হঠাৎ খলিল (পর্ব- ২২)
প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০১৭, ১৫:৫৬
হঠাৎ খলিল (পর্ব- ২২)
পলাশ মাহবুব
প্রিন্ট অ-অ+

অফিসের ঝামেলা শেষ হওয়াতে ভালোই হয়েছে। এখন আর খলিলের অফিসে যাওয়ার টেনশন নেই। ম্যানেজার স্যারের সাথে চোর-পুলিশ খেলার ব্যাপারও নেই। খারাপ লাগা বলতে নুপূর মেয়েটার কথা মাঝে মাঝে মনে পড়ে। ফোন হারানোর পরে আর কেনা হয়নি।  তাই কেউ যোগাযোগও করতে পারছে না। পুরোটা দিন খলিল এখন তার মতো করে কাটায়। নিজের কাজ বলতে একটা অ্যালবাম আছে পুরোনো, তাতে খলিলের বিভিন্ন সময়ের ছবি। মাঝে মধ্যে অ্যালবামটা দেখে।

 

একা একা কিছুক্ষণ কান্নকাটি করে। কান্নার যে একটা ভালো দিক আছে এতদিনে টের পেয়েছে খলিল। কান্নাকাটি শেষে নিজেকে অনেক হালকা লাগে। তবে চাপা কান্নায় হালকা ভাব আসে না। এরজন্য চাই শরীরভাঙ্গা কান্দন।

 

আজ খলিল দেখছিল তার খুব ছোটবেলার একটা ছবি। তখন তার বয়স কত হবে? চার কি পাঁচ। একটা চেয়ারে বসে আসে পিচ্চি খলিল। দু’পাশে তার মা আর বাবা দাঁড়ানো। বাবার সাথে কোনও স্মৃতি সে মনে করতে পারে না।

 

বাবা শুধু এই ছবিটাতেই বেঁচে আছেন।

 

মা বলতো, সে দেখতে নাকি তার বাবার মতো হয়েছে।

 

মা মারা গেছেন তাও প্রায় আট বছর। ছোট একটা বোন ছিল। স্বামীর সাথে অভিমান করে সেও আত্মহত্যা করেছে। আপন বলতে তার কেউ নেই।

 

একদিক দিয়ে ভালোই হয়েছে। কোনো পিছুটান নেই তার।

 

হাত দিয়ে ছবিটা স্পর্শ করে খলিল। চোখের দু-এক ফোঁটা পানি ছবিটার ওপর পড়ে। ছবিটার দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারে না।

 

অ্যালবামটা বন্ধ করে খলিল। চোখ মোছে। তারপর বিছানার পাশে রাখা খাতার মতো ডায়রিটা হাতে নেয়। খলিল একটা তালিকা করেছে। ভালো কাজের তালিকা। তালিকা করে গত দুই সপ্তাহে অনেকগুলো ভাল কাজ করেছে সে।

 

গতকাল গিয়েছিল কারওয়ানবাজার এলাকায়। দেখে, এক বৃদ্ধ লোক। এক মণ ওজনের একটা বাজারের ঝুড়ি মাথায় করে নিয়ে যাচ্ছে। চড়ুই পাখির মতো শরীরে কিছু নেই। ঝুড়ির ভার সে সামলাতে পারছে না।  তারপরও প্রাণপণ চেষ্টা তার। বুড়ো মানুষটাকে দেখে মনে হচ্ছে সারা শরীরের শক্তি দিয়ে মাথাটা উঁচু রাখতে চাইছেন।

 

লোকটাকে থামায় খলিল, ঝুড়িটা নামিয়ে নিজের মাথায় নেয়। বৃদ্ধ মানুষটা এতটাই কাহিল যে অবাক হওয়ার মতো শক্তিও তার নেই।

শূন্য দৃষ্টিতে খলিলের দিকে তাকিয়ে থাকেন।

 

ঝুড়িটা যখন মাথায় নিয়েছে তখন যেমন লোকটার মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছিল না, খলিল যখন ঝুড়িটা জায়গামতো পৌঁছে দিল তখনও তার মুখের দিকে তাকাতে পারছিল না সে। অদ্ভুত আনন্দের দ্যুতি লোকটার মুখে। বারবার খলিলের মাথায় হাত রেখে দোয়া করছিলেন তিনি, তোমার মতো একটা পোলা যদি আমার থাকত তাইলে এই বয়সে এত কষ্ট করতে হইতো না। দোয়া করি বাবা। আল্লায় যেন তোমারে একশ বছর আয়ু দেয়।

 

বৃদ্ধের কথা শুনে খলিল হাসে।

 

কয়েকদিন আগে যখন এক অন্ধ মহিলাকে হাত ধরে রাস্তা পার করিয়েছে। সেই মহিলাও একই দোয়া করেছে তাকে। যখনই যার কোনো উপকার করেছে সবাই তার দীর্ঘ জীবন চেয়ে দোয়া করেছে। অথচ তার আয়ু আছে আর দশ কি বারো দিন।

 

নিজে নিজে হাসে খলিল। এই হাসির মধ্যে আনন্দের চেয়ে কষ্টই বেশি।

 

খাতাটা বন্ধ করে উঠে পড়ে খলিল। এখন যাবে বসুন্ধরা সিটি। সেখানে এক অসুস্থ ছাত্রের চিকিৎসার জন্য টাকা তুলতে হবে। অনেক টাকা দরকার। ছেলেটির বন্ধুরা মিলে বসুন্ধরা সিটির সামনে দাঁড়াবে। মার্কেটে যারা আসবে তাদের কাছে সাহায্যের হাত পাতবে। খলিলও তাদের সাথে দাঁড়াবে। ছেলেটির চিকিৎসার জন্য মানুষের কাছে টাকা চাইবে।

 

মার্কেটে অনেক মানুষের ভিড়, সে তুলনায় সাহায্যকারী মানুষের সংখ্যা কম।

 

খলিল একটা বিষয় খেয়াল করেছে, বয়স্কদের চেয়ে তরুণদের মন অক্ষোকৃত নরম। দু-চারটা কথায় তাদের মন গলে। মাঝবয়েসীদের মন সিঅ্যান্ডবি’র ইটের চেয়েও শক্ত। পা ধরলেও দুই টাকা বের করে না।

 

খলিল টার্গেট করেছে জুটিদের। এরা হচ্ছে সবচাইতে ভালো। বান্ধবীর কাছে নিজের মানবিক দিকটা জাহির করতে কিছু না কিছু দেয়।

 

খলিলের গলায় একটা প্ল্যাকার্ড ঝোলানো। তাতে লেখা : ‘অসুস্থ সুমিতকে বাঁচাতে এগিয়ে আসুন’।

 

হাসপাতালের বিছানায় শোয়া সুমিতের একটা ছবিও আছে সাথে। এক জুটির কাছ থেকে ২০ টাকা নিয়ে আরেক মেয়েকে পেছন থেকে ডাক দেয় সে, আপা, এই অসুস্থ ছেলেটার চিকিৎসার জন্য যা পারেন কিছু সাহায্য করেন।

 

আরে খলিল ভাই, আপনি?

 

ডাক দেয়া মেয়েটি নুপূর। নুপূরকে দেখে খলিলও অবাক হয়, আপনি এখানে কি করেন?

 

মার্কেটে মানুষ যেজন্য আসে আমিও সেজন্য এসেছি। কিন্তু আপনি এখানে দাঁড়িয়ে কি করছেন? গলায় এটা কি?

 

সাইনবোর্ড।

 

কিসের সাইনবোর্ড।  কার চিকিৎসার সাহায্য?

 

আমার না। ওর।

 

প্ল্যাকার্ডের ছেলেটিকে দেখায় খলিল।

 

আপনি নিজেই তো অসুস্থ।

 

জীবনে মানুষের জন্য তো কিছু করতে পারি নাই। উপরে গিয়া কি জবাব দেব?

 

আগে জবাব দেন ফোনটা বন্ধ করে রেখেছেন কেন? কোনোভাবেই আপনার ট্রেস পাচ্ছিলাম না।

 

হাফ মরা মানুষের খোঁজ নিয়া আর কী হবে! তা আছেন কেমন ?

 

আপনি তো পুরো অফিস তোলপাড় করে দিয়েছেন। এমডি স্যার পর্যন্ত সোজা হয়ে গেছে।

 

তাইলে তো ভালোই হইছে। আপনার আর চিন্তা নাই। হেডফোন ছাড়াই সিরিয়াল দেখতে পারবেন। আচ্ছা, ওই বউ-শ্বাশুড়ির কি অবস্থা?

 

কোন বউ শ্বাশুড়ির কথা বলছেন! নুপূর অবাক হয়।

 

আরে ওই যে চাবির গোছা নিয়া টানাটানি। চাবি এখন কার আঁচলে।

 

ওহ আচ্ছা! নুপূর হাসে, আপনি আগের মতোই আছেন খলিল ভাই।

 

মরার আগে আর চেইঞ্জ হইয়া কী লাভ। খলিলও হাসে।

 

আচ্ছা, ভালো কথা। টেস্টগুলো কি আবার করিয়েছিলেন? নুপূর জানতে চায়।

 

আরে না! একবারও যা, দুইবারও তা। কোনো লাভ হয় না। তাছাড়া ডাক্তার বলছে টেনশন বেশি করলে আয়ু যা আছে তাও কমবে। সো, নো টেনশন। তবে একটা ঘটনা অবশ্য মিলতেছে না।

 

কি ঘটনা? খলিলের দিকে তাকায় নুপূর।

 

ডাক্তার বলছিলো আস্তে আস্তে কিছু সমস্যা দেখা দেবে। মুখে রুচি থাকবে না। শরীর শুকাইয়া যাবে। পনের-ষোলো দিন হইয়া গেল ওইসব তো টের পাইতেছি না। মুখের রুচি তো আরও বাড়তেছে। আগে ওজন আছিল ছিয়াত্তর কেজি। এখন হইছে বিরাশি কেজি। কাহিনী বুঝতেছি না। শরীলে পানি জমলো নাকি?

 

আমি বলি কি, আপনি টেস্টগুলো আবার করান। প্লীজ! দরকার হলে আমি আপনার সঙ্গে যাব।

 

আইচ্ছা দেখা যাক। এখন যাই তাইলে। ছেলেটার জন্য টাকা তুলতে হবে।

 

এই যে ভাইয়া, অসুস্থ ছেলেটার চিকিৎসার জন্য কিছু . . .সাহায্য চেয়ে একটা জুটির পেছনে হাঁটা শুরু করে খলিল। নুপূরকে আর কিছু বলার সুযোগ দেয় না। মরার আগে আর মায়া বাড়িয়ে কি লাভ। (চলবে)

 

বিবার্তা/মৌসুমী/হুমায়ুন

 

>>হঠাৎ খলিল (পর্ব- ২১)

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com