হঠাৎ খলিল (পর্ব- ২০)
প্রকাশ : ২৮ মার্চ ২০১৭, ২০:০৬
হঠাৎ খলিল (পর্ব- ২০)
পলাশ মাহবুব
প্রিন্ট অ-অ+

ম্যানেজার সোলায়মান সাহেব মনে হয় ওঁৎ পেতে ছিলেন। খলিলকে দেখামাত্র ধরলেন। এই লোকের চোখ কয়টা কে জানে। তিন দিন পরে আজ সে অফিসে এসেছে। এসেই তাকে ম্যানেজারের সামনে পড়তে হবে!

 

এখন তোমার অফিসে আসার সময় হলো? কটা বাজে এখন?

 

খলিল তার হাতের দিকে তাকায়, ঘড়ি নাই স্যার।

 

মোবাইলটাও তো ধরো না। বলো মোবাইলও নাই।

 

জ্বি স্যার, মোবাইলও নাই। চুরি হয়ে গেছে।

 

ঘড়ি নাই, মোবাইল নাই, অফিসে আসার ঠিক-ঠিকানা নাই। আছে কি তোমার, শুনি?

 

আপনার সাথে কিছু কথা আছে স্যার।

 

আমার সাথেও কোনো কথা নাই। তুমি নাইয়ের মধ্যেই থাকো। তিনদিন ডুব মেরে আজ আফিসে এসেছো। যা কথা বলার এমডি স্যারের সাথে বলবা। তুমি আসামাত্র তোমাকে তার কাছে নিয়ে যেতে বলেছে। দেখামাত্র গুলি।

 

আমার ব্যাপারটা আগে শুনবেন তো স্যার।

 

প্লিজ খলিল, মাফ চাই। তোমার বিষয়ে আমি আর নাই। অনেক শিক্ষা হয়েছে। তুমি আমার দেশি ছেলে, এই অপরাধেই আমার চাকরি হালকা হয়ে আছে। আগলা আলাপ করে ঝুঁকি আর বাড়াতে চাই নাই। তোমার চাকরির প্রয়োজন না থাকতে পারে, আমার আছে। তুমি চলো এমডি স্যারের কাছে। যা বলার ওনাকেই বলবে। চলো।

 

স্যার, কথাটা তো শুনবেন আপনি।

 

কোনো কথা নেই। চলো বলছি।

 

ম্যানেজার সাহেব এমডি স্যারের রুমের দিকে হাঁটা দেন। এই লোকের সাথে কথা বলাই মুশকিল। যখন নিজে বলা শুরু করেন তখন অন্য কারও কথাই শোনেন না। বাধ্য হয়ে ম্যানেজার সাহেবের পেছন পেছন খলিলও যায়।

 

এমডি সাহেব রুমেই ছিলেন। যথারীতি আছে অফিসের নারী কর্মকর্তা আইরিনও। এমডি সাহেব আইরিনের হাত দেখছিলেন। আইরিনের ভবিষ্যত কতটা উজ্জ্বল এবং আরও উজ্জ্বল করতে তাকে কোন কোন পাথরের ভার বহন করতে হবে সেসব বলছিলেন। আর খুনসুটি করছিলেন। সেসব শুনে হাসিতে গড়িয়ে পড়ছিল আইরিন। কখনো চেয়ারের একপাশে, কখনো এমডি সাহেবের গায়ে।

 

আপনি না স্যার . . .যাহ . . .

 

খলিলকে নিয়ে এমডি সাহেবের রুমে ঢোকেন ম্যানেজার সাহেব, তবে নক করে। খলিলকে দেখে এমডি সাহেবের হাসি মুখ শক্ত হয়ে যায়।

 

ও অফিসে এসেছে কেন? আমি জানতে চাই, ও অফিসে এসেছে কেন? ক’দিন পার করে এলো?

 

তিন দিন স্যার।ম্যানেজার সাহেব জবাব দেন।

 

তিন দিন পরে অফিসে এসেছে, তাও দেরি করে। এখন কটা বাজে? এটা কি মগের মুল্লুক, নাকি মামাবাড়ির আবদার?  এই, তুমি অফিসে আসছে কেনো? তোমাকে না ওদিন বললাম এরপর আর একদিন অফিস কামাই করলে চাকরি শেষ। অফিসে আসছো কেন?

 

স্যার একটা ঝামেলা হইছে। দুই মিনিট টাইম দিলে বলি।

 

তোমার বানানো কথা অনেক কথা শুনছি। তোমার কথা শুনতে শুনতে এক সাইডের কান বসে গেছে।

 

প্লীজ, স্যার! দুহাত জোড় করে খলিল অনুরোধ করে।

 

নো মোর কথা। অনেক কথা শুনেছি তোমার। বাট তুমি আমাদের কোনো কথা শোনোনি। সো, আর কোনো কথা হবে না। ইউ জাস্ট গেট আউট অফ মাই অফিস।

 

খলিল যায় না। দাঁড়িয়ে থাকে।এমডি সাহেবের রাগ বাড়ে।

 

প্লিজ স্যার। আমার কথাটা শুনলে বিষয়ডা বুঝতে পারবেন।

 

তোমাকে কি বললাম আমি? কথা কানে যাচ্ছে না?

 

ম্যানেজার সাহেব, ওকে আমার চোখের সামনে থেকে চলে যেতে বলেন। আমার অফিসে ওর মতো দায়িত্বজ্ঞানহীন, ইনসিনসিয়ার লোকের কোনো জায়গা নেই।

 

এমডি সাহেবের আচরণে খলিলের মধ্যে জেদ তৈরি হয়। মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত নেয় সে, এই চাকরি তো তার আর দরকার নাই। তার আয়ু মাত্র এক মাস। সাতশ বিশ ঘন্টা। ভালো কাজ যেহেতু শুরু করেছে, অফিসেও একটা ভালো কাজ করে যাক।

 

চলো তুমি আমার সাথে। এমডি’র নির্দেশে খলিলের হাত ধরে টেনে বাইরে আনার চেষ্টা করেন ম্যানেজার সাহেব। এক ঝটকায় হাতটা ছাড়িয়ে নেয় খলিল, শোনেন স্যার, একটা কথা বলি। কোনোদিন আপনের চোখের দিকে তাকাইয়া কথা বলি না। আইজ বলি, আপনে আমারে ফাঁকিবাজ কন? হাহ। আমি তো রোগের কারণে অফিস ফাঁকি দেই। আর আপনে যে দেশের কোটি কোটি টাকা ফাঁকি দেন! এত টাকা কামাই করেন অথচ ট্যাক্স ফাঁকি দেন। আপনেই তো সবচাইতে বড় ফাঁকিবাজ। আপনের তো জেল হওয়া উচিত।

 

খলিলের কথা শুনে এমডি সাহেবের মাথায় রক্ত উঠে যায়। তিনি রাগে কাঁপছেন।

ওর কতবড় সাহস! আমার সামনে দাঁড়িয়ে কী বলছে এসব! ম্যানেজার সাহেব . . .

 

এত বড় স্পর্ধা তোমার খলিল, কার সামনে দাঁড়িয়ে কীসব বলছো! বেয়াদব কোথাকার। চোখের সামনে থেকে যাও।

 

ম্যানেজার সাহেবও ক্ষেপে যান।খলিল এবার তাকায় ম্যানেজার সাহেবের দিকে।

 

স্যার, আপনে কথার মইধ্যে ঢুইক্কেন না। সকাল বেলা দুইজনরে পিডাইছি। মাথা গরম কইরেন না। আর আপনেও তো কম না। আপনারটায় পরে আসতেছি।

 

ম্যানেজার সাহেব আর কিছু বলার সাহস পান না। খলিলের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন, এ কোন খলিলকে দেখছেন তিনি!

 

খলিল আবার এমডি সাহেবের দিকে তাকায়, শোনেন স্যার, এই অফিসে তিন বছর কাজ করি। আপনের মুখ থেইকা একদিনও আমি একটা ভালো কথা শুনি নাই। অথচ মাইয়্যা মানুষ পাইলে আপনার মুখ দিয়া রস পড়ে। রস। আপনের এই চরিত্র অফিসের সবাই জানে। কেউ সাহস কইরা কয় নাই। আইজ আমি কইলাম। এইসব বদলান। নাইলে যেদিন ধরা খাইবেন রস কিন্তু বাইর হইয়া যাইব।

 

স্টুপিড! তোমাকে আমি পুলিশে দেব।এমডি সাহেব রাগে ফুঁসছেন।

পুলিশে দেবেন আমারে! পুলিশ আইলে আমার চাইতে আপনেরই লস হইবো বেশি। অনেক কিছু জানি। বেশি উত্তেজিত হইয়েন না। এমনিতেই হার্টের রুগি। দমের ব্ল্যাডার ফুইট্যা যাইবো।

 

এমডি সাহেব টাইয়ের নট ঢিলা করলেন। রাগ সামলানোর জন্য আর কিছু পাচ্ছেন না তিনি।

 

খলিল এবার আইরিনের দিকে তাকায়, এই যে ম্যাডাম, চাকরি করতে আসছে, চাকরি করেন। সারাদিন বসের রুমে বইসা কি করেন জানি। মানুষ কিছু বোঝে না মনে করেন? যেদিন ধরা খাইবেন, বুঝবেন।

 

আইরিন কিছু বলতে যাচ্ছিল।

 

চুপ একদম।খলিল তাকে থামিয়ে দেয়। তারপর রুমে তিনজনের দিকে একবার চোখ ঘোরায়, আমি যাই। আমার আর চাকরির দরকার নাই। তয় যে কথাগুলান কইয়া গেলাম মনে রাইখেন। এইদিন দিন না। কান্দের ওপর ওই যে দুইজন বইস্যা আছে না, তারা কিন্তু সব নোট করতে আছে। মাইয়া মানুষ দেখলে যে মুখ দিয়া রসের কথা কন, সেই মুখ কিন্তু বিষপিঁপড়ায় খাইবো। খুব হুঁশিয়ার।

 

রুমের সবার মুখের দিকে একবার তাকায় খলিল। লম্বা করে একটা সালাম দেয়। সজোরে দরজাটা টান দিয়ে বেরিয়ে যায় সে। (চলবে)

 

বিবার্তা/মৌসুমী/হুমায়ুন

 

>>হঠাৎ খলিল (পর্ব- ১৯)

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com