হঠাৎ খলিল (পর্ব- ২৩)
প্রকাশ : ২৭ এপ্রিল ২০১৭, ১৯:২৬
হঠাৎ খলিল  (পর্ব- ২৩)
পলাশ মাহবুব
প্রিন্ট অ-অ+

মানুষের জন্ম যেমন হয় ঢাকঢোল পিটাইয়া, তেমন মৃত্যু হওয়া উচিত চুপেচাপে। টুক কইরা একদিন মইরা যামু। মরার খবরে মানুষে বলবে, আহা! বড় ভালো মানুষ ছিল। তুমি করতেছো উল্টা কাম।  আমার মরার খবরে ঢাকঢোল পিটাইতেছো।

 

মনিরের উদ্দেশ্যে কথাটা বলে খলিল। কি কারণে বলেছে মনির বুঝতে পারে। কমলা-আপেল নিয়ে বাড়িওয়ালা আইয়ুব মোল্লা এসেছে ওদের মেসে। ওরা তখন রাতে খাবার খেতে বসেছে মাত্র।

 

আইয়ুব মোল্লা ঘরে ঢুকেই খলিলের হাত ধরলেন।

 

করেন কি চাচা, করেন কি! হাতে তো ভাত লাইগ্যা আছে।

 

যতটা অমানবিক আমারে ভাবতেছেন অতটা অমানবিক কিন্তু আমি না। কথাবার্তায় মাঝে-মধ্যে ভুল-ত্রুটি হইয়া যায় আরকি। আপনে কিছু মনে রাখবেন না।

 

মনিরের কাছ থেকেই বাড়িওয়ালা খবরটা পেয়েছেন। ভাড়া নিয়ে বাহাসের পর বাড়িওয়ালা মনিরকে ধরেছিল। খলিলের এই হঠাৎ পরিবর্তনের কারণ কি? তখনই খলিলের অসুস্থতার খবরটা পান।

 

বাড়িওয়ালার কথায় খলিল হাসে, আপনে চিন্তা কইরেন না চাচা। কোনো কিছু মনে রাখার মতো জায়গা আমার মনে নাই। সব অসুখে ভরা। আমি কিছু মনে রাখি নাই।

 

শোনেন বাবা খলিল। বাড়িওয়ালা এই প্রথম খলিলকে বাবা বলে ডাকলেন। আগে খলিল সাহেব বলতেন।

 

আপনার যতদিন ইচ্ছা আমার এইখানে থাকবেন। এক টাকাও ভাড়া বাড়বো না। আল্লায় অনেক দিছে আমারে। আপনাগো ভাড়া না বাড়াইলেও আমার চলবে।

 

বাড়িওয়ালা চাচার কথা শুনে মনিরের দিকে তাকায় খলিল।

 

অসুখ হইলো আমার আর লাভ হইতেছে তোমার। আমার সর্বনাশ আর তোমার পৌষ মাস। হা হা হা।

 

খলিলের হাসিতে যোগ দেন না আইয়ুব মোল্লা। তিনি সিরিয়াস।

 

আপনার খবরডা শোনার পর আমি চাইর রাকাত নফল নামাজ পড়ছি। আগামী শুক্রবার বাদ আছর পাড়ার মসজিদে দোয়া মাহফিল হবে। আল্লায় চাইলে সব সম্ভব।

 

বাড়িওয়ালার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে খলিল। মনে হয় এক অচেনা মানুষকে দেখছে সে।

 

আমার বড় পোলাটা মারা গেছে রোড এক্সিডেন্টে। এক্কেবারে জোয়ান বয়সে। তারপর থেইকা কোনো জোয়ান মানুষের মরা মুখ আমি দেখি না। আমার পোলার মুখ ভাইসা ওঠে।

 

পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখ মোছেন আইয়ুব মোল্লা। পরিবেশটা ভারি করে দিয়ে চলে যান।

 

ভারি পরিবেশ খলিলের ভালো লাগে না। সে আনন্দ-ঠাট্টার মাঝে চলে যেতে চায়। আর চায় তার ‘নিদমরণ’ হোক। রাতের বেলা ঘুমাবে, সেই ঘুম আর ভাঙবে না। কখন মারা গেছে সেই সময় বের করতে গিয়ে ডাক্তারদের ঘুম হারাম।

 

কিন্তু মানুষের সব চাওয়া কি আর পূরণ হয়! তেমনি পরিবেশের ওপর খলিলের নিয়ন্ত্রণ নেই। সে না চাইলেও তা ভারি হয়ে ওঠে।

 

ক’দিন আগে তাদের বুয়া এক তাবিজ নিয়ে হাজির। তার গ্রাম থেকে আনিয়েছে।  কোনো এক বাবার দেয়া।  সর্বরোগের সমাধান আছে সেই তাবিজে।  ক্যানসার কোনো ব্যাপারই না। সেই তাবিজ বুয়া খলিলের বাম হাতে বেঁধে দেবে।

 

তাবিজটা বিষয় না।  বুয়ার ভালোবাসা খলিলকে ছুঁয়ে যায়। মুখে কিছু বলতে পারে না। আবেগে গলা আটকে আসে তার। অসুস্থ হওয়ার পর চেনা মানুষগুলোকে নতুনভাবে আবিষ্কার করছে সে।

 

মেডিকেল সাইন্স বড় কঠিন জিনিস।  মেডিকেল সাইন্সে কান্দনের কোন দাম নাই। বুঝলা?

 

কাঁনলে উপকার একটাই। চোখের ব্যায়াম হয়। এই ব্যায়ামের নাম ‘ফ্রি কান্দন এক্সারসাইজ’। হা হা হা।

 

হালকা কথা বলে পরিবশে হালকা করতে চায় খলিল। মনির কোনো জবাব দেয় না। সে প্লেটের ভাত খোটে।

 

মুখ বেজার কইরা রাইখো না। শোনো, একটা বিষয় খেয়াল করলাম। আমার ক্যান্সারের শিঙ্গা ফুঁ দেওনের পর মেসে খাবারের মান ভালো হইয়া গেছে। তুমি মনে হয় ভালো বাজার-সদায় করতেছো। এইজন্য তোমাকে ধন্যবাদ।

 

ভাই, আপনে আমার রক্তের কেউ না হইতে পারেন, কিন্তু একলগে আছি তো প্রায় পাঁচ বছর। আত্মার মিল না থাকলে এতদিন একলগে থাকন যায় না। আমি ছোট চাকরি করি, গরীব মানুষ। দুই পদ ভালো-মন্দ খাওন ছাড়া আফনের জন্য তো আর কিছুই করতে পারছি না।

 

হাত দিয়ে চোখ মোছে মনির। মনির এখনও ভারি হয়ে আছে।

 

আরে কান্দো ক্যা। এসব কি। শোনো, এবার সত্য সত্য একটা ভালো খবর দেই।

 

ভেজা চোখে খলিলের দিকে তাকায় মনির।

 

ডাক্তার কইছিলো দিনকে দিন মুখের রুচি উইড্ডা যাবে। শরীরও ভাইঙ্গা যাইবো। বিশ দিনের উপরে হইয়া গেলো সেইসব তো টের পাইতেছি না কিছু। ভালো ভালো খাইয়া উল্টা আরও মোটা-তাজা হইতেছি। আয়ু এক মাসের জায়গায় আরেকটু বাড়বে মনে হয়।

 

ভাই, আমি কই কি, আপনে আরেকবার ডাক্তারের কাছে যান। টেস্টগুলান আবার করান। আল্লার দুনিয়ায় সবই সম্ভব। হইতেও তো পারে . . .

 

ধুর মিয়া, এইডা কি জুয়েল আইচের ম্যাজিক পাইছনি যে ইকরি মিকরি কিকরি কইয়া দিনরে রাইত বানাবা। আয়ু যদি বাড়ে ক্ষতি কি। আরও কয়দিন ভালো-মন্দ খাইলাম। হা হা হা।

 

মনিরের কথাকে পাত্তা দেয় না খলিল।

 

আচ্ছা শোনো, তোমারে দরকারি কথাটা কইয়া রাখি। কোনোদিন সকালে উইঠ্যা দেখবা আমি নাই। তাই আগে ভাগে বইল্লা রাখা ভালো।

 

হাত বাড়িয়ে খাটের নিচ থেকে একটা ট্রাংক বের করবে খলিল, আমার এই ট্রাংকে একটা সোনার চেইন আর একটা বালা আছে। মায় মরার সময় দিছিল, পোলার বউয়ের লাইগ্যা। হাহ।

 

লম্বা শ্বাস ছাড়ে খলিল, আমার তো আপন বলতে কেউ নাই। সোনার চেনডা তুমি নিবা। আর বালাডা বুয়ারে দিবা। আবার দুইডাই নিজে নিয়ো না কইলাম। ওইপাড়ে তাইলে কিন্তু তোমারে ধরমু আমি। হা হা হা।

 

হাসতে হাসতে কান্না শুরু করবে খলিল। খলিলের কান্না দেখে মনিরও কাঁদে। (চলবে)

 

বিবার্তা/মৌসুমী/হুমায়ুন

 

>>হঠাৎ খলিল (পর্ব- ২২)

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com