বাংলাদেশি ট্যুরিস্ট ও স্থানীয় মানুষ
প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০১৭, ১৯:১০
বাংলাদেশি ট্যুরিস্ট ও স্থানীয় মানুষ
সারাফাত রাজ
প্রিন্ট অ-অ+

দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থানে ঘোরাঘুরি করা আমার নেশা। দেশ-বিদেশ বলতে অবশ্য আবার আমেরিকা-ইউরোপ ভেবে বসবেন না যেন। এখন পর্যন্ত আমার দৌড় অবশ্য শুধু ভারত পর্যন্ত।


এই ‘দেশ বিদেশ’ চলার পথে আমার সাথে অনেক মানুষের পরিচয় হয়েছে, নানা রকম অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছি। এদের অনেকের কাছে বড় মুখ নিয়ে বাংলাদেশের গল্প করেছি, গর্ব করেছি, দেশে বেড়াতে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছি। কিন্তু সত্যি বলতে পরক্ষণেই বুকের মাঝে একটা অস্বস্তির তোলপাড় অনুভব করেছি। কেননা অপ্রিয় হলেও সত্য যে, বাংলাদেশ এখনও পর্যটকবান্ধব দেশ হতে পারেনি।


কথাটা বলতে খুব কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে যে, পর্যটক হিসাবে অধিকাংশ বাংলাদেশীরা এখনও ন্যূনতম মান অর্জন করতে পারেনি। স্বাভাবিক সৌজন্য ও মানবিক আচরণ আমাদের মধ্যে নেই বললেই চলে। পাশাপাশি একটা অপরিচিত অঞ্চলের মানুষকে এবং তাদের প্রচলিত রীতিনীতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে সম্মান করার যে স্বাভাবিক বৈশিষ্ট, তা থেকেও আমরা যথেষ্ট দূরে আছি।


নিজের অনাকাঙ্ক্ষিত অভিজ্ঞতা থেকেই কিছু উদাহরণ দিই :


০১.
একবার ভার্সিটি থেকে শিক্ষাসফরে গিয়েছিলাম। ওই প্রথম আর ওই শেষ, বিরাট শিক্ষা হয়ে গিয়েছিলো। ফেরত এসে কানে ধরেছিলাম।


জায়গাটা ছিলো লাউয়াছড়া উদ্যান। এটা একটা বন, যার শরীরকে ভাগ করে রেলপথ চলে গেছে, ওখানে আছে ছোট ছোট টিলা, ঝিরিপথ আর আদিবাসীদের গ্রাম। যদিও আমি তার কিছুদিন আগেই বান্দরবান ঘুরে এসেছি এবং এরপর লাউয়াছড়া আসাটা আমার কাছে মনে হচ্ছে ফ্যান্টাসি কিংডম থেকে শিশুপার্কে আসার মতো। তারপরও সহপাঠীদের সাথে ঘুরতে যাবার মজাই আলাদা।


তো হঠাৎ দেখলাম আমার বন্ধুরা খুবই উত্তেজিত। তারা একটা বানর দেখেছে এবং দেখার সাথে সাথে তাদের যে ইম্প্রেশন তা এরকম, ‘ওই দেখ বান্দর বান্দর! মার শালারে ঢিল মার!”


একটা ভার্সিটির স্টুডেন্টরা যদি এরকম করে, তাহলে অন্যরা কী করবে!


স্টুডেন্টের কথা বাদ দিই। দুপুরে জম্পেশ খাওয়া-দাওয়া শেষে প্যাকেটগুলো আমাদের টিচাররা ডাস্টবিন নয় এমন জায়গায় ফেললেন আর তাদের দেখাদেখি আমরা কয়েকশো স্টুডেন্টও সেখানেই প্যাকেটগুলো ফেললাম। এভাবে একটা সংরক্ষিত বনাঞ্চলের একটা অংশকে আমরা ডাস্টবিন বানিয়ে রেখে এলাম।


আমরা যখন ফিরে আসছি তখন দেখি সিলেটের কোনো এক কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা শিক্ষা সফরে এসেছে। তাদের সাথে একটা পিক-আপ। সেই পিক আপে ইয়া বড় বড় সাউন্ড বক্স।


একটা সুন্দর সংরক্ষিত বনাঞ্চল, যেখানে কয়েকটা আদিবাসি পাড়া আছে, যেখানে কতোগুলো বিলুপ্তপ্রায় বন্যপ্রাণী কোনো রকমে টিকে আছে, সেখানে এই বড় বড় সাউন্ডবক্সের যান্ত্রিক চিৎকার কী প্রভাব ফেলবে তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হতে হয় না।


০২.
একবার সাত বন্ধু মিলে গেছি বান্দরবান। এতো অসাধারণ অনুভূতি তা বলে বোঝানোর ভাষা নেই। আমার এখনো মন খারাপ হলে আমি চোখ বন্ধ করে এই দিনগুলোর কথা ভাবি।


কেওক্রাডাং পাহাড়ের চূড়ায় উঠেছি, চুড়ার উপরে গোল একটা ছাউনি আছে, আমরা সাতজনই সেই ছাউনির ছাদে উঠে পড়েছি। তারপর চোখ বুজে গভীরভাবে এই নিস্তব্ধতা উপভোগ করছি । হঠাৎ মনে হলো সবগুলো পাহাড় একসাথে গর্জন করা শুরু করেছে।


হয়েছিলো কি, আমাদের দলেরই একজন কেওক্রাডাংয়ে ওঠার আনন্দে বাজি ফোটানো শুরু করেছে। মন চাইছিলো একে যদি এই চূড়া থেকে একদম নিচে ছুড়ে ফেলে দিতে পারতাম!


সেই রাতটা আমরা কেওক্রাডাংয়ের চূড়াতেই ছিলাম। এখনো পর্যন্ত আমার জীবনের সেরা রাত সেটি। এতোটা সৌন্দর্য সহ্য করাও আসলে মুশকিল। তো সেই রাতে সেই বাজি ফোটানো ছেলেটা করল কি, সব জামাকাপড় খুলে একেবারে ন্যাংটা হয়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু করলো। কী বলবো।


বান্দরবানের একটা সম্প্রদায় বাস করতো যাদের মেয়েরা বুকে কাপড় পরতো না (এখনো তারা টিকে আছে কিনা জানি না)। এটা নিশ্চয় তাদের কালচার। তাদের এই সংস্কৃতি তো তারা ঢাকা শহরে দেখাতে আসছে না, বরঞ্চ আমরাই তাদের নিজস্ব গন্ডিতে অনুপ্রবেশ করেছি। তো এরকম একটা এলাকা পার হবার সময় হঠাৎ দেখি, গতোদিনের ন্যাংটা হয়ে দৌড়াদৌড়ি করা ছেলেটা এতো বীভৎসভাবে একজন আদিবাসী নারীর দিকে তাকিয়ে আছে যে সেই নারীটা প্রবলভাবে অস্বস্তিবোধ করছে। শেষ পর্যন্ত এই নারী বাধ্য হয়েছিলো হাত দিয়ে বুক আড়াল করতে।


সারাদিন হেঁটে প্রচন্ড ক্লান্ত হয়ে এক আদিবাসিপাড়ায় পৌছেছিলাম পড়ন্ত বিকালে। গোসল করা খুবই প্রয়োজন হয়ে পড়েছিলো। কারণ, আমরা সবাই ধূলিধূসরিত ছিলাম। এই গ্রামের ঝরনাটা গ্রামের একপাশে একটু নিচের দিকে। ঝরনায় নামার আগে দেখি সেখানে কতোগুলো আদিবাসি মেয়ে গোসল করছে। ইতস্তত বোধ করলাম। কারণ যেখানে কতোগুলো মেয়ে গোসল করছে সেখানে নিশ্চয় যাওয়া উচিত না। ইতস্তত বোধ দেখে মেয়েগুলি খিলখিল করে হেসে উঠলো তারপর তাদের ভাষায় যেটা বললো তা অনেকটা এরকম, ''গোসল করতে এসো, কোনো সমস্যা নেই।'' আমার কানে এখনো সেই মেয়েগুলির হাসি রিমঝিম করে বাজে।


বান্দরবান শহরের সবচেয়ে কাছের ঝরনা বোধহয় শৈল-প্রপাত। জায়গাটা একটা টুরিস্ট স্পটও বটে। এই ঝরনার আশপাশে কতোগুলো আদিবাসি এলাকা আছে। এই এলাকার আদিবাসি মেয়েরা নাকি এখন রাতে গোসল আর খাবার পানি সংগ্রহ করতে আসে। দিনের বেলায় এই ঝরনায় টুরিস্টরা এসে এইসব মেয়েদের এতোটাই বিরক্ত করে যে এখানকার মেয়েরা তাদের জরুরী প্রয়োজন মেটাতে এখন রাতের বেলায় আসতে বাধ্য হয়।


০৩.
টুকটাক কয়েকবার ইন্ডিয়াতে গেছি। কলকাতা যাওয়া তো খুবই সহজ। বলতে খারাপ লাগলেও চরম সত্য যে বাংলাদেশের থেকে অনেক কম খরচে ইন্ডিয়াতে ঘোরা যায়। কলকাতায় ঘুরতে যাওয়া বাংলাদেশী ইয়াং পোলাপানাকে নিয়ে আমার কিছু পর্যবেক্ষণ আছে।


এরা থ্রী-কোয়ার্টার বা হাফপ্যান্ট পরে। গায়ে থাকে সুন্দর টি শার্ট, পায়ে দামী জুতো, চোখে দামী সানগ্লাস, মাথায় ক্যাপ অথবা হ্যাট। গলায় অথবা কোমরে একটা ব্যাগে থাকে পাসপোর্ট ও টাকাপয়সা। কেউ কেউ ''ট্রাভেলার ট্রাভেলার ভাব'' আনার জন্য গলায় গামছা ঝোলায়। এরা নিউমার্কেট এলাকা ছাড়া আর কোথাও উঠে না। কয়েকটা বিখ্যাত খাবার হোটেল আছে যেমন কস্তুরি, রাঁধুনি এই হোটেলগুলিতে খায় আর বলে ‘একদম বাংলাদেশের মতো রান্না’। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সামনে দুই আঙ্গুল উচু করে সেলফি তোলে। বন্ধুরা মিলে একসাথে চায়ের মাটির ভাড় হাতে নিয়ে ছবি তোলে আর ফেসবুকে আপলোড দেয় ‘দাদাদের দেশের এতোটুকুন চা’।


(দুঃখিত, উপরোক্ত বিষয়গুলো কারো সাথে মিলে গেলে অথবা না মিললে আমি একেবারেই দায়বদ্ধ নই। আরো কিছু বিষয় আলোচনা করা যেত কিন্তু সেগুলো আপাতত থাকুক।)


কিন্তু সমস্যা হয় সেসময়, যখন এই সৌখিন টুরিস্টরা বাজেট ট্রাভেলারদের জন্য বিপদ সৃষ্টি করে। ছোট্ট একটা উদহারণ দিই। ধরুন কোন হোটেলের ভাড়া ৩০০ রুপি। কোন একজন ট্রাভেলার সেটা নিয়ে হোটেলওয়ালার সাথে দরদাম করছে। এসময় দুম করে একজন বাংলাদেশী এসে হোটেলওয়ালাকে বলবে আমি ৫০০ দিচ্ছি, রুমটা আমাকে দিয়ে দিন। অথচ ভারতের এক হোটেলে আমি দেখেছি একজন আমেরিকান তার লন্ড্রী খরচ বাবদ কেন ২ রুপি বেশি নেয়া হলো এই নিয়ে হোটেলওয়ালার সাথে তুমুল ঝগড়া করতে। দুজন রাশিয়ানকে দেখেছি ২০০ রুপির গাড়ি ভাড়া ১০০ রুপি নেবার জন্য ড্রাইভারকে রীতিমত হুমকি দিতে, এবং তারা সফলও হয়েছিলো। যেখানে ইন্ডিয়ান যাত্রীরা ২০০ রুপির ভাড়া দিচ্ছে সেখানে তারা ১০০ রুপি ভাড়ায় যাত্রা করলো, শুধু আমাদের বাংলাদেশীদেরই দেখেছি লোকদেখানোর মতো অনেক টাকা।


আমি একজন বাজেট ট্রাভেলার। কলকাতা আমার জন্য দিনদিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে।


০৪.
আচ্ছা, বাংলাদেশের মানুষেরা কেমন? বিপদে পড়লে স্থানীয়রা ঠিক কিভাবে সাহায্য করে? আমি একটি উদহারণ দিতে পারি। দুঃখিত, উদহারণটি ভালো নয়।


একবার আমি আর আমার মামাতো বোন বাসে করে ঢাকা থেকে যশোরে যাচ্ছি। বাইরে বেশ বৃষ্টি হচ্ছে, আমরা দুই ভাইবোন সিটের উপরে মোটামুটি পা তুলে আয়েশ করে গল্প করছি। পাটুরিয়া ঘাটের কিছু আগে বাসটা এক্সিডেন্ট করলো। এতে বাসের সামনের অংশ পুরোপুরি ধসে গিয়ে আগুন ধরে গেল। আহত যাত্রীরা আতঙ্কিত অবস্থায় জানালা দিয়ে লাফ দেয়া শুরু করলো। যেহেতু বাসে বেশ গতি ছিলো এবং সেই গতির কারণে বাস তখনো সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে । লোকজন সেই চলন্ত বাস থেকে লাফিয়ে পড়ছে। আমি দেখলাম, আমার মামাতো বোন আমাদের তিনখানা ভারী ভারী ব্যাগ নিয়ে আমাকে মাড়িয়ে এই জ্বলন্ত বাস থেকে নেমে গেল।


সবাই নেমে যাবার পর আমি ধীরেসুস্থে বাস থেকে নামলাম। আল্লাহর রহমতে আগুন তার তীব্রতা বেশি ছড়াতে পারেনি, কারণ সেসময় খুব জোরে বৃষ্টি হচ্ছিলো।


বাস থেকে নেমে দেখি বীভৎস অবস্থা। বাসের সামনের দিকে যারা বসেছিলো তাদের গায়ে জামা নেই। সুপারভাইজারের অবস্থা বেশি খারাপ, তার জামা তো নেইই, প্যান্টের অবস্থাও খুবই করুণ। সে বেচারা এক যাত্রীর কাছ থেকে লুঙ্গি নিয়ে পরলো। প্রত্যেকটা মানুষ রক্তাক্ত। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা একটা তিন মাস বয়সী বাচ্চার। বাচ্চাটার শরীর পুরো রক্তে ভেসে গেছে। তবে পরে বুঝলাম যে আল্লাহর রহমতে বাচ্চাটার কিছু হয়নি, সে তার নানার কোলে ছিলো। তার নানার কপাল এমনভাবে কেটেছে যে সেই রক্তে বাচ্চাটা পুরো গোসল হয়ে গেছে।


আমি আমার মামাতো বোনের দিকে তাকালাম। তার অবস্থাও ভালো না। যেহেতু সে সিটে পা তুলে বসেছিলো এজন্য পায়ে প্রচন্ড আঘাত পেয়েছে। এখন পা নড়াতে পারছে না। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, তাহলে তখন তুই তিনটা ভারী ব্যাগ নিয়ে আমাকে ডিঙ্গিয়ে নিচে নামলি কিভাবে।


এ সময় গ্রামবাসীরা ছুটে এলো। তারপর তারা সবাই মিলে বাসে উঠে যাত্রীদের যা যা মালপত্র ছিলো সেগুলো গুছিয়ে নিয়ে সুন্দর করে চলে গেল। এটা যে লুটপাট, তা বোঝার আগেই জিনিসপত্র হাওয়া। আর যাত্রীরা বাধা দেবে কি, সবাই তাদের হাত-পা-শরীর সামলাতে আর আহত জায়গাগুলোর রক্তপাত বন্ধ করতে ব্যস্ত।


আচ্ছা, দিনদিন আমরা কি অমানুষ হয়ে যাচ্ছি?


বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনী নিয়ে আমার মনোভাব কখনোই ভালো নয়। কিন্তু ভাগ্যিস, এই সময়টাতে টহল পুলিশের একটা গাড়ি সেখানে উপস্থিত হয়েছিলো। তারা সেসময় সেখানে না এলে যে কি অবস্থা হতো, তা আল্লাহই জানেন।


উপরোক্ত ঘটনাটি আমার ভিজ্ঞতা। কিন্তু নিশ্চয়ই এই উদহারণটি দিয়েই সবাইকে পরিমাপ করা উচিত নয়। বাংলাদেশে অবশ্যই ভালো মানুষ আছে। কেউ বিপদে পড়লে অবশ্যই তাকে সাহায্য করার জন্য মানুষ ছুটে আসে।


০৫.
ভারতের একটা জনপ্রিয় শৈল শহরে গিয়েছি। সঙ্গত কারণেই আমি সেই শহরটির নাম বলবো না। কারণ, আমি চাই না টুরিস্টরা দলে দলে গিয়ে সেই সুবিধা নিক, আর আমার মতো ট্রাভেলাররা পরে গিয়ে সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হোক। তবে বর্ণনার সুবিধার্থে ধরে নিই যে সেই শহরটির নাম সিমলা।


সিমলা শহরের সৌন্দর্য বহুগুনে বাড়িয়ে দিয়েছে এর পাহাড়ী ট্রেন। প্রায় ১৬ দিন উত্তরাখন্ডের বিভিন্ন পাহাড় পরিক্রমা শেষে আমি এসেছি সিমলা শহরে। সারারাত জার্নির পর বাস থেকে যখন নেমেছি তখনো ভোরের আলো ফোটেনি। এসময় অধিকাংশ হোটেল বন্ধ। যে কয়েকটিতে যাবার সুযোগ পেলাম সেখানে যে ভাড়া চায় তা আমি দিতে পারবো কিন্তু আমি দিতে চাচ্ছি না। কারণ, আমি জানি যে আরো কমে ব্যবস্থা করতে পারবো।


শেষ পর্যন্ত বিরক্ত হয়ে রেলস্টেশনে এসে উপস্থিত হলাম। আমি জানি যে স্টেশনে থাকার ব্যবস্থা হয়ে যাবে। তখনো স্টেশন খোলেনি। আমি বাইরের একটা বেঞ্চে বসে চারপাশের প্রকৃতি দেখছি।


প্রায় দু’ঘন্টা পর স্টেশন মুখরিত হলো। কোনো ট্রেন এসে পৌছায়নি কিন্তু স্টেশনের দৈনন্দিন কর্মব্যস্ততা শুরু হয়ে গেছে। ঝকঝকে এই স্টেশনটা আরো তকতকে করে রাখার কাজ শুরু হয়ে গেছে। এই স্টেশনে আমিই একমাত্র ব্যতিক্রম। কয়েকদিনের পথচলায় আমি শ্রান্ত। আমার পোশকআশাকের অবস্থা ভালো না। উত্তরাখন্ডের বৈরী আবহাওয়ার কারণে আমার মুখের চামড়া পুড়ে গিয়েছিলো, সেগুলো এখন খসে খসে পড়ছে। সারারাতের বাসজার্নিতে আমি ক্লান্ত। এখনো পর্যন্ত ফ্রেশ হবার সুযোগ পাইনি। নিশ্চয় আমাকে খুব নোংরা দেখাচ্ছে।


স্টেশনের অফিস খুললে এই অবস্থাতেই আমি চললাম এক অফিসারের সাথে দেখা করতে। আমি যখন অফিসারের কক্ষটিতে উপস্থিত হলাম তখন দেখি, হ্যান্ডসাম এক ভদ্রলোক বসে আছেন। তার পরনে সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট আর কমলা রঙের কেডস। সবকিছু মিলিয়ে চল্লিশোর্ধ ভদ্রলোককে অসাধারণ লাগছে। নিজের মনে তিনি কাজ করে চলেছেন। তিনি নিশ্চয় খুব ভালো সুগন্ধী ব্যবহার করেছেন। তার সৌরভে পুরো কক্ষ সুরভিত হয়ে আছে।


আমি খুবই কুণ্ঠিত হয়ে আছি। আমার পোশাক, আমার শারীরিক অবস্থা, সর্বোপরি আমি সকাল থেকে এখনো মুখে পানি পর্যন্ত দিয়ে একটু ফ্রেশ হতে পারিনি। বিনয়ী কণ্ঠে ((কারণ বাংলাদেশে সারাজীবন দেখে এসেছি যে সরকারি মানুষের সাথে অতিরিক্ত বিনয়ের সাথে কথা বলতে হয়)) তাকে বললাম, আমি আপনাকে কিছু বলতে পারি কি?


ভদ্রলোক আমার দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বললেন, ‘বলুন স্যার, আপনার জন্য কি করতে পারি’।


তার 'স্যার' সম্বোধন আমাকে পুরোপুরি হতভম্ব করে ফেললো, স্বপ্ন দেখছি না তো! তাকে আমার সমস্যার কথা জানালাম। বললাম যে এই শহরে আমি থাকার জায়গা পাচ্ছি না, আমি এই স্টেশনেই থাকতে চাই।


ভদ্রলোক আমার কথা খুবই মনোযোগের সাথে শুনলেন। জানতে চাইলেন যে আমি কোথা থেকে এসেছি। বাংলাদেশ শুনে খুবই খুশি হলেন। কারণ, বাংলাদেশীরা পাকিস্তানিদের সাথে যুদ্ধ করে স্বাধীন হয়েছে।


শেষে বিনয়ের সাথে আমাকে বললেন যে আমি যেভাবে স্টেশনের রুম বুক করতে চাচ্ছি সেরকম নিয়ম এখন আর নেই। এটি এখন পুরোপুরিই অনলাইননির্ভর। তবে তিনি আমার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন। এজন্য আমাকে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে।


ভদ্রলোক সত্যিই অসাধ্য সাধন করেছিলেন। আমি স্টেশনের একটি রিটায়ারিং রুম ২৪ ঘন্টার জন্য বরাদ্দ পেয়েছিলাম নামমাত্র মূল্যে। স্টেশনের দোতলায় পরিচ্ছন্ন একটা কক্ষ, যার জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে অসংখ্য পাহাড় আর সেসব পাহাড়ে ছবির মতো ঘরবাড়ি। ছোট ছোট পাহাড়ি ট্রেন হুইসেল বাজিয়ে স্টেশনে আসছে, ট্রেন থেকে নামছে রঙ্গিন রঙ্গিন পর্যটক। অসাধারণ শৈল শহরে আমার অসাধারণ ২৪ ঘন্টা।


০৬.
একবার সত্যিকারভাবে মন খারাপ হয়েছিলো। উত্তরাখন্ডের বিশাল হিমালয়ের একটা অংশ থেকে বের হয়ে আসার সময় সেখানকার প্রহরী আমার শরীর আর ব্যাগ চেক করেছিলো। তাকে দেখাতে হয়েছিলো যে আমি এই বিশাল অভয়ারণ্যের কোথাও এতোটুকু ময়লা ফেলে আসিনি। গুনে গুনে তাকে দেখাতে হয়েছিলো বিস্কুটের ছেঁড়া প্যাকেট আর পানির খালি বোতল। আচ্ছা কি হতো একটা বিস্কুটের প্যাকেট এই বিশাল পাহাড়ের এক কোণে ফেলে এলে! কিন্তু ভারত সরকার তাতে রাজী নয়। সে একটা প্লাস্টিকের টুকরো ফেলেও হিমালয়কে কলঙ্কিত করার ব্যাপারে খড়্গহস্ত। অথচ আমরা...


তবে আশার কথা, বাংলাদেশের ইয়াং জেনারেশনের একটা অংশ ইকো টুরিজমের ব্যাপারে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।


বিবার্তা/হুমায়ুন/পলাশ

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com