বই প্রকাশ : দেশে ও বিদেশে
প্রকাশ : ০৫ জানুয়ারি ২০১৮, ১৬:৪৬
বই প্রকাশ : দেশে ও বিদেশে
সাইফুর রহমান
প্রিন্ট অ-অ+

পশ্চিমা বিশ্বে বই ছাপানোর এই এক সুবিধা - ভালো কিছু লিখলে কোনো না কোনোভাবে ছাপা হবেই। বাংলাদেশে বই ছাপানোর চালচিত্র কিন্তু একেবারেই ভিন্ন। বই প্রকাশ নিয়ে এখানে চলে তুঘলকি কাণ্ড! বই প্রকাশ করার ক্ষেত্রে অনুসৃত হয় না নিয়মনীতি। বেশিরভাগ প্রকাশনীরই নেই কোনো এডিটোরিয়াল বোর্ড।


পশ্চিমা দেশগুলোতে প্রত্যেকটি প্রকাশনীতেই সম্পাদকমণ্ডলী থাকে। প্রকাশনা সংস্থায় কোনো বই জমা পড়লে সম্পাদকমণ্ডলী খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন বইটি আদৌ প্রকাশের যোগ্য কিনা। অবশ্য তাদের এই সূক্ষ্ম দৃষ্টির কারণে অনেক সময় অনেক লেখকের ভালো ভালো বইও বাদ পড়ে যায়। কিন্তু তাতে করার কিছু নেই। শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে কিছুতেই তারা একটি উপন্যাস কিংবা অন্য যে কোনো বই তুলে দিতে চান না পাঠকের হাতে। তারা মনে করেন, যে কোনো কারণেই হোক, একটি দুর্বল বই প্রকাশ করে পাঠকদের ঠকানোর অধিকার তাদের নেই। এ কারণেই দেখা যায়, উত্তরকালে অনেক লেখক যারা বিখ্যাত হয়ে জগৎ মাতিয়েছিলেন তাদের বইও প্রত্যাখ্যাত হয়ে ফিরে এসেছে নামিদামি সব প্রকাশনালয় থেকে।


আমাদের দেশে অবশ্য দেখা যায় একেবারেই বিশৃঙ্খল অবস্থা। এখানে ফেব্রুয়ারি মাস এলেই সহস্র লেখকযশ্প্রার্থী দৌড়ঝাঁপ শুরু করে দেন। তখন এ সুযোগটিই কাজে লাগান আমাদের দেশের অসাধু প্রকাশনালয়গুলো। তারা লেখকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে বই ছাপান। ধারও ধারেন না বইটিতে আদৌ কোনো সারবস্তু আছে কিনা। আর এতে করে বঞ্চিত হন প্রকৃত লেখক। নিয়ম হচ্ছে প্রকাশকই দৌড়াবে প্রতিভাবান লেখকদের পেছনে। কিন্তু বাংলাদেশে লেখকগণই সাধারণত হত্যে দিয়ে বেড়ান প্রকাশনালয়গুলোতে।


আমি আমার নিজের একটি অভিজ্ঞতার কথা বলি। ২০১৫ সালে আমি আমার প্রথম বই বের করব বলে সিদ্ধান্ত নিই। বিলেত থেকে ব্যারিস্টারি পাস করে দেশে ফিরেছি ২০০৪ সালে। স্কুলজীবন থেকে লেখালেখির সূত্রপাত হলেও ২০০৪ সাল থেকে করছি পুরোদমে। কিঞ্চিত লেখক খ্যাতিও জুটেছে ইতিমধ্যে। ভাবলাম বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত লেখাগুলো নিয়ে একটি বই বের করলে মন্দ হয় না।


প্রথমা বইয়ের দোকানের জয়েন্ত দাস আমাকে বিশেষ পছন্দ করেন। তিনিই একদিন আমাকে বললেন, আপনার বইয়ের জন্য একজন প্রকাশক পাওয়া গেছে।


আমি খুবই খুশি। সে অনুযায়ী আমি জয়েন্ত দা ও আমার ভবিষ্যৎ প্রকাশক একদিন বাংলাবাজার বিউটি বোর্ডিংয়ে লাঞ্চ মিটিং করলাম। আমার ভবিষ্যৎ প্রকাশক একথা-সেকথা বলে কিছুক্ষণ পর আমাকে বললেন, বই ছাপাতে টাকা লাগবে।


আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম! এ কি বলছেন আমার ভবিষ্যৎ প্রকাশক! আমি বললাম, আমার লেখা আগে পড়ুন, তারপর সিদ্ধান্ত নিন।


উনি আমাকে সাফ জানিয়ে দিলেন টাকা ছাড়া বই প্রকাশ করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।


আমি বললাম, আপনার প্রকাশনীর নামের তো অর্থ হচ্ছে অন্বেষণ করা। তো আপনি কী অন্বেষণ করেন? আপনার প্রকাশনীর জন্য ভালো বই, নাকি টাকা?


আমার বলতে এতটুকুও দ্বিধা নেই যে, এই বঙ্গদেশে অনেক শ্রুতকীর্ত লেখকই জীবনের প্রথম বই গাঁটের পয়সা খরচ করে ছাপিয়েছেন। তাতে কোনো মহাভারত অশুদ্ধ হয়েছে বলে আমি মনে করি না। কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে টাকা খরচ করে বই ছাপানোর ঘোর বিরোধী।


আমি জানি, কবিতার বইয়ের সাধারণত কাটতি কম থাকায় বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি আল মাহমুদের প্রথম বই লোক-লোকান্তর কবি-সাহিত্যিকদের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশ পেয়েছিল। আবদুল মান্নান সৈয়দ তার প্রথম বই জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ নিজের টাকায় প্রকাশ করেছিলেন। সেলিনা হোসেনও তার প্রথম বই প্রকাশ করেছিলেন নিজের টাকা খরচ করে। অবশ্য শামসুর রাহমান ও নির্মলেন্দু গুণ ছিলেন বলা চলে কিছুটা ভাগ্যবান। গল্পকার সম্পাদক ও প্রকাশক মহীউদ্দিন আহমেদ এক প্রকার অনুরোধ করেই কবির কাছ থেকে আদায় করেছিলেন 'প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে' পাণ্ডুলিপিটি। পাণ্ডুলিপি চেয়ে নেয়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে শামসুর রাহমান ইতিমধ্যে কিছুটা খ্যাতি অর্জন করে ফেলেছিলেন।


পশ্চিমবঙ্গে কিন্তু নিজের পকেটের টাকা খরচ করে বই ছাপানোর সংস্কৃতি একেবারে নেই বললেই চলে। এ মুহূর্তে শুধু আমার একজন লেখকের কথা মনে পড়ছে, যিনি কিনা নিজের টাকা খরচ করে বই ছাপিয়েছিলেন। লেখকটি ছিলেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি তার 'আমার সাহিত্যজীবন' বইটিতে লিখেছেন যে কবি সাবিত্রীপ্রসন্ন ছিলেন তার অন্তরঙ্গ বন্ধু। তার উপাসনা প্রেস থেকেই তারাশঙ্করের প্রথম উপন্যাস ১৯৩১ সালে চৈতালী ঘূর্ণি বের হল।


উপন্যাসটি প্রকাশ করতে গিয়ে তাকে কিরূপ হেনস্থা হতে হয়েছিল তার একটি হৃদয়স্পর্শী বর্ণনা পাওয়া যায় সবিতেন্দ্রনাথ রায়ের 'লেখকের কাছাকাছি' গ্রন্থটিতে। সেখানে তিনি লিখেছেন, স্ত্রীর গয়না বিক্রি করে তারাশঙ্কর চৈতালী ঘূর্ণি উপন্যাসটি ছেপেছিলেন। ভেবেছিলেন, বই বিক্রি করে সে টাকায় গয়না নতুন করে গড়িয়ে দেবেন। বিক্রি তো হলই না। এ দোকানে সে দোকানে বই জমা দেন, কিন্তু পয়সা পান না। একদিন ‘বঙ্গশ্রী’ পত্রিকার অফিসের সামনে পৌঁছেছেন। উপাসনা প্রকাশনালয়ের দফতরি ধরল- ‘এই যে বাবু, আপনি তো সেই এক শ’ কপি বই নিলেন, তারপর তো আর দেখাও করলেন না, বই তো বাঁধা আছে আরও এক শ’ কপি। তার দাম পেলাম না। আমার গুদামে জায়গা নেই বাবু, কাল-পরশুর মধ্যে দাম না পেলে আমি সব বেচে-বুচে দাম উশুল করে নেব।’


উচ্চকণ্ঠে কথা বলছিল দফতরি, তারাশঙ্কর বাবু হয়তো তাকে কিছু বোঝাবার চেষ্টা করছিলেন। চেঁচামেচি শুনে ‘বঙ্গশ্রী’ পত্রিকার অফিসে থেকে বেরিয়ে এলেন সজনীবাবু । দফতরির কথাবার্তা শুনে সব বুঝলেন। সজনীবাবু তখন পথের পাঁচালী ও আরও কিছু বই ছেপে প্রতিষ্ঠিত প্রকাশক। উনি দফতরিকে বললেন- শোনো, আজ থেকে ও বই আমার। তুমি আমাকে বাদবাকি সবগুলো বই বেঁধে দেবে। আগের বিল ও নতুন যা বিল, সব দাম আমার কাছ থেকে নেবে।


এভাবে পশ্চিমবঙ্গের প্রকাশকগণ সুদীর্ঘকাল ধরেই ভালো ভালো কবি-সাহিত্যিক সৃষ্টিতে একটি অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখে চলেছেন। এখনও সে ধারা অব্যাহত আছে। এ কারণেই আনন্দ, মিত্র অ্যান্ড ঘোষ, দে’জসহ আরও বহু প্রকাশনী বর্তমানে এক-একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। তাদের আয়-রোজগারও বিস্ময়কর! কয়েকটা দৃষ্টান্ত দিচ্ছি।


‘শনিবারের চিঠি’র সম্পাদক সজনীকান্ত দাসের কথা তো আগেই উল্লেখ করেছি। বিভূতি ভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালী তখন সবেমাত্র বিচিত্রা পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে বেরুচ্ছে। হঠাৎ একদিন সজনীকান্ত দাস খোঁজখবর নিয়ে বিভূতি বাবুর কাছে এসে উপস্থিত। নব্বইটি টাকা তার হাতে গুঁজে দিয়ে বললেন- এটা আপাতত রাখুন। ‘পথের পাঁচালী’ বই আকারে আমি ছাপব। অবাক হয়ে গেলেন বিভূতি ভূষণ বন্দোপাধ্যায়। ন-ব্ব-ই-টা-কা!! এ-যে কল্পনাতীত!


সমরেশ মজুমদারের ‘উত্তরাধিকার’ উপন্যাসটি ছাপিয়েছিলেন মিত্র অ্যান্ড ঘোষের গজেন্দ কুমার মিত্র। বইটি বিক্রিও হলো মোটামুটি ভালোই। বইটি যারা পড়েছেন তারা জানেন এর একটি বৃহৎ অংশজুড়ে আছে কমিউনিস্ট আন্দোলন। তো হয়েছে কী, সমরেশ মজুমদারের সঙ্গে কমিউনিস্ট নেতা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সঙ্গে একদিন দেখা। তিনি সমরেশ মজুমদারের কাছে বইটি সম্পর্কে উচ্চ প্রশংসা করলেন এবং এও বললেন, যদি সমরেশ মজুমদার বইয়ের ভূমিকায় বইটি কমিউনিস্ট আন্দোলনের মুখপাত্র কিংবা এ জাতীয় কিছু কথা লিখে দেন তা হলে তিনি পার্টি ফান্ড থেকে বইটি পঞ্চাশ হাজার কপি কিনে নেবেন। সমরেশ মজুমদার তো খুশিতে গদগদ হয়ে প্রকাশক গজেন্দ্র কুমার মিত্রকে কথাটা জানালেন। গজেন্দ্র বাবু সমরেশ মজুমদারকে বোঝালেন, এটা করা মোটেও উচিত হবে না। তখন দেখা যাবে শুধু যারা কমিউনিস্ট দল করে তারাই বইটি কিনছে। সাধারণ পাঠক হয়তো এই বইটি আর ছোঁবেও না। এভাবে কয়েক লাখ টাকা রয়ালিটি থেকে বঞ্চিত হলেন বলে সেদিন সমরেশ মজুমদার অনেক রুষ্ট হয়েছিলেন। তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল মিত্র অ্যান্ড ঘোষ প্রকাশনীটিও। কারণ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কথামতো কাজ করলে নগদে বেশকিছু অর্থযোগ ঘটতো নিঃসন্দেহে। কিন্তু গজেন্দ্র বাবু ছিলেন বিচক্ষণ প্রকাশক। এ পর্যন্ত উত্তরাধিকার উপন্যাসখানা বিক্রি হয়েছে প্রায় দু’লাখ কপিরও বেশি।


আনন্দ পাবলিশার্স যে কীভাবে পাহাড়, অরণ্য কিংবা দুর্গম অঞ্চল থেকে সুন্দর সুন্দর সুবাসিত ফুল তুলে এনে সাহিত্য অঙ্গনের ডালা সাজায় তার একটি জাজ্বল্যমান উদাহরণ হচ্ছেন জনপ্রিয় লেখিকা তিলোত্তমা মজুমদার।


আনন্দ পাবলিশার্স তাকে কীভাবে একজন সফল লেখিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল সে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিলোত্তমা মজুমদার লিখেছেন, সেটা ছিল ২০০০ সাল। এক হেমন্তের দুপুরে একটি পোস্টকার্ড এলো আমার নামে। সল্ট লেকের একটি মহিলা আবাসনে থাকতাম তখন। জীবনের বহু জটিল বাঁক পেরিয়ে, নানা অসার্থক সিদ্ধান্তের ফলাফলে আমি তখন একা, ধ্বস্ত, কপর্দকহীন। অতীত নিয়ে ভাবতে চাই না, ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ নিরালোক। কে আমাকে চিঠি লিখবে? জগতে ব্যর্থ নিঃসম্বল মানুষের খবর রাখে অতি অল্প জন। তবু আমার চিঠি এলো। পড়ে আমি বড় বিচলিত হয়ে উঠলাম। আগের বছর একটি অখ্যাত পত্রিকার শারদ সংখ্যায় আমার একটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছিল। ‘মানুষশাবকের কথা’ নামে সেই উপন্যাসখানা আনন্দ পাবলিশার্স গ্রন্থাকারে প্রকাশ করতে চায়, এ কথা চিঠিতে লেখা ছিল। বলা হয়েছিল, আমি যদি আগ্রহী হই তবে যেন প্রকাশনার দফতরে বাদল বসুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করি।


উপরোক্ত ঘটনাটি থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, আনন্দ পাবলিশার্সের মতো প্রকাশনীগুলো প্রতন্ত অঞ্চল থেকে ছাপা হওয়া অখ্যাত সব সাহিত্য পত্রিকাগুলোও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ে, যাতে করে প্রকৃত ভালো ভালো লেখকদের তুলে আনা যায়।


বাংলাদেশের প্রকাশনা সংস্থাগুলোকেও নিতে হবে এ ধরনের পদক্ষেপ। শুধু মুনাফার কথা চিন্তা করলেই হবে না। বই ছাপিয়ে যদি শুধু অর্থপ্রাপ্তির কথা মাথায় থাকে তা হলে তো সোনা কিংবা হিরার ব্যবসা করাই ভালো। সৃজনশীল ব্যবসায় কেন?


লেখাটি শেষ করছি ছোট্ট একটি ঘটনা বলে। অ্যালেন লেন নামক এক ইংরেজ একদিন ইংল্যান্ডের প্লেমাউথ অঞ্চলটির কাছাকাছি এক্সিটার নামক রেল স্টেশনে পড়ার জন্য ভালো কোনো বই খুঁজে না পেয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তিনি নিজেই একটি প্রকাশনা সংস্থা খুলে প্রকাশ করবেন ভালো ভালো লেখকের বই। আর এভাবেই ১৯৩৫ সালে জন্ম হল পেঙ্গুইন বুকস নামে আজকের বিখ্যাত প্রকাশনালয়টির। কথা হচ্ছে উদ্দেশ্য যদি সৎ হয় তবে সাফল্য একদিন না একদিন আসবেই।
(ঈষৎ সংক্ষেপিত) সৌজন্যে : দৈনিক যুগান্তর


বিবার্তা/হুমায়ুন/শারমিন

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com