হঠাৎ খলিল (পর্ব-৮)
প্রকাশ : ০৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০:৩১
হঠাৎ খলিল (পর্ব-৮)
পলাশ মাহবুব
প্রিন্ট অ-অ+

সোলায়মান সাহেব পত্রিকায় জমি কেনার বিজ্ঞাপন দেখছিলেন।

বিজ্ঞাপন দেখার পাশাপাশি তিনি আরও একটা কাজ করেন। পছন্দ হলে ফোন করেন।

একটা বিজ্ঞাপন তার পছন্দ হয়েছে।

তিনি ফোনটা হাতে নেন।ডায়াল করতে যাবেন, তখন কাউছার সাহেব তার রুমে ঢোকেন। তার হাতে একটা পত্রিকার একটা পাতা। রাশিফলের।

 

সোলেমান ভাই, আজকে কয়টা পাইলেন?

 

সোলায়মান সাহেবের উল্টো দিকে রাখা চেয়ারে বসে জানতে চান কাউছার সাহেব।

 

কাউছার ভাই, আপনাকে কতবার বলেছি, কয়টা না, বলেন কয়জন। টি, টা, খানা, খানি এসব জড়বস্তু আর প্রাণীর বেলায় খাটে। মানুষের জন্য এগুলো প্রযোজ্য না। আমি তো ভাই মাছ ধরতে বসিনি।

 

ওই একই কথা, মানুষও তো প্রাণী। নাকি না? মানুষ হইলো গিয়া সৃষ্টির সেরা জীব। মানুষের বেলায় সব সই। তা আজকে জালে কয়টারে আটকাইলেন? ওহ। আপনার জালে তো আবার ফুটা আছে। সব বাইর হইয়া যায়। ঠ্যা ঠ্যা ঠ্যা।

 

দেন তো দেখি।

 

সোলায়মান সাহেবের কাছ থেকে পেপারটা নেন কাউছার সাহেব। আন্ডারলাইন করা কয়েকটা বিজ্ঞাপন পড়েন।

 

শোনেন সোলেমান ভাই, এইসব পত্রিকার বিজ্ঞাপন দেইখা জমি বেচতে চাইলে আপনার জমি জীবনেও বেচা হইবো না। পত্রিকার বিজ্ঞাপন হইলো আইওয়াশ। চোখের মায়া।

 

এটা কেমন কথা বললেন কাউছার ভাই, আইওয়াশ হতে যাবে কেন? রোজ শত শত বিজ্ঞাপন ছাপা হচ্ছে পত্রিকায়, সবই কি ভুল?

 

আরে আমাদের অফিসে যখন লোক নেয়া হয়, তখন তো আমরাও পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেই। তবে যাদের নেবো তারা সিলেক্ট হয়ে যাওয়ার পরে। ঠ্যা ঠ্যা ঠ্যা।

 

সব যে ভেজাল, সেটা ঠিক না। আপনার এই কথাটা নিতে পারলাম না।

 

কাউছার সাহেবের কথাটা সোলেমান সাহেবের পছন্দ হয় না।

নেয়া না নেয়া আপনার বিষয়। তবে কি জানেন, আপনার সাথে আমার একটা মিল আছে আবার একটা অমিলও আছে।

 

কেমন সেটা?

 

মিলটা হলো আমরা দুজনই রেগুলার পত্রিকা পড়ি। আমি রাশিফল পড়ি আর আপনি পড়েন ক্রয়-বিক্রয়ের বিজ্ঞাপন। আর অমিলটা হলো আপনি পত্রিকার কথা বিশ্বাস করেন আর আমি করি না। ঠ্যা... ঠ্যা .. . ঠ্যা . . .

 

পত্রিকায় যত বিজ্ঞাপন দেয় সব তো আর খারাপ না। ভালো-মন্দ মিলিয়েই সবকিছু।

 

আপনি ভালো মানুষ, তাই সবকিছু সরলভাবে দেখেন। আচ্ছা সে যাই হোক, খালি মুখে আর কত কথা বলব বলেন তো? গলা তো শুকিয়ে গেছে। চা দিতে বলেন। তবে আপনার ওই লেবু চিপড়ানো তিতা চা না।

 

লেবু চা কি তিতা হয় নাকি?

 

ইদ্রিসেরটা হয়। ও এক লেবু বারবার কচলায়। ব্যাটা ইদ্রিস জন্মের পরই বুড়া মানুষের নাম পাইছে। বয়সের আগে তাই পাইকা গেছে। ওর পক্ষে কিছুই অসম্ভব না। ঠ্যা ঠ্যা ঠ্যা।

 

বেল টিপে ইদ্রিসকে ডাকেন সোলায়মান সাহেব।

ইদ্রিসের আসতে একটু দেরি হয়।সে অফিস টহলে ছিল।সব খবরাখবরই তো তাকে রাখতে হয়।

 

দেরি হওয়ায় কাউছার সাহেব রেগে যান, ওই ব্যাটা ওভারডোজ ইদ্রিস, বয়সের আগে বুড়া হইছোস ঠিকই, বেল বাজাইলে আসতে দেরি হয় ক্যা? দৌড় দিয়া ফজলের দোকানে যা। সর পড়া গরম গরম দুধ চা নিয়া আয়।

 

গরম দুধে তো স্যার সর পড়ে না। সর পড়ে দুধ ঠাণ্ডা হইলে।

 

শুনলেন সোলেমান ভাই। বলছি না এই বদমাইশ হইলো বয়সের আগে বীচি পাকা।

ওই ব্যাটা বীচি পাকা। যেটা বলছি সেটা কর। আমি বললে গরম দুধেও সর পড়বো। সাথে গরম গরম সিঙ্গাড়াও আনবি।

ইদ্রিস দেরি করে এলেও কথার হাত থেকে বাঁচতে দ্রুত বেরিয়ে যায়।আরও দ্রুত চা-সিঙ্গাড়া নিয়ে ফিরে আসে। কাউছার সাহেব সিঙ্গাড়ার গায়ে হাত দিয়ে দেখেন গরম আছে কিনা।

 

আপনি তো জানেন সোলায়মান ভাই, চাকরির বাইরে আমার একটাই শখ, মানুষের হাত দেখা। জানি, সবই ভুয়া। তারপরও দেখি। ভবিষ্যত উজ্জ্বল - এই কথা বললে মানুষ খুশি হয়। মানুষের হাসির চেয়ে বড় সত্য পৃথিবীতে আর কিছু নাই। আপনি এক কাজ করেন, পেপার ভাঁজ করে রেখে এই কাউছারের ওপর সব ছেড়ে দেন।

 

পেপার তো ভাঁজ করে রেখেছিলামই। কই, আপনি তো জমিটা বিক্রি করে দিতে পারলেন না। বাধ্য হয়ে তাই আবার পেপার ধরতে হলো।

 

এভাবে বললে কষ্ট পাবো সোলেমান ভাই। গুণে গুনে চারটা কাস্টমার হাজির করেছিলাম। সবকটাকে আপনি ডিসকোয়ালিফাই করেছেন।

 

ইচ্ছে করে তো আর করিনি। তাদের তো প্রত্যেকেরই কোনও না কোনও সমস্যা ছিল। ডিফিট খাওয়া কাস্টমার।

 

হাসালেন সোলেমান ভাই। কাস্টমারের কথা পছন্দ হয় নাই এই অজুহাতেও আপনি জমি বিক্রি করেন নাই। এইটা আমার দোষ। তবে চিন্তা কইরেন না। আমি বড়শি পাইতা বইসা আছি। আপনার পছন্দমতো কাস্টমার পাইলেই টান দিয়ে তুলে ফেলব।

 

চা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে। আপাতত চায়ে টান দেন।

 

কাউছার সাহেব একটা সিঙ্গাড়া নিয়ে সিঙ্গাড়ার মাঝে চাপ দেন, ইশশ! সিঙ্গাড়ার মইধ্যে বাদাম। সিঙ্গাড়ার মইধ্যে বাদাম আর চায়ের মইধ্যে বিস্কিটের গুঁড়া আমার দুই চোক্ষের বিষ। আরে ভাই, সিঙ্গাড়া হইলো গিয়া আলুর খেলা। খেলা দেখাইতে চাইলে আলু দিয়া দেখা। বাদাম হান্দাইয়া দিলে আর তোর কেরামতি কি!

 

আলুর মাঝ থেকে বাদাম আলাদা করে সিঙ্গাড়া মুখে দেন কাউছার সাহেব, তা যে কথা বলতেছিলাম। আমার হইলো টিপ্পা দেখার বদভ্যাস। হিসাব-নিকাশ করে দেখলাম আপনার এই পত্রিকার লাইন ছাড়তে হবে। শুধু শুধু মোবাইল বিল বাড়াচ্ছেন। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়া বেশির ভাগেরই কান্দি ভাঙ্গা। ফল্ট আছে। ওসব ছাইরা আপনি এই কাউছারের ওপর ভরসা রাখেন। মধুর দামে আপনার জমি বেচে দেবো ইনশাল্লাহ। বিনিময়ে কোনও পার্সেন্টিস খাবো না। ঠ্যা ঠ্যা ঠ্যা।

 

কাউছার সাহেব সালাম দিয়ে উঠে যান। যাওয়ার সময় একটা সিঙ্গাড়া হাতে করে নিয়ে যান তিনি।

 

করিডোরে কাউছার সাহেবের সাথে খলিলের দেখা। দূর থেকেই কাউছার সাহেব খলিলকে ডাকবেন, এই যে ঘোড়াডিঙ্গানো গরু। সক্কাল সক্কাল তোমার সাথে দেখা হয়ে গেল! ঘোড়া ডিঙ্গাইয়া ঘাস খায় কারা জানো? গরুতে। কারণ ঘাস হলো গরুর একমাত্র খাদ্য।

 

গুড মর্নিং স্যার। ভালো আছেন?

 

ভালো তো থাকতে চাই, পারি না। এক জীবনে আমি অনেক ছেলে দেখেছি, কিন্তু তোমার মতো একজনকেও দেখি নাই।

 

মোতালেব সাহেবের কথা শুনে খলিল খুশি হয়, আপনি স্যার বাড়িয়ে বলছেন।

 

মোটেও বাড়িয়ে বলছি না। এই যে তুমি বারো মাস অসুখে ভোগো, এই যে ঘড়ির কাঁটার মতো টাইম মেনটেইন করে খুক খুক করো, তাও কি ভালো হবা না?

 

খলিল ভেবেছিলো কাউছার সাহেব ভালো কোনও কথা বলবেন, যা বললেন শুনে খলিলের মুখ কালো হয়ে গেল।

 

আমার অপরাধ কি স্যার?

 

তুমি হইলা একটা প্রথম শ্রেণীর মিচকা শয়তান। তুমি নাকি আড়ালে আমার নাম বিকৃত করো? কাউছারকে গরু স্যার বলো?  তুমি নাকি বলো, গাইবান্ধার পরে দেশে যে জেলা হবে সেই জেলার নাম নাকি হবে ‘গরুছাড়া’ মানে কাউছার? ফাজিল কোথাকার!

 

এইটা স্যার পরিপূর্ণ অপপ্রচার। আমি এই ধরণের কথা বলতে যাবো কেন? এমনিতেই স্যার আমার কাশের সমস্যা। কথা পুরা বলতে পারি না, অর্ধেক পথে আটকাইয়া যায়। আমি এসব কেন বলতে যাব? আমার কি বেনিফিট!

 

বেশি চালাকি করবা না। মানুষের চাকরি ঝুলে থাকে সুতায়। তোমার চাকরি ঝুলছে সুতার আঁশে। বেশি চালাকি করলে ঠুস করে চাকরিটা ছুটে যাবে। আর এই ব্যাটা, আমার নামে দেশে একটা নতুন জেলা যদি হয়ও, তাতে তোমার কোনও সমস্যা?

 

সেটাইও তো কথা। আমার স্যার ঠাণ্ডার সমস্যা। আর কোনও সমস্যার মইধ্যে আমি নাই।

 

বলছো কি বলো নাই, সেটা ইনকোয়ারি হচ্ছে। সময়মতো টের পাবা যক্ষ্মা খলিল। খুক খুক।

 

কাউছার সাহেব খলিলকে ব্যঙ্গ করলেন। খলিলও কাশবে। তবে তারটা জেনুইন কাশি।

দুদিন ধরে কাশি শুধু বাড়ছেই। জ্বরটাও কমছে না। (চলবে)

 

বিবার্তা/মৌসুমী/হুমায়ুন

 

হঠাৎ খলিল (পর্ব-৭)

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com