বাবা-মাও আমাকে দূরে সরিয়ে দিলো
প্রকাশ : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:২৭
বাবা-মাও আমাকে দূরে সরিয়ে দিলো
সাংবাদিক ও মডেল আমির পারভেজ এবং হিজড়া সামিউল আলম ওরফে শাম্মী
শাহনাজ
প্রিন্ট অ-অ+

শাম্মী হিজড়া। বয়স ২৬। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে টাকা আদায়ের পরিবর্তে এখন নিজেই নিজের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন সামিউল আলম ওরফে শাম্মী হিজড়া। খুলেছেন বিউটি পার্লার। তিনি এমন একজন মানুষ, যিনি জীবনে হাজারো প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে আজ সফল। বর্তমানে তিনি হিজরাদের ট্রেডিশনাল কালচার, জীবন মান-উন্নয়নে কাজ এবং বন্ধু সোশ্যাল ওয়েল ফেয়ার এসোসিয়েশন সোসাইটিতে লিয়াজম অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন।


সাক্ষাতকারে কথা হয়েছিলো সফল এই মানুষটির সঙ্গে। সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন সাংবাদিক ও মডেল আমির পারভেজ।


কেমন আছেন?
শাম্মী :
ভালো।


আপনার জন্ম এবং পরিবার ও শৈশব সম্পর্কে বলুন।
শাম্মী :
আমার জন্ম সাভারের ধামরাইয়ে এবং আর আট-দশ জনের মতোই আমার শৈশব জীবন কেটেছে। কিন্তু একটু অন্যরকমভাবে। যেমন আমার ভাই বা এলাকায় অন্য ভাইদের মতো আমি ছিলাম না, আলাদা আমি দেহে পুরুষ অন্তরে নারী। আমি সবসময় ফিল করতাম আমি মেয়ে। খেলার সময় যদি বউচি খেলতাম আমি সবসময় বউই হতাম।



আপনার শখ কী?
শাম্মী :
আমি সাজগোজ করতে এবং অন্যকে সাজাতে পছন্দ করি। নাচ করতে পছন্দ করি। বিশেষ করে মাধুরীর নাচ আমি বেশি পছন্দ করি।


প্রত্যেকটি মানুষের জীবনে সুখ আর দুঃখ দুটোই থাকে। আপনার দুঃখ কী? আর সুখ কী?
শাম্মী :
আমার জীবনেও অন্যদের মতোই সুখ-দুঃখ আছে। আসলে আমাদের জীবনটাই তৈরী হয়েছে দুঃখ দিয়ে। আজকে দুঃখ আছে বলেই কিন্তু সামান্য সুখকে মনে হয় পাহাড় সমান সুখ। কষ্টের ব্যাপার হলো কেউ যখন মুখ ফিরিয়ে নেয়, বাকাঁ নজরে দেখে। সবচেয়ে কষ্টের হলো আমার ভাই কোনো একসময় বলেছিলো সে যদি আমার মতো হতো তাহলে গলায় দড়ি দিতো। বাবা-মাও আমাকে দূরে সরিয়ে দিলো। কিছু দিন পর আবার আমার ভাই বললো আমার বিয়ের পর আমার বউ কী একটা হিজড়ার চেহারা দেখবে? এই কথা শুনে মনে হলো পৃথিবীটা আসলে আমার জন্য না।


কোন ঘটনা আপনাকে সবসময় উজ্জীবিত করে?
শাম্মী :
সমাজের সবাই কিন্তু খারাপ না। আমার এক গুরু ছিলেন অনন্যা। তিনি আমাকে কখনো দুঃখ বুঝতে দেননি। আমাকে সবসময়ই উৎসাহ দিতেন। তিনি খুব ভালো ভালো কথা বলতেন। গুরুর কথামতো চললে আমি আমার পেছনের দুঃখগুলো ভুলে থাকতাম। আমি আজকের শাম্মী শুধু তার অবদানে।


সমাজে হিজড়াদের অবস্থান রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে টাকা আদায় করা সেখান থেকে বেরিয়ে আপনি কিভাবে এই পেশায় এসেছেন?
শাম্মী :
রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে টাকা আদায় করাটা আমাদের হিজড়াদের আদি পেশা। আজকের আমি এই পেশা থেকেই আমাকে মানুষ চিনেছে, বর্তমানে একটা অবস্থান করতে পেরেছি। আমি অনেক শ্রদ্ধা করি এই পেশাকে। কিন্তু যখন দেখি মানুষ আমদেরকে সমাজের বোঝা মনে করে, সহ্য করতে পারে না। তখন চিন্তা হলো তাহলে আমি এমন কোনো কাজ করি যার মাধ্যমে সমাজের মূল স্রোতধারায় চলতে পারি। সেই চিন্তা থেকেই আমি বিউটি পার্লারের পেশায় আসি এবং আজ সফল।



কিভাবে ও কার উৎসাহে আপনি এই পেশায়?
শাম্মী:
কোনো এক মিটিংয়ে গিয়ে আমি বাংলাদেশ পুলিশ হেডকোয়াটার এর বর্তমান ভারপ্রাপ্ত এডিশনাল ডিআইজি জনাব হাবিবুর রহমান স্যারের সঙ্গে আমার দেখা হয়। এই মহান ব্যক্তিটি হিজড়াদের নিয়ে কাজ করার চিন্তাভাবনা করছিলেন এমন সময় আমাদেরকে একদিন বললেন আমি তোমাদের নিয়ে কাজ করতে চাই, তোমরা কি আমার সঙ্গে কাজ করবা? তখন আমরাও অকপটে রাজি হয়ে গেলাম। আমার কাছে যানতে চান আমি কী করতে পছন্দ করি আর আমিও জানালাম সাজগোজের কথা। তিনি আমাকে বললেন তাহলে তো তুমি একটা পার্লার খুলতে পারো। তিনি আমাকে কোর্স না জানায় কোর্স করতে সাহায্যও করলেন ও এই পার্লার খুলেও দিলেন। একদম সব কিছু রেডি করে দিলেন। শুধু তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি বাংলাদেশের হিজড়াদের জন্য কর্মসংস্থান করে দিয়েছেন যা কোনো ব্যক্তি আজ পর্যন্ত করেননি।


এই সমাজে হিজড়াদের জন্য আপনার কী কোনো পরামর্শ আছে?
শাম্মী :
এই সমাজে যেনো হিজড়াদের কেউ গালি আকারে ডাক না দেয়। আড় চোখে না দেখে। সবাই যেনো আমাদেরকে ভালোবাসে। নিজের সন্তানকে যেমন করে মেনে নেয় তেমনি আমাদেরকে মেনে নেয়। অন্যদের মতো আমরাও যেনো সমাজের সঙ্গে চলতে পারি। বোঝা মনে না করে যেনো মনে করে আমরাও এদশের সম্পদ।


সমাজ রাজনীতি নিয়ে আপনার ভাবনা কী?
শাম্মী :
আসলে আমরা বঞ্চিত হই আমাদের পরিবার থেকে। দেশ, সমাজ, আর রাষ্ট্রের কাছে আমার চাওয়া থাকবে যে, আমরা যেনো পরিবার না হারাই, পরিবার থেকেই আমাদের বৈষম্যটা শুরু হয়। আমরা যেনো বৈষম্যহীন জীবন ফিরে পাই ও আমরা যেনো আর বৈষম্যের শিকার না হই।



প্রত্যেকেরই একটি উদ্দেশ্য থাকে। আপনার জীবনের উদ্দেশ্য কি?
শাম্মী :
আসলে আমি দেশ, দেশের সবাই ও আমার কমিউনিটি নিয়ে কাজ করতে চাই। বিশেষ করে যেহেতু আমরা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী বলে সবাই, আমি মনে করি যে, আমরা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী নয় পিছিয়ে দেয়া জনগোষ্ঠী। এই জনগোষ্ঠী। যেনো সমাজে মাথা উঁচু করে দাড়াতে পারে সেই নিয়ে কাজ করাই আমার মূল লক্ষ্য। ইনশাল্লাহ আপনাদের দোয়ায় আমি এই লক্ষ্যে পৌছাতে পারবো। দেখিয়ে দিতে পারবো হিজড়ারা কোনো বোঝা নয়।


অনেক ধন্যবাদ আপনাকে আমাদেরকে সময় দেয়ার জন্য।
শাম্মী :
আপনাকেও ধন্যবাদ আমাদের এতোটা গুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপন করার জন্য।


সাক্ষাতকারটির পুরো ভিডিওদেখুন



বিবার্তা/শারমিন

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: [email protected], [email protected]

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com