে। এছাড়া নির্দিষ্ট গণ্ডির ভেতর সমাবেশ করলে সরকারের ওপর তুলনামূলক কম চাপ পড়ে। যার কারণে রাজপথই প্রাধান্য দিচ্ছে দলটি।


সমাবেশের অনুমতি চেয়ে পুলিশের কাছে করা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, নয়াপল্টনে এর আগেও বিএনপির সব সমাবেশ সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণভাবে করেছে।


যা ভাবছে আওয়ামী লীগ:


ডিসেম্বরের ১০ তারিখে ঢাকায় বিএনপির সমাবেশ নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, বিএনপির সমাবেশ নাকি ১০ লাখ মানুষ আসবে। নয়াপল্টনের মতো জায়গায় ১০ লাখ মানুষের জমায়েত হলে রাস্তায় যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটবে। বড় জমায়েত করার জন্য সবচেয়ে ভালো জায়গা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করলে লোকজন কম হবে, সেই কারণে যেতে চাচ্ছে না।


নগরে জনদুর্ভোগের কথা মাথায় রেখে বিএনপিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানই বেছে নেয়া উচিত। রাজধানীর জনদুর্ভোগ লাঘবে নভেম্বর মাসে পরপর কয়েকটি সমাবেশ ও মহাসমাবেশ করেছে আওয়ামী লীগ। সরকার সমাবেশের সুযোগ করে দেয়ার পর বিএনপির অসুবিধা কোথায়- এমন প্রশ্ন তাদের।


ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বলছেন, বিএনপি নেতারা নয়াপল্টনে সমাবেশ করে জনজীবন বিপর্যস্ত করে সরকারকে বিব্রত করতে চায়। তবে যে কোনো নাশকতা হলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না বলে সতর্ক করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।


আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক বিবার্তাকে বলেন, রাস্তায় জনদুর্ভোগ করে কেনো সমাবেশ হবে? যেখানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মতো মাঠ আছে। এরকম খোলা জায়গা ছেড়ে তারা কেন রাস্তায় আসবে? রাস্তায় কোনো সুযোগ দেয়া হবে না। পাবলিকের সমস্যা হয় এমন কোনো কাজ করতে দেয়া হবে না।


এর আগেও নয়াপল্টনে বিএনপি শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ করেছে- বিএনপি নেতাদের এমন দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, এর আগে আর এখন তো কোনো কথা না। এর আগে অন্যায় করেছে, এখন আবার করবে এমন তো হবে না।


বিবার্তা/সোহেল/রোমেল

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

পদ্মা লাইফ টাওয়ার (লেভেল -১১)

১১৫, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ,

বাংলামোটর, ঢাকা- ১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2021 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com