‘জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তরিক নয়’
প্রকাশ : ০২ জুন ২০১৮, ১৯:১৭
‘জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তরিক নয়’
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তরিক নয় বলে মন্তব্য করেছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। তারা বলছেন, ‘জলাবদ্ধতাকে পুঁজি করে বিভিন্ন সময়ে একাধিক প্রকল্প নেয়া হয়। কিন্তু ব্যাপকভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখা হয় না। বরং যেসব প্রকল্প গ্রহণ করা হয় তাতে জলাবদ্ধতা আরও বাড়ে।


শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত ‘রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকারি উদ্যোগ ও নাগরিকভাবনা’ শীর্ষক এক গোলিটেবিল বৈঠকে তারা বলেন, বিগত বছরগুলোতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের নামে ঢাকায় বালতির মতো করে বালু ফেলা হয়েছে। এখন পালতি থেকে পাম্পিং স্টেশনের মাধ্যমে পানি অপসারণ করা হচ্ছে। সেচে সেচে জলাবদ্ধতা নিরসন করা যাবে না।


ঢাকা ইউটিলিটি রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশান (ডুরা) আয়োজিত ওই বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ইনিস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) এর সহ-সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. আকতার মাহমুদ। এতে সঞ্চালনা করেন বিআইপি’র সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মুহাম্মদ খান।


অনুষ্ঠানে স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, ১৯৮৮ সালের বন্যার পর শহরকে বাঁধ দিয়ে গামলা তৈরি করে দেয়া হলো। এখন পাম্পিং করে পানি অপসারণ করা হচ্ছে। রাস্তা থেকে ফ্লাইওভার পর্যন্ত পানি জমে। মাত্র ৩৫ মিলিমিটারের পানি হযম করতে পারে না। প্রয়োজনে জমি অধিগ্রহণ করে খাল-ড্রেন নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে। খালকে আগের চিত্রে ফিরে আনতে হবে। শুধু পাম্প দিয়ে পানি সেচে সেচে জলাবদ্ধতা নিরসন করা যাবে না।


ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ১৬ জুন জলাবন্ধতা নিরসনে স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর উপস্থিতিতে সেমিনারে একটি কমিটি গঠন করা হলেছে। সেই কমিটিকে কেন আজো কার্যকর করা হলো না? তার বিচার হওয়া উচিৎ।


গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বায়ক জোনায়েদ সাকি বলেন, ওয়াসার এমডির ক্ষমতার খুঁটি কোথায়? নিশ্চয় সরকার। তাহলে কেন জলাবদ্ধতা কমছে না। দেশে বড় বড় বিল্ডিং হবে, ফ্লাইওভার হবে, কিন্তু যানজট কমবে না। জনগণ সুফল পাবে না। একে উন্নয়ন বলা যাবে না।


ড্যাপ পরিচালক আশরাফুল ইসলাম বলেন, আমাদের রাস্তার লেভেল এক নয় এ কারণে নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। ড্যাপ বাস্তবায়ন হলে এই সমস্যাগুলো কমিয়ে আসবে। আর যারা খাল, পুকুর ও নদী দখল করেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মামলা হয়েছে।


ঢাকা ওয়াসা'র পরিচালক শহীদ উদ্দিন বলেন, ২০১১ সাল থেকে আমরা ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে এক হাতে নেয়ার জন্য বলে আসছি। একাধিক সংস্থা কাজ করায় একটু সমস্যা হচ্ছে। আর বৃষ্টির পর পানি নিষ্কাশনের যে লাইন আছে তাকে সেই লাইন দিয়ে তার গন্তব্যে পৌছাতে যে সময় লাগে শুধু সেই সময়ই জলাবদ্ধতা থাকে। এটা দীর্ঘক্ষণ নয়।


গৃহায়ন ও গণপূর্তে সাবেক প্রধান প্রকৌশলী হাফিজুর রহমান মুন্সি বলেন, ওয়াসার দাসেরকান্দি স্যুয়ারেজ প্রকল্পের কথা দীর্ঘ ১০ বছর ধরেই শুনে আসছি। কিন্তু বাস্তবায়ন নেই। নগরীর যেসব সংস্থা রয়েছে তাদের কাজে মনে হচ্ছে কারো কাছে কেউ কম না।


ডিএনসিসি সচিব দুলাল কষ্ণ সাহা বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। দুই সিটিতে আরও ১০টি জোন বৃদ্ধি করা হয়েছে। কাজে সমন্বয় হীনতা আছে। প্রতিটি খালের সীমানা নির্ধারণের জন্য জেলা প্রশাসনকে বলা হয়েছে। আর রাজউক তার সিদ্ধান্তগুলো সেভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে না।


পবা চেয়ারম্যান আবু নাছের খান বলেন, আমরা যারা পরিবেশবাদী বা পরিকল্পনাবিদ দাবি করছি তারাই বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে সড়কের অবস্থা খারাপ করে পেলছি। কোনো উন্নয়ন কাজে জনগণের সম্পৃক্ততা নেই। এসব কারণেই জলাবদ্ধতা বাড়ছে।


ডিএসসিসি কাউন্সিলর ও ঢাকা ওয়াসা বোর্ড সদস্য হাসিবুর রহমান মানিক বলেন, ওয়াসার কারণেই ঢাকায় জলাবদ্ধতা বাড়ছে। ওয়াসাকে ড্রেন পরিষ্কার রাখার জন্য প্রতিটি ওয়ার্ডে অন্তত ১০জন করে পরিচ্ছন্নতাকর্মী রাখতে হবে।


অপর কাউন্সিলর ফারহানা ইসলাম ডলি বলেন, সরকারের একা পক্ষে কোনো কাজ করা সম্ভব নয়। এজন্য সেবা সংস্থাগুলোর পাশাপাশি আমরা যারা জনপ্রতিনিধি ও নগরবাসী রয়েছি তাদেরকেও নগর সেবায় সচেতন হতে হবে।


বিআইডাব্লিউটিএ’র সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী তোফায়েল আহমদ বলেন, ঢাকা থেকে পানি অপসারণের পথ পরিষ্কার রাখতে হবে। সব প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। তবেই জলাবদ্ধতা নিরসন করা সম্ভব হবে।


সেমিনারে উপস্থাপিত প্রবন্ধে বলা হয়- নগরীতে প্রতি বছর জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসে গড়ে ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। কিন্তু মাত্র ৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এতে জলাবদ্ধতার বেশ কিছু কারণ উল্লেখ করা হয়।


এগুলো হচ্ছে- রাজউকের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা এবং ওয়াসার ড্রেনেজ মাষ্টার প্ল্যান সময় মতো বাস্তবায়ন করতে না পারা; ভূ-উপরিস্থ ড্রেন পরিষ্কার না থাকা; ড্রেনেজ চ্যানেল ডি-লিঙ্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া; উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও সঠিক ব্যবস্থাপনা না করা; শক্ত নগর পরিসর ও রান-অফ ওয়াটার না থাকা; খাল ও পুকুর ভারাট হয়ে যাওয়া।


এ অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে বেশ কিছু প্রস্তাব দেওয়া হয়। এগুলো হচ্ছে- জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রণীত মাষ্টার প্ল্যানের পূর্ণ বাস্তবায়ন। লেক সংরক্ষণ ও পরিকল্পনা অনুযায়ীবারিপাত ধারন করা। সকল বক্স-কালভার্ট ভেঙ্গে উন্মুক্ত করে দেওয়া। সকল খাল, ষ্টর্ম ড্রেন ও বক্স কালভার্ট পরিষ্কারের ব্যবস্থা রাখা। পয়োঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাকে আলাদাভাবেব্যবস্থাপনা করা। সিএস বা আরএস ম্যাপ অনুযায়ী সকল ধরণের দখল উচ্ছেদ করা। খালগুলো সংরক্ষণ করে সকল ধরণের বর্জ্য অপসারণ করা। দুই পাড় বাধায় করে স্থানীয়জনগণের জন্য পায়ে হাঁটার রাস্তা করা। যেখানে খাল প্রশস্তকরণ সম্ভব নয়, সেখানে রিটেইনিং ওয়াল করে হাঁটার পথ তৈরি করা।


অনুষ্ঠানের শুরুতে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন রুবেল স্বাগত বক্তব্য দেন। এতে অন্যদের মধ্যে আরো বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক, বেসরকারি সংস্থা ডরপ'র প্রোগ্রাম কো- অর্ডিনেটর আমির খসরু প্রমুখ।


বিবার্তা/বিজ্ঞপ্তি/কামরুল

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com