ছাত্রলীগের কমিটি বিতর্কমুক্ত হবে কবে?
প্রকাশ : ১৯ নভেম্বর ২০১৯, ১৫:৫৬
ছাত্রলীগের কমিটি বিতর্কমুক্ত হবে কবে?
বাংলাদেশ ছাত্রলীগের লোগো
মহিউদ্দিন রাসেল
প্রিন্ট অ-অ+

নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী তাদের পদ হারান।তাদের জায়গায় ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে আল নাহিয়ান খান জয় ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে লেখক ভট্টাচার্য দায়িত্ব পেয়েছেন।


দায়িত্ব পেয়ে তারা ছাত্রলীগের কমিটি থেকে বিতর্কিতদের বাদ দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন।কিন্তু এ ঘোষণার পরে দুই মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো ছাত্রলীগের কমিটি থেকে বিতর্কিতদের বাদ দেয়া হয়নি।এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ছাত্রলীগের পদবঞ্চিতরা।



আওয়ামী নেতাদের সাথে বৈঠকে ছাত্রলীগের পদবঞ্চিতরা


জানা গেছে, ২০১৮ সালের ১১ ও ১২ মে ছাত্রলীগের ২৯তম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।এ সম্মেলনের আড়াই মাস পর গত বছরের ৩১ জুলাই ছাত্রলীগের সভাপতি পদে রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনকে এবং সাধারণ সম্পাদক পদে গোলাম রাব্বানীর নাম ঘোষণা করা হয়।ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, দ্রুত সময়ের মধ্যে ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ অর্থাৎ শোভন-রাব্বানী পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করার কথা। কিন্তু তারা পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে গড়িমসি করলেন।


প্রায় এক বছর পর চলতি বছরের ১৩ মে ছাত্রলীগের ৩০১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করেন তারা।এ কমিটি ঘোষণার দিন সন্ধ্যায় কমিটিতে বিবাহিত, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী, চাকরিজীবী ও বিভিন্ন মামলার আসামি রয়েছেন অভিযোগ এনে তা পুনর্গঠনের দাবিতে মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলন করতে যান কমিটিতে স্থান না পাওয়া কিংবা প্রত্যাশিত পদ না পাওয়া নেতারা।সেখানে গিয়ে তারা হামলার শিকার হন।এরপর তারা হামলার বিচারসহ কমিটির বিতর্কিতদের বাদ দিতে আন্দোলন শুরু করেন। আন্দোলনের অংশ হিসেবে তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে অবস্থান কর্মসূচিতে বসেন।


এ প্রেক্ষিতে গত ১৫ মে শোভন-রাব্বানীকে গণভবনে ডেকে নিয়ে কমিটি থেকে বিতর্কিতদের বাদ দিতে নির্দেশ দেন ছাত্রলীগের সাংগঠনিক প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।এ নির্দেশনার পর শোভন-রাব্বানী সংবাদ সম্মেলন করে পদপ্রাপ্ত ১৬ জন বিতর্কিত ছাত্রলীগ নেতার কথা জানান।আর এ বিতর্কিতদের নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করতে ২৪ ঘণ্টার সময়ও বেঁধে দেন তারা।কিন্তু এ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অভিযুক্তরা নির্দোষ নাকি দোষী সেব্যাপারে কিছুই জানায়নি শোভন-রাব্বানী।


এ ঘটনায় ক্ষুদ্ধ হয়ে পদবঞ্চিতরা তাদের অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যেতে থাকে।কর্মসূচি চলাকালে টিএসসিতে ‍দ্বিতীয়বারের মতো হামলার শিকার হন তারা। এরপরও তারা কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার এক পর্যায়ে আওয়ামী নেতাদের আশ্বাসে আন্দোলন স্থগিত করেন তারা।পরে ২৯ মে ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক কেন্দ্রীয় কমিটির ১৯টি পদ শূন্য ঘোষণা করেন।কিন্তু এ পদগুলোতে কারা বাদ গেছেন, তা প্রকাশ করেননি তারা।


এরপর শোভন-রাব্বানী পূর্ণাঙ্গ কমিটিকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দেয়ার কর্মসূচি ঘোষণা করলে ২৬ মে ফের অবস্থানে ফেরে পদবঞ্চিতরা।১৯টি পদ শূন্য পদে কারা বাদ গেছেন তাদের নাম-পদবি প্রকাশসহ বিতর্কিতদের বাদ দিতে রাজু ভাস্কর্যে অবস্থান করেন তারা।টানা ৩৩দিন তারা সেখানে অবস্থান করেন।এমনকি তারা ঈদুল ফিতরও সেখানে উদযাপন করেন।৩৪তম দিন থেকে তারা আমরণ অনশনে যান।অনশনে যাওয়ার কয়েকদিনের মধ্যে তাদের অনেকে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন।


এ প্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের আহ্বানে আওয়ামী নেতাদের সাথে বৈঠকে বসেন তারা।বৈঠকে বিতর্কিতদের বাদ দেয়ার আশ্বাস পেয়ে অনশন ভেঙে আন্দোলন স্থগিত করেন তারা।



আমরণ অনশন পালনকালে ছাত্রলীগের পদবঞ্চিতরা


ছাত্রলীগের কমিটিতে বিতর্কিতদের পদায়ন, আওয়ামী সিনিয়র নেতাদের অসম্মান, আর্থিক লেনদেনসহ বেশকিছু অভিযোগ ওঠে শোভন-রাব্বানীর বিরুদ্ধে।এতে ক্ষুদ্ধ হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১৪ সেপ্টেম্বর ছাত্রলীগের শীর্ষ পদ থেকে শোভন ও রাব্বানীকে সরিয়ে দেন।একইদিন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে আল নাহিয়ান খান জয়কে ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে লেখক ভট্টাচার্যকে দায়িত্ব দেয়া হয়।নতুন এ নেতৃত্বকে স্বাগত জানিয়েছিল ছাত্রলীগের পদবঞ্চিতরা।নতুন নেতৃত্ব জয়-লেখকও কমিটি থেকে বিতর্কিতদের বাদ দিবেন বলে পদবঞ্চিতদের আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের দায়িত্ব নেয়ার দুইমাস পেরিয়ে গেলেও এখনো বিতর্কিতদের বাদ দেননি।আর এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পদবঞ্চিতরা।


ছাত্রলীগের সাবেক কমিটির উপ-দফতর সম্পাদক নকিবুল ইসলাম সুমন বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে যোগ্যদের মূল্যায়ন করতে পদবঞ্চিতদের আন্দোলনে ছিলেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বিবার্তাকে বলেন, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ জাতির পিতার নিজ হাতে গড়া পবিত্র সংগঠন।যে সংগঠনের রয়েছে হাজারো ত্যাগ-তীতিক্ষা ও আত্মদানের ইতিহাস। সেই রকম একটি পবিত্র সংগঠনকে টাকা এবং অনৈতিক সুযোগ সুবিধার বিনিময়ে বিতর্কিত লোকজন অনুপ্রবেশ করিয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে কলুষিত করেছিল শোভন-রাব্বানী।যার দরুণ আমাদের নেত্রী ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে তাদের সংগঠন থেকে সরিয়ে দেন।


নকিবুল ইসলাম সুমন আরো বলেন, নতুন ভারপ্রাপ্তরা এসেছেন।আমরা তাদের সাথে একাধিকবার কথা বলেছি সংগঠনকে বিতর্কমুক্ত করতে।তারা আমাদের কথাও দিয়েছিলেন, অচিরেই তারা বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে যোগ্যদের মূল্যায়ন করবেন। কিন্তু ২ মাস পেরিয়ে গেলেও তারা সে কথা রাখতে পারেননি। অথচ তারা বিতর্কিতদের নিয়ে চলাফেরা করছেন, প্রোগ্রাম করছেন। যদি তারা ভেবে থাকেন, জাতির পিতার পবিত্র সংগঠনে বিতর্কিতদের বৈধতা দিবেন, সেটা কখনোই যারা সংগঠনকে মনে প্রাণে ভালোবাসেন, তারা মেনে নেয়নি, আর নিবেও না।


তিনি বলেন, বর্তমান ছাত্রলীগের যে নাজুক অবস্থা, সেটা আমরা অতীত ইতিহাসে কখনো দেখিনি।মিছিল-মিটিং কম, মধুর ক্যান্টিনে কেন্দ্রীয় নেতাদের অনুপস্থিতি, চেইন অব কমান্ডের অভাব, কেন্দ্রের সাথে জেলা, মহানগর বা অন্যান্য ইউনিটের যোগাযোগ নাই বললেই চলে।দীর্ঘদিন সকল ইউনিটের কোনো কমিটি হয় না, সেগুলোতে নতুনভাবে কমিটি করার নাম গন্ধও নাই। একটি ঐতিহ্যবাহী সংগঠন এইভাবে চলতে পারে না।যদি ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এ সকল সমস্যার সমাধান করতে না পারেন, তাহলে সম্মেলনের মধ্য দিয়ে নতুন নেতৃত্বের বিকল্প কিছু দেখছি না। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, মমতাময়ী নেত্রী (শেখ হাসিনা) এসকল বিষয় ওয়াকিবহাল আছেন, তিনিই অচিরেই ছাত্রলীগের ব্যাপারে সময়ের সঠিক সিদ্ধান্তটি নিবেন।


বিতর্কিতদের বাদ দেয়ার বিষয়ে ছাত্রলীগের বিগত কমিটির কর্মসূচি ও পরিকল্পনা বিষয়ক সম্পাদক ও পদবঞ্চিতদের নিয়ে গড়ে ওঠা আন্দোলনের মুখপাত্র রাকিব হোসেন বিবার্তাকে বলেন, ছাত্রলীগের কমিটি বিতর্কমুক্ত করা হবে বলে বারবার আশ্বাস দেয়া হলেও এখনো বিতর্কমুক্ত না হওয়ায় ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে।আমরা আশা করি, ছাত্রলীগের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সব ধোঁয়াশা কাটিয়ে কমিটিকে বিতর্কমুক্ত করবেন।এক্ষেত্রে যারা পদবঞ্চিত হয়ে আন্দোলন করেছেন, যোগ্যতার ভিত্তিতে তাদের মূল্যায়ন করতে হবে। কেননা, তারা নৈতিকভাবে শক্ত থাকায় আন্দোলন করতে পেরেছে।


বিতর্কিতদের বাদ দেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় বিবার্তাকে বলেন, একটা বিশেষ পরিস্থিতির মধ্যে আমাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আমরা কমিটি থেকে বিতর্কিতদের বাদ দেয়ার জন্য কাজ করতেছি।খুব শিগগিরই বিতর্কিতদের কমিটি থেকে বাদ দেয়া হবে।


বিবার্তা/রাসেল/উজ্জ্বল/জাই


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com